10/04/2026
জনাব আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে পরিকল্পনার কথা বলেছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার এবং সাধারণ নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
এই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের করণীয় এবং সরকার সাধারণত যেসব গুরুত্বপূর্ণ দিক এড়িয়ে যায়, তার একটি বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. আমাদের (নাগরিক ও উদ্যোক্তা) করণীয়
দক্ষতা বৃদ্ধি (Skill Development): ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে আমাদের সস্তা শ্রমের নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আইটি, উচ্চতর কৃষি প্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা অপরিহার্য।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion): ব্যক্তিগত সঞ্চয়কে কেবল ঘরে না রেখে ব্যাংকিং চ্যানেলে বা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা। এতে বাজারে মূলধনের প্রবাহ বাড়ে।
উদ্যোক্তা মানসিকতা: কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) গড়ে তোলা। বিশেষ করে কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
রেমিট্যান্সের সঠিক ব্যবহার: প্রবাসী আয় শুধু ভোগবিলাসে ব্যয় না করে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা।
২. সরকার যে বিষয়গুলো সাধারণত এড়িয়ে যায় (বিশ্লেষণ)
সরকার বড় অংকের জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বললেও নিচের মৌলিক সমস্যাগুলো প্রায়ই নজরআন্দাজ করে:
ক. সুশাসনের অভাব ও অর্থ পাচার:
ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য পূরণে বড় বাধা হলো বিনিয়োগের পরিবেশ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুর্নীতি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। এছাড়া দেশ থেকে প্রতি বছর যে বিশাল অংকের টাকা পাচার হয়, তা বন্ধ না করলে জিডিপি বড় হলেও তার সুফল সাধারণ মানুষ পায় না।
খ. শিক্ষার গুণগত মান ও কর্মসংস্থান:
আমাদের শিক্ষার হার বাড়লেও "মান" বাড়ছে না। শিক্ষিত বেকারত্ব ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির জন্য একটি বড় বোঝা। সরকার অবকাঠামোতে প্রচুর বিনিয়োগ করলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগে পিছিয়ে থাকে।
গ. বৈষম্য ও মুদ্রাস্ফীতি:
জিডিপি বাড়ার সাথে সাথে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মুদ্রাস্ফীতির কারণে কমে যাচ্ছে। সরকার সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক (Macro-economic indicators) দেখালেও প্রান্তিক মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।
ঘ. জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈচিত্র্যকরণ:
শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রয়োজন। বর্তমানে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকারের নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
৩. টেকসই উন্নয়নের জন্য উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ
প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি: প্রথাগত পদ্ধতির বদলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করুন যাতে উৎপাদন খরচ কমে এবং লাভ বাড়ে।
সমবায় ভিত্তিক বিনিয়োগ: ছোট ছোট পুঁজিতে বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া। এটি ঝুঁকি কমায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
বাজার সংযোগ (Market Linkage): মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা।
সারসংক্ষেপ:
সরকার যদি দুর্নীতি রোধ, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে কঠোর না হয়, তবে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কেবল একটি কাগুজে সংখ্যা হয়েই থাকবে। আমাদের পক্ষ থেকে সচেতনতা এবং উৎপাদনশীল কাজে শ্রম দেওয়াটাই হবে মূল অবদান।
উন্নয়নের সুফল যাতে প্রতিটি নাগরিক পেতে পারেন, সেজন্য সৃজনশীল বিষয়গুলোকে অর্থনীতির মূল ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী