21/08/2026
২১ আগস্ট ২০০৪: গ্রে'নেড হা'মলার র'ক্তাক্ত ইতিহাস ও বিচারিক অধ্যায়।
২১ আগস্ট ২০০৪ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও বেদনাবিধুর দিন। এদিন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। হামলার লক্ষ্য ছিল সমাবেশে উপস্থিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং বিশেষ করে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি আহত হন। প্রাণ হারান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ ২৪ জন, আর আহত হন শত শত মানুষ।
যে সমাবেশে হামলা
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে একটি সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা ছিলেন প্রধান বক্তা।
তিনি একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন। বক্তব্য শেষ করার পরপরই সমাবেশস্থলে একের পর এক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে উৎসবমুখর রাজনৈতিক সমাবেশ পরিণত হয় ভয়াবহ আতঙ্ক ও মৃত্যুর ঘটনায়।
হামলায় চারপাশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আহতদের অনেকে ঘটনাস্থলেই পড়ে যান এবং অন্যদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। হামলার পরপরই নিরাপত্তা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।
নিহত ২৪ জন
২১ আগস্টের হামলায় মোট ২৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম আইভী রহমান। তিনি আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী।
আইভী রহমান গুরুতর আহত হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যু ২১ আগস্টের ঘটনার অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে।
হামলায় শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন সদস্যও নিহত হন। আহত হন আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী ও সমর্থক। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা কয়েকশ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান
হামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ। তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই বিস্ফোরণ শুরু হয়।
নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত তাঁকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেন। তিনি আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। ওই দিনের ঘটনার পর তাঁর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমাবেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
ঘটনার পর তদন্ত ও মামলা
হামলার ঘটনায় পরবর্তীতে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয় এবং মামলার তদন্ত নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিতর্ক চলে।
তদন্তের এক পর্যায়ে জজ মিয়া নামে একজনকে কেন্দ্র করে একটি গল্প সামনে আসে। পরবর্তীতে সেই তদন্তপ্রক্রিয়া ও জবানবন্দি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। মামলার পরবর্তী বিচারিক পর্যায়ে তদন্তের বিভিন্ন ত্রুটি ও প্রমাণ সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়।
এই মামলার তদন্ত একাধিকবার পরিবর্তিত ও সম্প্রসারিত হয়। শেষ পর্যন্ত সম্পূরক অভিযোগপত্রের মাধ্যমে আসামির সংখ্যা বাড়ে এবং মামলাটি দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে।
২০১৮ সালের বিচারিক আদালতের রায়
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা করে।
সেই রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র নেতা তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছিল।
এই রায়কে আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা হামলার জন্য দায়ীদের শাস্তি হিসেবে দেখলেও বিএনপি ও আসামিপক্ষ থেকে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
হাইকোর্টে মামলার মোড় পরিবর্তন
২০১৮ সালের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হাইকোর্টে হয়।
১ ডিসেম্বর ২০২৪ হাইকোর্ট ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় নিম্ন আদালতে দণ্ডিত সবাইকে খালাস দেন এবং আগের রায় বাতিল করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়।
এর ফলে ২০১৮ সালের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ অন্যান্য সাজা আর বহাল থাকেনি।
আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন
হাইকোর্টের রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট না হয়ে আপিল বিভাগে যায়। দীর্ঘ শুনানির পর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত এ বিষয়ে রায় দেওয়ার জন্য ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ নির্ধারণ করে।
২০২৫ সালের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ আপিল বিভাগ হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখে। অর্থাৎ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দুই মামলায় নিম্ন আদালতে দণ্ডিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দেওয়া আগের সাজাগুলো আর বহাল থাকেনি।
আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তে মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কোনো স্বীকারোক্তি কী পরিস্থিতিতে নেওয়া হয়েছে এবং সেটি স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছিল কি না—এ ধরনের প্রশ্ন আদালতের প্রমাণ মূল্যায়নে গুরুত্ব পেয়েছে।
কেন ২১ আগস্ট এত গুরুত্বপূর্ণ?
২১ আগস্টের ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশে হামলার ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নিরাপত্তা, তদন্ত এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের।
২১ আগস্টে যারা নিহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবার হারিয়েছে প্রিয়জন। যারা আহত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন শারীরিক ও মানসিক কষ্ট বহন করেছেন। একটি রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নিতে গিয়ে মানুষের জীবন এভাবে বিপন্ন হওয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে শিক্ষা
২১ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য সহিংসতার কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।
ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা নির্বাচনী প্রতিযোগিতা—সবকিছুর সমাধান হওয়া উচিত সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো জনগণের সামনে নিজেদের নীতি, কর্মসূচি ও নেতৃত্বের সক্ষমতা তুলে ধরা। প্রতিপক্ষের সভা-সমাবেশ, মতপ্রকাশের অধিকার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
স্মৃতিতে ২১ আগস্ট
প্রতি বছর ২১ আগস্ট এলেই নিহত ২৪ জনের কথা স্মরণ করা হয়। তাঁদের পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের কাছে দিনটি এখনো গভীর শোকের দিন।
দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ২১ আগস্টের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। এই ঘটনার বিচারিক ইতিহাসও দেখিয়েছে যে একটি বড় রাজনৈতিক সহিংসতার মামলায় তদন্ত ও প্রমাণ সংগ্রহ কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং আদালতের নিরপেক্ষ বিচার কতটা প্রয়োজনীয়।
২১ আগস্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাজনৈতিক মতের ভিন্নতা কখনো মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। গণতন্ত্রের শক্তি অস্ত্রে নয়, যুক্তিতে; প্রতিহিংসায় নয়, সহনশীলতায়; সহিংসতায় নয়, মানুষের ভোট ও মতপ্রকাশের অধিকারে।
২১ আগস্টে নিহত সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং আহতদের প্রতি সহমর্মিতা। রাজনৈতিক সহিংসতার পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনো বাংলাদেশের মাটিতে না ঘটে—এটাই হোক এই দিনের অন্যতম শিক্ষা।