26/03/2026
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় বাংলাদেশের বাম রাজনীতি:
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর প্রথম এই নির্বাচনে বাম রাজনীতির অবস্থান, ফলাফল এবং তার পরবর্তী বাস্তবতা বিশ্লেষণ করাই এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য।
নির্বাচনী ফলাফল: বামদের জন্য হতাশাজনক অধ্যায়
নির্বাচনের ফলাফল বাম দলগুলোর জন্য প্রত্যাশার চেয়েও কম সাফল্য বয়ে এনেছে। গণতান্ত্রিক বাম জোট (ডিএলএ) এবং ফ্যাসিবিরোধী বাম ফ্রন্ট উভয় জোটই কোনো একক আসন জিততে পারেনি। পৃথকভাবে কিছু দল প্রার্থী দিলেও তাদের অবস্থান ছিল নগণ্য।
দল/জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসন প্রাপ্ত আসন উল্লেখযোগ্য ফলাফল
গণতান্ত্রিক বাম জোট (ডিএলএ) ৮৫টি ০ জামালপুর-৫, চট্টগ্রাম-৮-এ ভোট পায়নি
ফ্যাসিবিরোধী বাম ফ্রন্ট ৪২টি ০ সিলেট-২-এ জামানত হারান
সিপিবি (স্বতন্ত্র) ১২টি ০ সর্বোচ্চ ৮,২৩৪ ভোট (মাগুরা-১)
বাসদ (স্বতন্ত্র) ৮টি ০ সর্বোচ্চ ৫,৬১২ ভোট (ঢাকা-৮)
তথ্য অনুযায়ী, বাম প্রার্থীরা যে কয়েকটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, সেখানেও তাদের ভোটের হার ছিল মাত্র ২-৫ শতাংশের মধ্যে। জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পরাজিত প্রার্থীরাও অনেক আসনে বাম প্রার্থীদের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন।
নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতার বিশ্লেষণ
১. বিএনপির উত্থান ও বামদের প্রান্তিকায়ন
নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ফলাফল ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন। দলটি ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২১৫টিতে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। এতে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে ডান-মধ্যপন্থী শক্তির আধিপত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাম দলগুলোর জন্য এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী:
· সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের শূন্যতা: সংসদের বাইরে থাকায় বাম দলগুলো জাতীয় নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
· মিডিয়ায় উপস্থিতি হ্রাস: বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রধান রাজনৈতিক আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকায় বামদের অবস্থান গণমাধ্যমে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
· তহবিল সংকটের তীব্রতা: নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কোনো ফল না পাওয়ায় ছোট দলগুলো আরও আর্থিক সংকটে পড়ে।
২. 'জাতীয় ঐক্য' বনাম বাম স্বাতন্ত্র্য
নির্বাচনের পর বিএনপি একটি "জাতীয় ঐক্য সরকার" গঠনের উদ্যোগ নেয়, যেখানে তারা বিভিন্ন ছোট দলকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। বাম দলগুলো এখানে এক কঠিন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়:
· সরকারে যোগদানের পক্ষে যুক্তি: দীর্ঘ ১৬ বছর পর একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়েছে। বাম দলগুলো যদি এতে যোগ দেয়, তবে তারা নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে এবং তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে।
· বিরোধিতার পক্ষে যুক্তি: বিএনপি একটি বুর্জোয়া ও ধর্মীয়-রক্ষণশীল দল। তাদের সাথে জোটে গেলে বাম দলগুলোর নিজস্ব আদর্শ ও শ্রেণি-ভিত্তিক অবস্থান আপসহীন হয়ে পড়বে। এছাড়া, বিএনপির অর্থনৈতিক নীতি বাজার-ভিত্তিক ও পুঁজিবাদী, যা বামদের সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের বিপরীত।
বর্তমানে অধিকাংশ বাম দলই সরকারে যোগদান না করে "গঠনমূলক বিরোধিতা"র পথ বেছে নিয়েছে। সিপিবি ও বাসদ যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, "আমরা সরকারের উন্নয়নমূলক উদ্যোগে সহযোগিতা করব, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই বুর্জোয়া রাজনীতির অংশীদার হব না।"
৩. সংসদ-বহির্ভূত আন্দোলনের নতুন সম্ভাবনা
সংসদের বাইরে থাকার ফলে বাম দলগুলো তাদের কার্যক্রম আন্দোলন-কেন্দ্রিক করে সাজানোর চেষ্টা করছে। নির্বাচনের পর গত দুই মাসে নিম্নলিখিত আন্দোলনগুলো বাম দলগুলো পরিচালনা করেছে:
আন্দোলনের বিষয় সময়কাল অংশগ্রহণকারী দল অর্জন
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৫,০০০ টাকা নির্ধারণের দাবি ২৫ ফেব্রুয়ারি-১০ মার্চ সিপিবি, বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি সরকার মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনে সম্মত হয়েছে
ভূমিহীন কৃষকদের পুনর্বাসনের দাবিতে মানববন্ধন ১৫ মার্চ বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, সিপিবি-এমএল জেলা প্রশাসন ২টি উপজেলায় ভূমি জরিপের উদ্যোগ নিয়েছে
গাজা ও ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি সমাবেশ ২৮ মার্চ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, বাসদ-মার্কসবাদী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে স্থান পেয়েছে
বিদ্যুৎ, গ্যাস মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে স্মারকলিপি ৫ এপ্রিল সকল বাম জোট (যৌথভাবে) সংসদীয় কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে
এই আন্দোলনগুলো বাম দলগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রাজনৈতিক স্থান তৈরি করে দিয়েছে। যদিও এগুলো তাত্ক্ষণিকভাবে নির্বাচনী ফলাফল পরিবর্তন করতে পারেনি, তবে দীর্ঘমেয়াদে জনসংযোগ ও সাংগঠনিক ভিত্তি গড়তে সহায়তা করছে।
নতুন প্রজন্মের বামপন্থী সংগঠনের উত্থান
আইনি বাম দলগুলোর পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ছাত্র ও তরুণ-কেন্দ্রিক বেশ কিছু নতুন বামপন্থী সংগঠন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
১. গণতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (জিএসএফ): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। তাদের স্লোগান "শিক্ষার বাণিজ্যীকরণ বন্ধ কর" তরুণদের মাঝে সাড়া ফেলেছে।
২. বিপ্লবী যুব মৈত্রী: ২০২৫ সালের শেষ দিকে গঠিত এই সংগঠনটি রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে সক্রিয়। তারা বেকার যুবকদের সংগঠিত করে ছোটখাটো উদ্যোগ ও সমবায় গড়ে তুলতে কাজ করছে।
৩. শ্রমিক-কৃষক ঐক্য পরিষদ: পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে কৃষক ও মজুরদের মধ্যে এটি একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই সংগঠনগুলো মূলধারার বাম দলগুলোর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও, তাদের আদর্শগত অবস্থান মার্কসবাদী বা সমাজতান্ত্রিক। এটি ইঙ্গিত করে যে বাম ধারার ভবিষ্যৎ হয়তো নতুন এই প্রজন্মের হাত ধরেই গড়ে উঠবে।
বাম দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের নতুন মাত্রা
নির্বাচনের ফলাফলে হতাশ হয়ে বাম দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। মার্চ ২০২৬-এর শেষ সপ্তাহে ১৪টি বাম ও বাম-অনুসারী দলের এক যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে:
· আগামী ৬ মাসের মধ্যে একটি "বামপন্থী জাতীয় ঐক্য" গঠন করা হবে
· নির্বাচনী কৌশল ও সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে একটি সমন্বিত নীতি প্রণয়ন করা হবে
· তৃণমূল পর্যায়ে যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জেলা-উপজেলা কমিটি গঠন করা হবে
· বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও ভূমি সংক্রান্ত ইস্যুতে যৌথ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, "আমরা যদি আলাদা থাকি, তাহলে মূলধারার রাজনীতিতে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন। ঐক্যই এখন আমাদের বেঁচে থাকার পথ।"
তবে ঐক্যের পথে বাধা রয়ে গেছে। গণফোরাম, জাসদ (ইনু) এবং কিছু ন্যাপ গ্রুপকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। আরও কট্টরপন্থী দলগুলো মনে করে, যারা অতীতে আওয়ামী লীগের সাথে জোট করেছিল, তারা বুর্জোয়া রাজনীতির অংশ এবং তাদের সাথে এক কাতারে আসা উচিত নয়।
ভবিষ্যতের করণীয়: তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ
নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় বাম রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে:
১. নির্বাচনী রাজনীতি ও আন্দোলনের মধ্যে ভারসাম্য
বাম দলগুলোকে বুঝতে হবে যে সংসদের বাইরে থাকা মানে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়া নয়। তাদেরকে আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের কাছে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে হবে, পাশাপাশি আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। ২০২৮ সালের পৌরসভা নির্বাচন বামদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে।
২. শ্রমিক-কৃষক ভিত্তি পুনর্গঠন
এক সময়ের শক্তিশালী শ্রমিক-কৃষক ভিত্তি আজ দুর্বল। বাম দলগুলোকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, প্রান্তিক কৃষক, গার্মেন্টস শ্রমিক এবং বস্তিবাসীদের কাছে পৌঁছাতে হবে। 'ভূমি ওপর চাষির দখল'-এর মতো পুরোনো স্লোগানকে নতুন করে উপস্থাপন করতে হবে এবং সমসাময়িক দাবির সাথে সংযুক্ত করতে হবে।
৩. ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত শক্তিকে কাজে লাগানো
নির্বাচনে বাম দলগুলো অর্থের অভাবে পিছিয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারে। টেলিগ্রাম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে সংগঠিত করতে ডিজিটাল মাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই।
---
উপসংহার
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাম রাজনীতির জন্য যেমন একটি হতাশাজনক অধ্যায়, তেমনি এটি একটি নতুন করে শুরুর সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতায় বিএনপি দ্রুত সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে। কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই শূন্যতায় বাম দলগুলোর জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে হলে বাম দলগুলোকে তিনটি কাজ করতে হবে:
· ঐক্য: খণ্ডিত অবস্থায় টিকে থাকা অসম্ভব
· আদর্শ ও বাস্তবতার সমন্বয়: বিশুদ্ধ আদর্শের নামে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া চলবে না
· তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন: শুধু সমাবেশ ও বক্তৃতার রাজনীতি ছেড়ে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে
বাংলাদেশের বাম রাজনীতি এখন এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে। আগামী দুই-তিন বছর এই রাজনৈতিক ধারার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে। নতুন প্রজন্মের উত্থান, ঐক্যের নতুন উদ্যোগ এবং আন্দোলনের মাধ্যমে ফিরে আসার প্রচেষ্টা—এই তিনটি উপাদানই ইঙ্গিত দেয় যে বাম রাজনীতি এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তবে তাকে নিজের ভুল থেকে শিখতে হবে এবং সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে নতুন করে সাজাতে হবে।
জহির উদ্দিন আহমেদ মাসুদ
অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট
আহবায়ক
বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন অস্ট্রেলিয়া।