16/06/2021
বাচ্চাকাচ্চা পালা কোনো সহজ ব্যাপার না। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলার একটা হইলো বাচ্চা পালা। হয়তো সবচেয়ে কঠিন কাজই এইটা।
একটা বাচ্চা পেটে আসা থেকে শুরু করে, দশ মাস পেটে রাখা, নিজের স্বাস্থ্য ঝুঁকি, ফিগার চেইঞ্জ হয়ে যাওয়া,এরপর বাচ্চা জন্ম দেওয়ার প্রসেসটা, তারপর সেই কথা না বলতে পারা, কিছু না বুঝতে পারা সন্তানকে প্রতিদিন দেখাশোনা করে,নিজের বুকের দুধ খাওয়ানো, হাঁটা, দৌঁড়ানো, কথা শিখানো,হাজার হাজার টাকা খরচ করে বড় করাটা সবকিছু একটা ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ৷ প্রতিটা মুহুর্তে নতুন নতুন একটা করে চ্যালেঞ্জ।
যেই চ্যালেঞ্জটা আপনি নিজ ইচ্ছায় নিছেন। যেই চ্যালেঞ্জটা নেওয়া না নেওয়ার অপশন আপনার আছে। একটা শিশু পেটে আসলে সেই মুহুর্ত থেকে তাকে বড় করা পর্যন্ত কী করতে হয় এটা ক্লাস টু এর বাচ্চাও জানে। আপনি সব জেনে বুঝে এই সিদ্ধান্ত, চ্যালেঞ্জ নিসেন।
এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার পেছনে আপনার সন্তানের একফোঁটা কোনো ইনফ্লুয়েন্স ছিলোনা। এক ফোঁটাও না। কিন্তু এই সন্তান একটু বুঝতে শিখতে না শিখতে আপনি তার উপরে তার অনিচ্ছায় হাজারটা চ্যালেঞ্জের বোঝা বসায়ে দিচ্ছেন। কেনো? সে তো চায়নাই।
একটা মানুষকে নিজ ইচ্ছায় পৃথিবীতে এনে তার উপরে বোঝা চাপায়ে দেওয়ার মানে কী?
বাচ্চা নেওয়ার ডিসিশন আপনারা কেনো নেন? কখন নেন?
১. বিয়ে হয়ে গেসে। বাচ্চা নিই।
> না। বিয়ে হইলেই বাচ্চা নিতে হয়না। এরেঞ্জ ম্যারেজ,লাভ ম্যারেজ যাই হোক একটা মানুষের সাথে একসাথে থাকার ব্যাপারটা অন্যরকম। যতই ১০ বছরের প্রেম হোক না কেনো, একসাথে যখন আপনারা থাকবেন যখন আপনাদের বাসা,বাথরুম, বিছানা শেয়ারড হবে, তখনের ব্যাপারটা অন্যরকম। মানুষটা যখন আপনার খেলা; সিরিয়াল দেখার সময় সিরিয়াল/খেলাও দেখতে চাইবে,যখন বাথরুমে ১০ মিনিট বেশি লাগাবে,ব্রাশ যে তাকে রাখার কথা সেখানে না রেখে অন্য তাকে রাখবে, আপনার সামনে খাইতে খাইতে পাদ দিবে তখন ব্যাপারটা অন্যরকম। আপনাদের দুইজনের দুইজনকে আরো কাছে থেকে জানা, বুঝার ব্যাপারটা তখন চলছে। আপনারা আগে নিজেদের সম্পর্কে জানুন।
২. স্বামী অফিসে, বাসায় একা ভালো লাগেনা। একটা বাচ্চা নিই।
> আপনার ভালো লাগেনা ঠিক করার জন্য টিভি, কম্পিউটার, মোবাইলে হাজার হাজার কন্টেন্ট পাওয়া যায়। সেগুলা দেখুন। বই পড়ুন,গাছ লাগান, ছবি আঁকেন, আকাশ দেখেন,গল্প করেন প্রতিবেশীর সাথে। দয়া করে ভালো লাগানোর জন্য, একাকীত্ব কাটানোর জন্য বাচ্চা নিবেন না। বা কুকুর, বিড়াল পালা শুরু করবেন না। ওরা আপনার এন্টারটেইনমেন্টের বস্তু না।
৩. স্বামীর সাথে বনিবনা হচ্ছেনা। একটা বাচ্চা নিলে ব্যাপারটা ঠিক হয়ে যাবে।
> না। ব্যাপারটা ঠিক হয়ে যায়না তখন। তখন আপনার স্বামী একটা অন্য লেভেলের রেসপন্সিবিলিটিতে আঁটকে যায়। সন্তান খুশির খবর, কিন্তু সন্তান বড় করাটা সহজ না। তাই অলরেডি আপনার সাথে কম বনিবনার মানুষটাকে আপনি আরো ফ্রাস্ট্রেশনে ফালায়ে দিচ্ছেন। তার ফ্রাস্ট্রেশন নিজের মধ্যে ঢুকাচ্ছেন৷ নিজেদের ঝগড়া দেখিয়ে দেখিয়ে বাচ্চাকেও ফ্রাস্ট্রেশনে ফালায়ে দিচ্ছেন।
৪. পরিবার থেকে চাপ দিচ্ছে।
> এই চাপ আপনি সামলানোর জন্য কেপ্যাবল না হলে বাচ্চা নেওয়ার দরকার নাই। যে বাচ্চাটা আপনি নিজেই চাপে পরে নিতে চাচ্ছেন সেই বাচ্চাকে আপনি কী পরিমাণ চাপে রাখবেন এবং আপনার জীবনে কত চাপ সহ্য করসেন সেই লেকচার দিবেন সেইটা বুঝাই যাচ্ছে৷
৫. ভবিষ্যতে সন্তান দেখবে আমাকে।
> সন্তানকে ব্যাংক মনে করলে একটু সমস্যা। আপনার সন্তান ভবিষ্যতে আপনাকে তখনই দেখে রাখবে,ভালোবাসবে যখন সে একটা সুন্দর পরিবেশে , সঠিক শিক্ষা পেয়ে বড় হবে৷ যখন আপনার প্রতি সম্মান তার মন থেকে আসবে, জোর করে না৷ সন্তানকে পড়াশোনা করানোর জন্য মেরে পিটায়ে শুধু রাতের বেলা প্লেটে ইলিশের মাথা দিলেই হয়না। আর তাছাড়া সন্তান মরেও যাইতে পারে,সরি ট্যু সে।
৬. আমার বাবু অনেক ভালো লাগেএএএএ। রাস্তায় বাবু দেখলেই চুমু খাই।
> শাড়ি /পাঞ্জাবি অনেক ভালো লাগলে শাড়ি/পাঞ্জাবি কিনবেন৷ বাবু ভালো লাগলেই বাবু নিতে হয়না। এত এক্সাইটেড হয়ে আনন্দ করার উদ্দেশ্যে বাবু নিলে কাজ করতে যেয়ে পাগল হয়ে যাবেন৷ তখন আর বাবু ভালো লাগবেনা। সব জেনে বুঝে প্রস্তুত হয়ে বাবু নিবেন। এবং রাস্তাঘাটে অবশ্যই হুট করে গিয়ে কোনো বাবুকে জড়িয়ে ধরা,কোলে নেওয়া, চুমু খাওয়ার মত অদ্ভুত এবং ফালতু কাজ করবেন না। বাচ্চার এবং বাচ্চার গার্ডিয়ানের সাথে কথা বলে এপ্রোচ করবেন।
আরো অনেক আজব আজব কারণ আছে যেগুলো সব আমার আসলে মনেও নেই। কিন্তু,প্লিজ, আপনি তখনই বাচ্চা নিন যখন আপনি,
১. মেন্টালি ক্যেপাবল।
> আপনি মেন্টালি অসুস্থ হলে একটা বাচ্চা সামলানোর জন্য যে ধৈর্য্য,পরিশ্রম দরকার সেটা আপনি করতে পারবেন না। ছোটবাচ্চা কিছু হলেই কাঁদবে, সারারাত কাঁদবে, সেই কান্না আপনার শুনতে হবে। সহ্য করে ওকে আদর করে থামাতে হবে।আপনার বাচ্চার কার্টুন, নতুন নতুন বন্ধুদের গল্প শোনার ইচ্ছা আপনার থাকতে হবে তখন৷ কে কী বলেছে সেসব শুনে বাচ্চাকে শান্ত করতে হবে আপনার প্রায় প্রায়।
২. শারীরিকভাবে সুস্থ।
> একটা বাচ্চা বড় করা প্রচন্ড পরিশ্রমের কাজ। সেই পরিশ্রম করার শক্তি আপনার থাকতে হবে। দিনশেষে ক্লান্ত হলেও বাচ্চার উপর বিরক্ত না হয়ে, দুধ গরম করতে হবে। কোলে করে দুলিয়ে দুলিয়ে ঘুম পাড়াতে হবে। হাগু পরিস্কার করে দিতে হবে। হঠাৎ মুখে কী দিয়ে চাবাচ্ছে দৌঁড় দিয়ে ওর কাছে গিয়ে সেটা চেক করতে হবে। এই কাজগুলোর জন্য যে সুস্থতা আপনার স্বাভাবিকভাবে দরকার, যে এনার্জিটা দরকার সেটা থাকতে হবে।
৩. ফাইন্যান্সিয়ালি স্টেবল।
> বাচ্চার জামাকাপড়,সেরেলাক, ডায়পার এবং অবশ্যই চিকিৎসার জন্য আপনার স্টেবল ইনকাম সোর্স থাকতে হবে। এখন যেকোনো চাকরি হঠাৎ চলে যেতে পারে অবশ্যই,সেক্ষেত্রে স্টেবল কথাটা খাটেনা। কিন্তু মেইক শিওর চাকরি চলে গেলেও আপনার বাচ্চার না খেয়ে, অসুস্থ হয়ে থাকতে যেনো না হয়। পৃথিবীতে অলরেডি অনেক শিশু না খেয়ে আছে,পারলে তাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থাও করা উচিত।
২. ছেলে সন্তান,মেয়ে সন্তানের মধ্যে পার্থক্য করেন না।
> এই গুনটা না থাকলে বাচ্চা নিবেননা দয়া করে। আপনি যদি একজন সেক্সিস্ট হন, তাহলে সেই পরিবারে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে কী হতে পারে আমি চিন্তাও করতে ভয় পাই।
৩. সন্তান আমার সাকসেসর বা কার্বন কপি বা আমার আলাদীনের চেরাগ না- এই ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন এবং মেনে নিবেন।
> আমাদের সবারই জীবনে কোনো না কোনো রিগ্রেট থাকে। কিন্তু এই রিগ্রেটগুলা সন্তানকে দিয়ে পূরণ করানোর চেষ্টা করবেন না। তাদের নিজের লাইফ গোলস নিজের সেট করতে হবে এবং সে তা করবেও। আপনার ইচ্ছা তার উপর চাপিয়ে তার মনের মধ্যে "বাবা-মা বড় নাকি স্বপ্ন" টাইপের বাংলা সিনেমার কনফ্লিক্ট সৃষ্টি করবেন না। গাইড করা আর চাপিয়ে দেওয়া এক জিনিস না। পাশের বাসার ভাবী বা ভাইয়ের ছেলে মেয়েকে দেখে তখন আর এত আফসোস হবেনা।
এবং মনে রাখবেন, আপনার সন্তানের চিন্তা ভাবনা, পরিবেশ, বিশ্বাস আলাদা হতে পারে,হবেও। সেটা আপনার মেনে নিতে জানতে হবে।
৪. সন্তানকে মেন্টাল সাপোর্ট দিতে পারবেন।
> আপনার সন্তানের সবচেয়ে বড় মেন্টাল সাপোর্ট আপনি। বড় হতে হতে ব্যাপারটা পরিবর্তন হতে পারে,কিন্তু বেড়ে ওঠার বয়সটায় আপনিই ওকে সাপোর্ট দিবেন। সন্তান প্লেট ভাংলে,না পড়তে চাইলে, এটা সেটা খেয়ে ফেললে অনুগ্রহ করে তাকে মারবেন না। তাকে বুঝিয়ে বলবেন,ভুল ঠিক করতে সাহায্য করবেন। সন্তানের গায়ে হাত তোলা তো জঘন্য একটা স্টেপ!
৫. নিজে শিক্ষিত হবেন এবং সন্তানকে শিক্ষা দিবেন।
> সঠিক শিক্ষা মানেই অংক ইংলিশে ১০০/১০০ না। সঠিক শিক্ষা মানে ছেলে অংকে ৬০ পেয়ে ওর প্রিয় সাবজেক্টে ৯০ পেলে সেটায় খুশি হওয়া। এনকারেজ করা। সেটা নিয়ে নিজে আরো জানা। এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনি অংক পারেনা বলে ভালোমতো অংক করতে বলতে পারবেন না এমনটা বলছিনা। বলছি যেই মুহুর্তে ও ওর প্রিয় সাবজেক্টে ভালো করেছে সেই মুহুর্তে অংকের রেজাল্ট নিয়ে কথা বলে,বকাবকি করে ওর আনন্দ মাটি না করে দেওয়া। সঠিক শিক্ষা মানে ওকে নিজের কাজ নিজে করতে, বেসিক লাইফস্কিলস শিখানো। গল্প এবং হেলদি আলোচনার মাধ্যমে ভুল ঠিক শিখানো। এবং সন্তানের কাছ থেকেও যে আপনার অনেক কিছু শেখার আছে এই ব্যাপারটা উপলদ্ধি করতে পারবেন।
বাবা মা হওয়ার ফলে আপনাদের যে সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সটা কাজ করে সেটা থেকে বের হয়ে আসুন প্লিজ। পৃথিবীর সব মানুষ ভুল করে। বাবা-মাও ভুলের উর্ধে না। কখনো ছিলোওনা৷ কোনোদিন হবেনা। নিজেকে এই মিথ্যা কথাটা জুসের মত গুলিয়ে খাওয়ানো বন্ধ করুন। অন্যদেরও বন্ধ করতে সাহায্য করুন। একজন বাবা মা হলেই সে সাধু এই চিন্তা থেকে বেড়িয়ে আসুন। এবং এই অপদার্থ, অসুন্দর বাবা-মাগুলার ভুল ওভারলুক না করে তাদের কল আউট করুন।
একজন সন্তান নেওয়ার আগে ছেলে, মেয়ে, ট্রান্স, প্রতিবন্ধী যেকোনো সন্তানকে ডিস্ক্রিমিনেট না করে নিজের বুকে আগলে নেওয়ার প্রিপারেশন নিন। এই পৃথিবীটা এমনিই অনেক দুঃখে ভরা। নিজের ঘরের সন্তানকে অন্তত দুঃখ দিয়েন না। এই দুঃখভরা পৃথিবীতে ওরা কেও শখ করে আসেনাই। আপনি নিয়ে আসছেন। ওদের কষ্টগুলো বুঝুন,ওদের কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। আপনার সন্তান আপনার সম্পদ না। সে আপনার অত্যন্ত কাছের একজন মানুষ। তাকে মানুষ হিসেবেই দেখুন। সংগৃহীত