30/05/2026
দারুল উলুম দেওবন্দ: দেড় শতাব্দীর এক জীবন্ত ইশতেহার ও আমাদের মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতার মূল ভিত্তি।
৩০ মে ১৮৬৬ ঈ. উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও ইসলামী ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনের এক অবিস্মরণীয় দিন।
১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ (সিপাহি বিপ্লব) ব্যর্থ হওয়ার পর এই অঞ্চলের মুসলমানদের ওপর নেমে এসেছিল নির্মম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকট, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং মানসিকভাবে পঙ্গু করার এক দীর্ঘমেয়াদী ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। সেই চরম দুঃসময় ও জাতীয় বিপর্যয়ের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরের দেওবন্দ নামক এক ছোট্ট জনপদে রোপণ করা হয়েছিল এই ঐতিহাসিক চারাগাছটি।
কোনো রাজকীয় অনুদান নয়, বড় কোনো অট্টালিকা নয়; এক ঐতিহাসিক ডালিম গাছের নিচে, মাত্র একজন শিক্ষক ও একজন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয়েছিল এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রথমপাঠ। যার একমাত্র পুঁজি ছিল ইখলাস, তাকওয়া, চোখের পানি এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আপসহীন চেতনা।
ইসলামী রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের জন্য দেওবন্দ একটি জীবন্ত দর্শন।
দেওবন্দ কেবল একটি বিদ্যাপীঠ নয়, এটি ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। রেশমী রুমাল আন্দোলন থেকে শুরু করে উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সবখানেই নেতৃত্ব দিয়েছেন দেওবন্দের সূর্যসন্তানেরা।
লর্ড মেকলের চাপিয়ে দেওয়া দাসত্বমুখী শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতে মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব স্বকীয়তা ও মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখার ঢাল ছিল এই দেওবন্দ।
দেওবন্দ মুসলিম উম্মাহকে শুধু আলেম দেয়নি, বরং যুগসচেতন মুফাক্কির, রাজনৈতিক দূরদর্শী নেতা এবং সমাজ সংস্কারক উপহার দিয়েছে।
আজকের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমরা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস স্মরণ করছি না; বরং আমরা পুনর্পাঠ করছি আত্মত্যাগ, দূরদর্শিতা এবং রাজপথের আপসহীন সংগ্রামের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে।
বর্তমান সময়ের তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য দেওবন্দের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, আদর্শিক পরিবর্তন শুরু হয় খাঁটি ইলম থেকে, চরিত্র গঠিত হয় আধ্যাত্মিকতায়, আর জাতির রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ আসে খালেস আত্মত্যাগের মাধ্যমে।
দারুল উলুম দেওবন্দের ১৬০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এর প্রতিষ্ঠাতা হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানুতবি (রহ.), ফকিহুন নাফসান মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গোহী (রহ.), শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান (রহ.) সহ স্বাধীনতা সংগ্রামের সকল আকাবিরদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সালাম জ্ঞাপন করছি।
আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের এই মহান উত্তরাধিকার বহনের তাওফিক দান করুন। আমিন।