21/04/2026
চুক্তির বোঝা নয়, স্বাধীন সিদ্ধান্তের অধিকার চাই: অন্তর্বর্তী সরকারের আমেরিকা চুক্তির যুক্তিসংগত সমালোচনা
কমরেড,
আমরা যখন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামে নিয়োজিত, তখন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার শুধুমাত্র জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই থাকা উচিত। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তি (ART) স্বাক্ষর করে। এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তটি কেবল কূটনৈতিক কৌশলহীনতার পরিচয় দেয়নি, বরং এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর একটি সুস্পষ্ট আঘাত।
একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে ক্ষমতা হস্তান্তরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো সরকারের কর্তব্য ছিল রুটিন কাজ সম্পন্ন করা, কিন্তু তারা উল্টো দেশকে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বে জড়িয়ে ফেলেছে। নিচে এই চুক্তির যুক্তিসংগত ও প্রামাণ্য ভিত্তিতে একটি বিস্তারিত সমালোচনা উপস্থাপন করছি।
১. গণতান্ত্রিক বৈধতার অভাব ও গোপনীয়তার আড়াল
আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর গণতান্ত্রিক বৈধতার অভাব। অন্তর্বর্তী সরকারের মূল কাজ ছিল একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান পরিচালনা করা, দেশের নীতি-নির্ধারণী কাঠামো নির্ধারণ করা নয়। বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, একটি নির্বাচিত সরকারের ওপর এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার কি কোনো যৌক্তিকতা আছে?
এটি আরও জটিল হয়েছে গোপনীয়তার (Non-Disclosure Agreement) কারণে। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা গোপন রাখা হয়। অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন সঠিকভাবেই লক্ষ্য করেছেন যে, এই আলোচনায় জনগণ বা অর্থনীতিবিদদের সম্পৃক্ততা ছিল “নিছক আনুষ্ঠানিকতা” মাত্র। একটি চুক্তি যা প্রতিরক্ষা, শুল্ক, জ্বালানি ও প্রযুক্তি নির্ধারণ করছে, তা জনগণের কাছ থেকে গোপন রেখে দ্রুত স্বাক্ষর করার প্রক্রিয়া স্বাধীনতার পররাষ্ট্রনীতির পরিপন্থী।
২. প্রতীকী সুবিধার বিনিময়ে বিপুল অর্থনৈতিক বোঝা
চুক্তির আমেরিকান দিকটি দেখে মনে হবে তারা রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ (প্রত্যাশিত শুল্ক) ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু এই ১ শতাংশ ছাড়ের বিনিময়ে বাংলাদেশ যে মূল্য দিতে রাজি হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ বাধ্য হচ্ছে:
· বোয়িং থেকে ২৫টি বিমান কিনতে (যার মূল্য প্রায় ৫৩,০০০ কোটি টাকা)।
· বাজার মূল্যের চেয়ে দামি গম, সয়াবিন ও তুলা কিনতে (ন্যূনতম ৩.৫ বিলিয়ন ডলার)।
· এলএনজি কিনতে ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে, যা দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সতর্ক করে বলেছেন, এই চুক্তি বর্তমান সরকারের জন্য ঋণের বোঝা আরও বৃদ্ধি করেছে। রপ্তানি আয়ের সামান্য সুবিধা পেতে আমদানিতে বিপুল ডলার খরচ করে বাণিজ্য ভারসাম্য আরও অসম করা এই চুক্তির স্বাক্ষর দেয়।
৩. সার্বভৌমত্ব খর্ব করে জ্যামিতিক আধিপত্য
এটি শুধু একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়, বরং এটি একটি জিও-পলিটিক্যাল আত্মসমর্পণ। চুক্তির বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার ওপর বাধা এসেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী:
· বাংলাদেশ যদি “নন-মার্কেট ইকোনমি” হিসেবে চিহ্নিত দেশগুলোর সাথে কোনো চুক্তি করে, যুক্তরাষ্ট্র সেই সুযোগকে পুঁজি করে এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে।
· বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।
· অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এই চুক্তি কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে।
উপসংহার
কমরেড, সিপিবি সবসময়ই বলে আসছে যে, এই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ছিল ব্যতিক্রমী ও অসাংবিধানিক। সেই সরকার যদি দেশের মূল্যবান সম্পদ ও ভবিষ্যৎ বিদেশনীতি ৫০ বছরের জন্য বন্ধক দিয়ে দেয়, তবে তা মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের আদালত যখন ট্রাম্পের শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, তখন এই চুক্তির ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিএনপি সরকার যদি দেশের স্বার্থে সত্যিই কাজ করতে চায়, তাহলে সংবিধানের ১৪৫ এর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই চুক্তি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করুক। জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই “গোপন চুক্তি” বাতিলের উদ্যোগ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
চুক্তির শর্তে যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশকে "পুতুল" বানাতে চায়, তাহলে দেশের প্রকৃত কমিউনিস্ট ও গণতান্ত্রিক শক্তির কর্তব্য হলো রাস্তায় নামা, সংসদে সরব হওয়া এবং এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করা। স্বাধীন দেশের ভাগ্য তার নিজের জনগণ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্ধারণ করবেন, কোনো অন্তর্বর্তী সরকারের হাত ধরে আমেরিকার ইম্পেরিয়াল স্বার্থ নয়।
জহির উদ্দিন আহমদ মাসুদ
অনলাইন লেখক
আহবায়ক
বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন অস্ট্রেলিয়া।