18/07/2026
পাকিস্তান ভাঙ্গতে পারে, তবে বালুচিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হতে গেলে আওয়ামী লীগ ও একজন শেখ মুজিব লাগবে
-
প্রখ্যাত দার্শনিক হেগেল বলে গেছেন, একটা রাষ্ট্র হচ্ছে দুনিয়ার বুকে ঈশ্বরের পদযাত্রা। সেই রাষ্ট্র যারা প্রতিষ্ঠা করে, তাদের ঈশ্বরের মতো গুণাবলি থাকতে হয়। তেমনই ঐশ্বরিক নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এখানে ঈশ্বরের মতো বা ‘ঐশ্বরিক’ মানে ধর্মীয় ঈশ্বর নয়। এখানে ‘ঐশ্বরিক’ মানে সামগ্রিক মানবীয় আদর্শ যার অস্তিত্ব ও চিন্তার ভিত্তি। যেগুলো হল তার মানুষদের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও প্রগতির চিন্তা ও সর্বোপরি থাকতে হয় ন্যায়বিচারের গুণ। রাষ্ট্রের অর্থ হচ্ছে তার নাগরিকের সাথে একটি অলিখিত চুক্তি। যে চুক্তি হয় ঐশ্বরিক সংজ্ঞায় ও প্রতিজ্ঞায়।
হাজার হাজার বছর আগে বেদ-উপনিষদ যারা লিখেছিলেন, তারা খেয়াল করেছিলেন যে লোভ, হিংসা, ভয় তথা ইন্দ্রিয়প্রভাবমুক্ত একটি মন—যেটা বিদ্যালয়ের শিক্ষায় অশিক্ষিত ও আইন-কানুন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ হলেও—সেটা ন্যায়বিচার করতে পারে। বেদ-উপনিষদের ধারণায় সকল প্রাণের এই “ন্যায়বিচার” অংশটুকুর সমষ্টিই ঈশ্বর। মানুষের মন, মানুষের অবচেতন নিয়ে কাজ করা খ্যাতনামা মনোবিশ্লেষক কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং বলেছেন, আমাদের মনের মধ্যে এমন কিছু আছে যেটা সার্বিক পর্যবেক্ষণে দক্ষ ও নিজে থেকেই ন্যায্য বিচার করতে পারে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলে গেছেন:
“সরকারি কর্মচারীদের বলি, মনে রেখো, এটা স্বাধীন দেশ। এটা ব্রিটিশের কলোনি নয়। পাকিস্তানের কলোনি নয়। যে লোককে দেখবে, তার চেহারাটা তোমার বাবার মতো, তোমার ভাইয়ের মতো। ওরই পরিশ্রমের পয়সায় তুমি মাইনে পাও। ওরাই সম্মান বেশি পাবে। কারণ, ওরা নিজেরা কামাই করে খায়। আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় ঐ গরিব কৃষক। আপনার মাইনে দেয় ঐ গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ঐ টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক। ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে।”
একজন ঐশ্বরিক নেতার সাথে সমাজের নিম্নতম স্তরের মানুষের সেই আধ্যাত্মিক, আত্মিক যোগাযোগটা থাকে সবসময়। সে হয় সমাজের নিম্নতম স্তরের মানুষের প্রতিনিধি। এবং সেটা শুধু উন্নয়নে যোগাযোগ নয়, সেটা হল মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অধিকারের যোগাযোগ। তাই সে হয় ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব। এমনকি সেটা শুধু জীবিত মানুষ নয়, মৃতদের আত্মার দায়িত্বও।
বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন:
“আজ এ দিনে কেন বলছি একথা? অনেক বলেছি, এত বলার দরকার ছিল না। কিন্তু আমার চোখের সামনে মানুষের মুখ ভাসে। আমার দেশের মানুষের রক্ত ভাসে। আমার চোখের সামনে ভাসে আমারই মানুষের আত্মা। আমার চোখের সামনে সে সমস্ত শহীদ ভাইয়েরা ভাসে, যারা ফুলের মতো ঝরে গেল, শহীদ হল। রোজ কিয়ামতে তারা যখন বলবে, আমার রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করলাম, তোমরা স্বাধীনতা নস্যাৎ করছো, তোমরা রক্ষা করতে পার নাই, তখন তাদের আমি কী জবাব দেব?”
পঁচাত্তরে যারা বঙ্গবন্ধুকে খুন করেছিল তারা আজও ক্ষমা চায়নি। সেই খুনের পরবর্তী বিশ বছর তারা ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি বা তার দল আওয়ামী লীগের স্লোগান “জয় বাংলা” উচ্চারণ করলে চোখ রাঙানি দিয়েছে, মানুষকে তুলে নিয়ে গেছে, হেনস্থা করেছে। এই বিশ বছরেও তারা বঙ্গবন্ধুকে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি কেন? কারণ বঙ্গবন্ধুর ঐ হেগেলীয় ঐশ্বরিকতা যেটি প্রতিটি নিপীড়িত মানুষের হৃদয়ের অংশ। তারাই সেটা ধরে রেখেছিল।
প্লেটোর রিপাবলিকে সবচেয়ে বিখ্যাত অংশগুলোর একটি হল গুহার উপমা, যাকে অ্যালিগরি অব দ্য কেভ বলা হয়। যেখানে প্লেটো একজন বন্দির গল্প বলেন যিনি একটি গুহায় বন্দি থাকাকালীন বাইরের দুনিয়ার কেবল ছায়া দেখতে পান এবং সেগুলোকেই বাস্তবতা বলে মনে করেন। কিন্তু যখন তিনি মুক্ত হন এবং বাইরে আসেন, তখন তিনি সত্যিকারের বাস্তবতা দেখতে পান।
এই উপমা জ্ঞানের সন্ধানে মানুষের যাত্রার প্রতীক এবং প্লেটো বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষা মানুষকে ছায়া থেকে বাস্তব জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়। এখানে শিক্ষা অর্থ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দর্শনের শিক্ষা, যা শুধু পরিণত মানুষই অর্জন করতে পারে। বয়ঃসন্ধির অপরিণত মন থেকে মানুষ পরিণত মানুষ না হলে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যায় না। নিজের মনের সেই গুহা থেকে সে বের হতে পারে না এবং বাস্তবতার বক্র, বিকৃত ছায়াগুলোকেই বাস্তবতা বলে মনে করে।
বালুচিস্তান রাষ্ট্র হতে গেলে সেখানে ঈশ্বরের পদযাত্রা কেউ অনুসরণ করেছে কিনা সেই খবর নিতে হবে। বালুচিস্তানের উঁচু পর্বতগুলোর গুহায় বন্দিরা গুহায় বন্দী হয়ে বাইরের ছায়া দেখে তার সাথে যুদ্ধ করছেন নাকি তাঁরা সত্যিই মুক্ত ও বাস্তবতা দেখছেন সেটা জানতে হবে। এবং তাঁরা উপনিষদের ‘ঐশ্বরিক’ মানে সামগ্রিক মানবীয় আদর্শ ও অস্তিত্বের জন্য লড়াই করছেন, নাকি শুধু্ই নিজ স্বার্থে করছেন সেটাও জানতে হবে। সেসব খবর এখনও আমাদের কাছে পরিষ্কারভাবে আসছে না।
© সিরাজুল হোসেন