24/01/2026
তরুণ প্রজন্ম কি শিখছে এবং শিখতে পারে তারেক রহমানের নির্বাচনী ক্যাম্পেইন থেকে? একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে দেখি। গতকাল সিলেটের জনসভায় তারেক রহমানের বক্তব্যকে ছাপিয়ে যে বিষয়টি আমাকে অভিভূত করেছে তা হলো তাঁর অভূতপূর্ব কনফিডেন্স। রাজনীতিতে জড়িত এবং জড়িত নন যারা, তাদের জন্যও চমৎকার মোটিভেইশনের উপাদান রয়েছে এখানে।
মানুষের বিস্মিত হবার কারণ আছে বৈকি! বাংলাদেশে কোনো নেতা হঠাৎ করে নিজের আগের সংস্করণকে ছাপিয়ে সম্পূর্ণ নতুন, প্রাণবন্ত, এবং ঝলমলে রূপে হাজির হবেন, এমন দেখা যায়নি আগে। সিলেটের এই জনসভা সেই বিরল মুহূর্তগুলোর একটি। এখানে যে তারেক রহমানকে দেখা গেলো, এ প্রজন্ম এমন তারেককে দেখেনি আগে।
দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো যেন তিনি নিজের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে দর্শকের সামনে একজন শো-রানার হিসেবে দাঁড়ালেন। গতানুগতিক রাজনৈতিক বক্তৃতার ক্লান্তিকর গাম্ভীর্য ছুঁড়ে ফেলে তিনি দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন করলেন, মঞ্চে মানুষ তুললেন, ছোট ছোট মজার খোঁচা দিলেন, ছেলেমেয়েদের হাসালেন, আবার তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বার্তাও গেঁথে দিলেন। অসাধারণ স্টেইজ ক্রাফট। মোমেন্টাম সৃষ্টি করলেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারেক রহমান অবশেষে নিজের সবচেয়ে বড় শত্রুকে জয় করেছেন, নিজেকেই। বছরের পর বছর তাকে দেখা গেছে নিষ্প্রভ, এনার্জি ছাড়া এক স্ক্রীন লিডার৷ একই সেট, একই টোন, একই ক্লান্ত মুখ, একই ম্রিয়মাণ দেহভঙ্গি। অনেকে সন্দেহ করেছেন তার দক্ষতা নিয়ে, এমনকি তার মানসিক দৃঢ়তা নিয়েও। এই আক্রমণগুলো শুধু প্রতিপক্ষের কাছ থেকেই আসেনি। দুঃখ ক্লান্ত, দেশে ফিরতে না পারা মানুষ হিসেবে সত্যিই তাকে দুর্বল দেখাতো।
সাধারণ মানুষ তাঁর মনোজগতে তুমুল ভাঙা গড়া বুঝতে চাইতো না। স্বৈরশাসকের নিষ্পেষণ যেন তাদেরকেও একরোখা করে দিয়েছিলো। স্বাভাবিক অবশ্যই। একজন মানুষের সামনে যদি তাঁর বৃদ্ধা মাকে জেলে টেনে নেওয়ার দৃশ্য গেঁথে থাকে, একমাত্র ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর চিত্র থাকে, হাজার হাজার নেতা কর্মীর লাশ থাকে, পঙ্গুত্ব থাকে, তাদের সংসার গড়তে না পারা থাকে, এবং লক্ষ লক্ষ জীবন নষ্ট হবার চিত্র থাকে, প্রতিদিন যদি পরিবারকে অপমান সহ্য করতে হয়, তাহলে সেটি যে কাউকেই ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারে। তারেক রহমানের নিস্প্রভ এবং দুঃখময় চেহারা দেখে আমার তেমনি মনে হতো।
কিন্তু আজকের তারেক সম্পূর্ণ অন্যরকম এক মানুষ। তাঁর কনফিডেন্স লেভেল এখন তুঙ্গে। এবং এটি তিনি ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন, নিজেকে জয় করেছেন, এজন্য তাঁর অবশ্যই সাধুবাদ পাওনা। তরুণ প্রজন্মের আছে শিখবার বহু কিছু। কেননা, তরুণদের একটি অংশ তাকে রাজনৈতিক রিয়েলিটি শো এর ব্যাকড্রপ হিসেবে দেখে হতাশ হতেন, জড় অবসন্ন, বিচ্ছিন্ন এবং আর সম্ভব নয়, এমন হিসেবে। অথচ আজ দেখা গেলো, জীবনে কখনো এমন সময় আসে যখন মনে হয় এই বুঝি শেষ। কিন্তু আসোলে শেষ নয়। আবার ঘুরে দাঁড়ানো যায় এবং সম্ভব।
তারেক রহমান শুধু বক্তৃতাই করছিলেন না, তিনি যেন একটি লাইভ ম্যাগাজিন শো হোস্ট করেছেন গতকাল। মঞ্চে তার চঞ্চল চলাফেরা, হাত নাড়াবার ভঙ্গিমা, চোখের আত্মবিশ্বাস, সবকিছু ছিলো তীক্ষ্ণ, নিয়ন্ত্রিত, এবং অপ্রত্যাশিতভাবে প্রাণবন্ত। ক্রাউডের চোখে তাকিয়ে কথা বলছিলেন, মজা করছিলেন, মঞ্চে মানুষ তুলেছেন, তাদের সাথে সরাসরি ইন্টার্যাকশন করছিলেন।
এমনকি রসিকতার মাধ্যমে দলীয় ইনসাইড জোক 'গুপ্ত' শব্দটিকে নিজের চোখের এবং বলবার ভঙ্গি দিয়ে হিউমারের মাধ্যমে হালকা এক অস্ত্রে পরিনত করলেন। একপ্রকার সেম্যান্টিক কাউন্টার এটাক দিয়ে শব্দটির স্টিংকে নিস্ক্রিয় করা। এবং এভাবেই তাঁর বক্তব্যের স্পেইসটি তিনি নিজের মতো কোরিওগ্রাফ করেছেন পুরোটা সময় ধরে।
কেন তারেক রহমানের কনফিডেন্স আজ এত তুঙ্গে? এর কারণ প্রথমত, লেজিটিমেসি। মানুষের ভালোবাসা, আকাঙ্খা, সুশীল সমাজ সহ আপামর জনসাধারণের প্রশংসা, দলের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা, ভরসা, এবং প্রতিটি মাঠে লাখো মানুষের উপস্থিতি। এই জিনিসগুলো যেকোনো নেতার আত্মবিশ্বাসকে ব্রেক-থ্রু দেয়। মনে সদিচ্ছা থাকলে সেই নেতা উজ্জল থেকে উজ্জলতর হতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, ন্যারেটিভ-কন্ট্রোল। তিনি জানেন, তরুণেরা তার কাছ থেকে শক্তি খুঁজছে। পুরনো কাঠামোর ঠাণ্ডা বক্তৃতা নয়, নতুন ধরনের নেতৃত্ব খুঁজছে। যেখানে হিউমার, আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা, এবং মানুষ হিসেবে সাধারণ যে স্বাভাবিকতা, সব থাকবে একসাথে। এমন নেতা খুঁজছে তরুণরা। একজন লিডার, ফিগার প্রয়োজন ছিলো তাদের। এজন্যই তারেক রহমান আজ এক ক্রেইজের নাম।
ভোটের মাঠে তাঁর প্রতিপক্ষ দলের ন্যারেটিভটিও তিনি দখল করলেন। জামাতের যে ধর্মীয় আবেগ বাণিজ্য "জামাতে ভোট দিলে সরাসরি জান্নাত", এই বিষয়টিকে শিরকের সাথে তুলনা করে মোরাল অথরিটি প্রতিষ্ঠা করলেন। কারো পক্ষে আর জামাত ইসলামের দল তাই ভোট দিলে বেহেশত এই ন্যারেটিভ চালানোই কঠিন হয়ে যায় যখন জাতীয়তাবাদী দলের প্রধান নেতা সেটিকে শিরকসুলভ আখ্যান হিসেবে চিহ্নিত করেন। এটা রাজনৈতিক নয়, মৌলিক ধর্মীয় যুক্তি। চমৎকার।
বাংলাদেশের তরুণ শ্রোতাদের কাছে এর প্রভাব গভীর। কারণ, আমরা মুসলমান। তরুণরাও ইসলামের প্রতি আগ্রহী, ধর্ম নিয়ে আবেগী স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু একইসঙ্গে তরুণরা প্রশ্ন করতে জানে, জানে যুক্তিও। সুতরাং তাদের প্রতি তারেকের আহবান যে প্রশ্ন করুন, যুক্তি দিয়ে ভাবুন এবং এরপর বিচার করুন। দ্যাটস ইট।
তারেক রহমানের এই কনফিডেন্স তরুণদের যেমন নিজ ব্যক্তিগত জীবনে হতাশার মুহুর্তে নিজেকে ধরে রেখে সময়ের অপেক্ষা করতে শেখাতে পারে, তেমন শেখাতে পারে নেতৃত্ব-নীতি, লিডারশিপ নীতি। পরিস্থিতি আপনাকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু সঠিক সময় আপনাকে পুনর্জন্ম দেয়। পরিবেশ বদলালে শক্তি ফিরতে সময় লাগে, কিন্তু ফিরে আসা সম্ভব। তারেক রহমানের এই জার্নি মনে করিয়ে দেয়, মানুষ কখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।
নিজের নির্যাতিত হবার দুঃখ, দেশে মাটি স্পর্শ না করবার যন্ত্রণা, মায়ের দুঃখ, নেতা কর্মীদের দুঃখ কষ্ট ভরা জীবন, দেশের দূরত্ব, দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা, সবকিছুই এক সময় তাকে নিজের ভেতর বন্দী রেখেছিলো। চিড় ধরিয়ে দিচ্ছিলো তাঁর মানবিক আত্মবিশ্বাসের দেয়ালে। কিন্তু যখন পরিবেশ বদলেছে, সম্মান, মানুষের উপস্থিতি, দলের আস্থা, তখন আত্মবিশ্বাসও ফিরে এসেছে। তিনি তাঁর সত্যিকার প্রাণবন্ততা এবং নেতৃত্বকে প্রকাশ করতে পারছেন।
লিডারশিপ নীতিতে আপনার স্টাইলও প্রয়োজনীয়। তারেক রহমানের আজকের পারফরম্যান্স ছিলো ক্রাফটেড ক্যারিশমা। হিউমার, চোখের ভঙ্গিমা, শ্রোতার সাথে ডিরেক্ট ইন্টারঅ্যাকশন। এগুলো সব মিলিয়ে একটি আধুনিক পোলিটিক্যাল পারফরম্যান্স। যা আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে দেখতে পাই। মাইকের সামনে রোবটিক বয়ান বক্তব্য নয়। প্রাণোচ্ছল, ফুল অফ লাইফ। রাজনীতিতে শুধু নীতি নয়, এনার্জিও একটি সিগনাল দেয়। আর সেই সিগনালেই নতুন প্রজন্মের আস্থা তৈরি হয়।
আরেকটি হলো, নিজের ন্যারেটিভের নিয়ন্ত্রণ নিতে শেখা। নইলে অন্যেরা তা লিখে দেবে নিজের মত করে। এবং মানুষ তা'ই বিশ্বাস করতে শুরু করবে। বছরের পর বছর তারেক রহমানকে নিয়ে প্রতিপক্ষ লিখেছে একতরফা গল্প। দুর্বল, অদূরদর্শী, ভঙ্গুর, নিষ্ক্রিয়। কিন্তু আজকের তারেক ঐ গল্প ভেঙে নিজের গল্প নিজে লিখছেন। ন্যারেটিভ ইজ পাওয়ার। ওউন ইট অর বি ওউন্ড বাই ইট।
এই পুরো ঘটনায় তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, আত্মবিশ্বাস শুধু ব্যক্তিগত বিষয়ই নয়। এটি একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্ত্র। নেতার কণ্ঠে যদি দৃঢ়তা থাকে, বডি ল্যাঙ্গুয়েযে যদি এনার্জি থাকে, বক্তব্যে যদি ফ্লুইডিটি থাকে, তাহলে মানুষ নিজ থেকেই বিগত দিনে তাকে নিয়ে তৈরী করা অতীত চিত্র ভেঙে দেয়। আগের দুর্বলতা ভুলে যায়, ভুলে যায় তার আগের ব্যর্থতা যদি কিছু থেকে থাকে। পরের কাজ হলো, এই গ্রহনযোগ্যতাকে ধরে রাখা।
সুতরাং প্রিয় তরুণ প্রজন্ম, আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আপনাকে কেউ বিশ্বাস না করলেও নিজের সম্ভাবনার প্রতি আস্থা রাখুন। সেখানে বিনিয়োগ করুন সব কিছুতে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েও। সুযোগ এলে সেটিকে স্টেইজে পরিণত করুন। পরিবেশ বদলায়। সময় বদলায়৷ আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে থাকেন। এবং সেটি বদলালে নিজের নতুন ভার্সন নিয়ে হাজির হতে অবশ্যই ভয় পাবেন না।
এবং সবচেয়ে বড় যেটি, সেটি হলো আত্মবিশ্বাস, কনফিডেন্স। এই কনফিডেন্স যদি অথেনটিক হয় তবে সেটি ১৫ মিনিটেই পুরো প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলতে পারে। আর আপনি নিজেও, নিজের ব্যক্তিগত জীবনে এর প্রয়োগ ঘটাতে পারেন। সাফল্যের জন্য দোয়া।