04/09/2026
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ: প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের করণীয়-
বন্যপ্রাণী কখনোই প্রকৃতি থেকে আলাদা কিছু নয়—ওরা আমাদের পরিবেশ, খাদ্যশৃঙ্খল আর জীববৈচিত্র্যের সাথে একেবারে জড়িয়ে আছে। ছোট্ট একটা পোকা থেকে শুরু করে বাঘ, হাতি, হরিণ কিংবা পাখি প্রতিটি প্রাণীরই প্রকৃতিতে নিজস্ব একটা কাজ আছে। কোনো একটা প্রজাতি হারিয়ে গেলে সেটা শুধু একটা প্রাণীর ক্ষতি নয়, ধীরে ধীরে পুরো বাস্তুতন্ত্রই এর ধাক্কা টের পায়।
আমরা যদি একটু ভেবে দেখি শিকারি প্রাণীরা অন্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে, পাখি-পোকামাকড় পরাগায়ন করে গাছপালা বাঁচিয়ে রাখে, বীজ ছড়িয়ে দেয় নতুন গাছ জন্মানোর জন্য। এভাবেই বন, নদী, জলাভূমি, পাহাড় সবকিছু সচল থাকে। আর এই সচল বাস্তুতন্ত্রই আমাদের খাদ্য, পানি, ওষুধ, বিশুদ্ধ বাতাস দেয়।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ বন্যপ্রাণী নানাভাবে বিপদের মুখে। বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার, চোরাচালান, দূষণ, জলাভূমি ভরাট সবের কারণে অনেক প্রজাতিই আজ বিলুপ্তির পথে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর প্রায় ৮০ লাখ প্রজাতির মধ্যে প্রায় ১০ লাখই এখন হুমকির মুখে সংখ্যাটা সত্যিই ভাবার মতো।
তাহলে করণীয় কী? প্রথম কথা হলো, প্রাণীদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা। শুধু চিড়িয়াখানায় বা খাঁচায় রেখে প্রাণী বাঁচানো কোনো স্থায়ী সমাধান না। বন, নদী, জলাভূমিযেখানে প্রাণীরা স্বাভাবিকভাবে থাকে, সেই জায়গাটাকেই নিরাপদ রাখতে হবে। বন কাটা বন্ধ করা, দেশি গাছ লাগানো, প্রাণীদের চলাচলের পথ (wildlife corridor) অক্ষত রাখা এগুলো এখন সময়ের দাবি।
প্রকৃতি থেকে আমরা যা নিই, সেটাও হতে হবে বুঝেশুনে, দায়িত্ব নিয়ে। মাছ ধরা হোক বা বনজ সম্পদ আহরণ—এমনভাবে করতে হবে যাতে প্রকৃতি নিজেকে আবার পূরণ করার সুযোগ পায়। শুধু নিজেদের লাভের কথা ভাবলে চলবে না।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাটাও জরুরি। অবৈধ শিকারি আর পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। বন্যপ্রাণীর চামড়া, দাঁত, শিং কেনাবেচা এসব থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। কোথাও আহত প্রাণী দেখলে তাকে ঘরে তুলে না নিয়ে বা ছবি তুলে বিরক্ত না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই উত্তম। বনে বেড়াতে গেলে চিৎকার-চেঁচামেচি না করা, প্রাণীদের খাবার না দেওয়া, প্লাস্টিক না ফেলা এই ছোট ছোট সচেতনতাগুলোও অনেক বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
আমরা প্রত্যেকে চাইলেই কিছু না কিছু করতে পারি প্লাস্টিক কম ব্যবহার করা, বর্জ্য যথাস্থানে ফেলা, দেশি গাছ লাগানো, পানি অপচয় না করা, আর সামাজিক মাধ্যমে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে কথা বলা। কোথাও প্রাণীর ওপর নির্যাতন বা অবৈধ শিকার দেখলে চুপ না থেকে জানানোটাও আমাদের নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
আরেকটা বিষয় ভুললে চলবে না যেসব মানুষ জীবিকার জন্য বনের ওপর নির্ভরশীল, তাদের বাদ দিয়ে সংরক্ষণ সম্ভব না। তাদের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে, তবেই দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগ টিকবে। সরকার, বন বিভাগ, গবেষক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্থানীয় মানুষ সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।
আসলে বন্যপ্রাণী রক্ষা মানে শুধু বাঘ-হাতি-হরিণকে বাঁচানো নয়, এটা আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎকেও নিরাপদ রাখা। একটা প্রজাতি হারিয়ে গেলে খাদ্যশৃঙ্খলে পরিবর্তন আসে, বাস্তুতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে আর এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমাদের ওপরও এসে পড়ে। তাই প্রকৃতিকে জয় করার চিন্তা না করে, প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকাটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
আজ থেকে আমরা সবাই একটা অঙ্গীকার করি শিকার নয়, সংরক্ষণ করব; ধ্বংস নয়, রক্ষা করব; অপচয় নয়, টেকসই ব্যবহার করব। কারণ বন্যপ্রাণী বাঁচলেই প্রকৃতি বাঁচবে, আর প্রকৃতি বাঁচলেই আমরাও বাঁচব।
আসুন, নিজেদের প্রয়োজনের পাশাপাশি প্রকৃতির প্রয়োজনটাকেও গুরুত্ব দিই, আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাই একটা সবুজ, নিরাপদ পৃথিবী।
সচেতনতায়—
মো. ফরিদ আহমদ
সভাপতি, প্রাণের টানে রক্তদান
তথ্য সংগ্রহ গুগল -