KBSK Welfare Trust

KBSK Welfare Trust ক্ষিতীশ-বিজলী-শিমুল-কনিকা(KBSK) ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট।

02/08/2026

বৌদ্ধধর্মানুসারে সংসারের শেষ কোথায়?

ভূমিকা
বৌদ্ধধর্মে সংসার (Saṃsāra) বলতে জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের অবিরাম চক্রকে বোঝানো হয়। যতদিন জীবের মধ্যে অবিদ্যা (Avijjā), তৃষ্ণা (Taṇhā) ও উপাদান (Upādāna) বিদ্যমান থাকে, ততদিন সে কর্মের দ্বারা পরিচালিত হয়ে এক জীবন থেকে অন্য জীবনে প্রবাহিত হয়। বুদ্ধের শিক্ষা অনুসারে সংসারের কোনো নির্দিষ্ট স্থানিক শেষ নেই; বরং এর শেষ হলো নির্বাণ (Nibbāna) লাভের মাধ্যমে জন্ম-মৃত্যুর চক্রের অবসান।

১. সংসারের ধারণা
পালি Saṃsāra শব্দের অর্থ হলো "বারবার প্রবাহিত হওয়া" বা "ঘুরে বেড়ানো"। জীব কর্মের (Kamma) প্রভাবে বিভিন্ন গতি বা অস্তিত্বে জন্মগ্রহণ করে—
দেবলোকে,
মনুষ্যলোকে,
তির্যকযোনিতে,
প্রেতলোকে,
নরকলোকে।
এই জন্ম-মৃত্যুর ধারাবাহিকতাই সংসার।

বুদ্ধ বলেছেন—
"Anamataggoyaṃ bhikkhave saṃsāro"
অর্থ: "হে ভিক্ষুগণ, এই সংসারের কোনো আদি-অন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না।"

অর্থাৎ সংসারের শুরু নির্ণয় করা যায় না; অসংখ্য অতীত জন্ম ধরে জীব এই চক্রে আবদ্ধ।

২. সংসারের মূল কারণ
বৌদ্ধ দর্শনে সংসারের কারণকে প্রতীত্যসমুৎপাদ (Paṭiccasamuppāda) দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এর মূল সূত্র:
অবিদ্যা → সংস্কার → বিজ্ঞান → নামরূপ → ষড়ায়তন → স্পর্শ → বেদনা → তৃষ্ণা → উপাদান → ভব → জাতি → জরা-মরণ
এখানে—

(ক) অবিদ্যা (Avijjā)
চার আর্যসত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা হলো অবিদ্যা। জীব অনিত্যকে নিত্য, দুঃখকে সুখ এবং অনাত্মাকে আত্মা মনে করে।

(খ) তৃষ্ণা (Taṇhā)
ইন্দ্রিয়সুখ, অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের প্রতি আকাঙ্ক্ষাই তৃষ্ণা।

(গ) উপাদান (Upādāna)
তৃষ্ণা গভীর আসক্তিতে পরিণত হলে জীব কর্ম সৃষ্টি করে এবং পুনর্জন্মের কারণ তৈরি হয়।

৩. সংসারের শেষ কোথায়?
বৌদ্ধধর্মে সংসারের শেষ কোনো ভৌগোলিক স্থান নয়। এটি কোনো পাহাড়, সমুদ্র বা বিশেষ জগত নয়। সংসারের প্রকৃত শেষ হলো—
নির্বাণ (Nibbāna)
নির্বাণ অর্থ:
তৃষ্ণার ক্ষয়,
লোভ, দ্বেষ ও মোহের বিনাশ,
জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি।

বুদ্ধ বলেছেন—
"Khīṇā jāti, vusitaṃ brahmacariyaṃ, kataṃ karaṇīyaṃ, nāparaṃ itthattāyāti pajānāti."
অর্থ: "জন্ম ক্ষয় হয়েছে, পবিত্র জীবন সম্পন্ন হয়েছে, যা করার ছিল তা করা হয়েছে; এখন আর পুনর্জন্ম নেই।"
এটাই সংসারের চূড়ান্ত অবসান।

৪. নির্বাণই কেন সংসারের শেষ?

১. তৃষ্ণার অবসান
সংসারের প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৃষ্ণা। যখন তৃষ্ণা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়, তখন নতুন কর্ম ও পুনর্জন্মের কারণ থাকে না।

২. কর্মের বন্ধন ছিন্ন হয়
অরহৎ ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় পূর্বকর্মের ফল ভোগ করলেও নতুন জন্মের জন্য কর্ম সঞ্চয় করেন না।

৩. অনিত্য ও অনাত্ম জ্ঞান লাভ
যিনি সমস্ত অস্তিত্বের অনিত্যতা, দুঃখ ও অনাত্ম প্রকৃতি উপলব্ধি করেন, তাঁর মধ্যে আসক্তি থাকে না।

৫. অরহত্ত্ব ও সংসারের অবসান
বৌদ্ধধর্মে অরহৎ (Arahat) হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি—
দশ সংযোজন (Saṃyojana) ধ্বংস করেছেন,
লোভ, দ্বেষ ও মোহ নির্মূল করেছেন,
নির্বাণ উপলব্ধি করেছেন।
মৃত্যুর পর অরহতের ক্ষেত্রে বলা হয়—
Parinibbāna (পরিনির্বাণ)
অর্থাৎ পুনরায় কোনো জন্ম গ্রহণ করতে হয় না।

৬. সংসারের শেষ সম্পর্কে বুদ্ধের শিক্ষা
বুদ্ধ সংসারের শুরু খোঁজার চেয়ে সংসারের শেষ করার পথকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ অতীতের শুরু জানা নয়, বরং বর্তমান দুঃখের অবসান করাই মানুষের প্রকৃত লক্ষ্য।

তিনি শিক্ষা দিয়েছেন—
চার আর্যসত্য (Cattāri Ariyasaccāni):
১. দুঃখ (Dukkha) — সংসার দুঃখময়।
২. দুঃখসমুদয় (Dukkhasamudaya) — তৃষ্ণা দুঃখের কারণ।
৩. দুঃখনিরোধ (Dukkhanirodha) — তৃষ্ণার ক্ষয়ে দুঃখের অবসান সম্ভব।
৪. দুঃখনিরোধগামিনী প্রতিপদা — অষ্টাঙ্গিক মার্গ মুক্তির পথ।

৭. সংসারের শেষের পথ
সংসার থেকে মুক্তির জন্য বুদ্ধ আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ শিক্ষা দিয়েছেন—

প্রজ্ঞা (Paññā)
১. সম্যক দৃষ্টি (Sammā Diṭṭhi)
২. সম্যক সংকল্প (Sammā Saṅkappa)

শীল (Sīla)
৩. সম্যক বাক্য
৪. সম্যক কর্ম
৫. সম্যক আজীবিকা

সমাধি (Samādhi)
৬. সম্যক প্রচেষ্টা
৭. সম্যক স্মৃতি
৮. সম্যক সমাধি
এই পথ অনুশীলনের মাধ্যমে তৃষ্ণা ক্ষয় হয় এবং নির্বাণ লাভ হয়।

৮. সংসারের শেষ সম্পর্কে যুক্তিসঙ্গত বিশ্লেষণ
যদি সংসারের কারণ থাকে, তবে তার ফলও থাকবে। বৌদ্ধ যুক্তি অনুযায়ী—
কারণ = অবিদ্যা ও তৃষ্ণা
ফল = জন্ম, জরা, মৃত্যু ও দুঃখ
যদি কারণ ধ্বংস করা যায়, তবে ফলও ধ্বংস হয়। যেমন প্রদীপে তেল ও সলতে না থাকলে আগুন নিভে যায়, তেমনি তৃষ্ণা ও অবিদ্যা না থাকলে পুনর্জন্মের আগুনও নির্বাপিত হয়।

এ কারণে বৌদ্ধধর্মে সংসারের শেষ হলো নির্বাণ, যেখানে আর জন্ম, মৃত্যু ও দুঃখের প্রবাহ থাকে না।

উপসংহার
বৌদ্ধধর্ম অনুসারে সংসারের শেষ কোনো স্থান নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ও মুক্তির অবস্থা। অবিদ্যা, তৃষ্ণা ও আসক্তির কারণে জীব সংসারে আবদ্ধ থাকে। শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলনের মাধ্যমে যখন তৃষ্ণা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়, তখন নির্বাণ লাভ হয়। আর নির্বাণই হলো সংসারের চূড়ান্ত শেষ—জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে পরম মুক্তি।

তথ্যসূত্র:
দীঘনিকায় (Dīgha Nikāya)
মজ্ঝিমনিকায় (Majjhima Nikāya)
সংযুক্তনিকায় (Saṃyutta Nikāya)
ধম্মপদ (Dhammapada)
অভিধর্ম পিটক (Abhidhamma Piṭaka)

জ্ঞানরত্ন ভান্তের পেইজ থেকে সংগৃহীত #

28/07/2026
বাবার সাথে আমি।
18/07/2026

বাবার সাথে আমি।

Good morning everyone, stay safe.
07/07/2026

Good morning everyone, stay safe.

Good night everyone, stay safe.
04/07/2026

Good night everyone, stay safe.

শুভ সকাল।
04/07/2026

শুভ সকাল।

সবাইকে মৈত্রীময় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।
03/07/2026

সবাইকে মৈত্রীময় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

রাম চরিতের সবচেয়ে বড় পর্দা ফাঁস: বুদ্ধ এবং সম্রাট অসোকের কৃতিত্বকে আত্মসাৎ ড. বরসম্বোধি ভিক্ষুএ আলেখ্য কিছুটা দীর্ঘ, কি...
06/06/2026

রাম চরিতের সবচেয়ে বড় পর্দা ফাঁস: বুদ্ধ এবং সম্রাট অসোকের কৃতিত্বকে আত্মসাৎ

ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

এ আলেখ্য কিছুটা দীর্ঘ, কিন্তু যদি আজ আপনি নিজের ব‍্যস্ত জীবন হতে দশ মিনিট বের করে সম্পূর্ণ লেখা পড়ে থাকেন, তাহলে ইতিহাসকে দেখা আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ের জন‍্য পরিবর্তন হয়ে যাবে। এরূপ ঐতিহাসিক সত‍্যকে খোঁজা এবং একেক অকাট‍্য লিখিত বিষয়ের (Reference) সাথে আপনার সামনে নিয়ে আসতে অনেক মাস ব‍্যাপী কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। যদি আপনার মনে হবে যে, এ অপ্রিয় সত‍্য এবং বৈজ্ঞানিক সত‍্য প্রত‍্যেক মূল নিবাসী ভাই-বোন পর্যন্ত পৌঁছা উচিত বলে মনে করেন, তাহলে ইহাকে অধিক হতে অধিকতর শেয়ার করার চেষ্টা করবেন।

আপনি কি জানেন যে, যাঁকে আজ ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম রাম’ দাবী করে ঐতিহাসিক প্রমাণ করার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে, তা সত‍্যিকারভাবে কোনো স্বতন্ত্র বা ঐতিহাসিক চরিত্র নয়? বৌদ্ধ ধম্মের বিজ্ঞান এবং মৌর্য সম্রাজ‍্যের গৌরবকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করার জন‍্য ভগবান তথাগত বুদ্ধ এবং সম্রাট প্রিয়দর্শী অসোকের জীবনের বাস্তবিক ঘটনা সমূহকে মিশ্রিত করে ‘রাম’ এর এ কাল্পনিক পৌরাণিক পাত্র গড়া হয়েছে। আসুন, তাহলে জন্ম হতে নিয়ে সম্রাজ‍্যের অন্ত পর্যন্ত একেক ঐতিহাসিক দিক, সেগুলির অকাট‍্য প্রমাণ এবং যৌক্তিক সত‍্যকে মুখোমুখি রেখে বুঝার চেষ্টা করব।

১) দেরীতে জন্ম এবং অনেক বিবাহের ইতিহাস (The Late Birth and Marriage)
—————————————-

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: ঐতিহাসিক রূপে রাজা শুদ্ধোদনের বহু আশা-প্রত্যাশা ও মানতের পরে অনেক বিলম্বে রাজকুমার সিদ্ধার্থকে পুত্র রত্ন রূপে লাভ করেছিলেন। রাজা শুদ্ধোদন স্বীয় জীবনে দু’টি বিবাহ (সহোদর বোনদ্বয়-মহামায়া এবং মহাপ্রজাপতি গৌতমী) করেছিলেন।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ডগণ হুবহু সে ইতিহাসকে চুরি করেছেন এবং কাহিনী বানিয়েছেন যে, রাজা দশরথের বৃদ্ধাবস্থায় এবং বহু দেরীতে রামের জন্ম হয়েছিল। নিজের কাহিনীকে বৌদ্ধ ইতিহাস হতে বড় এবং চমৎকারী দেখানোর জন‍্য ভণ্ড প্রথারকগণ রাজা শুদ্ধোদনের দু’ রাণীর বিপরীতে রাজা দশরথের চার বিবাহ (চারজন রাণী) দেখিয়েছে, যাতে তাঁকে বৌদ্ধ রাজার চেয়ে শ্রেষ্ট দেখাতে পারে।

অকাট‍্য প্রমাণ (Reference) : বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘মহাবস্তু’ (Mahavastu) এবং ‘ললিতবিস্তর’ এর বিপরীতে বাল্মীকি রামায়ণে (বাল কাণ্ড), যেখানে দশরথের রাণীগণের পুত্রেষ্টি যজ্ঞের অতিশয়োক্তি কাহিনী যুক্ত করা হয়েছে।

২) বাল‍্যকালের পক্ষী প্রেম এবং জটায়ুর রূপক
———————————

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: বুদ্ধের বাল‍্যকালের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কাহিনী হংসের রক্ষা করার বিষয় রয়েছে। (সিদ্ধার্থ এবং দেবদত্তের হংস বিবাদ) এখানে রাজকুমার সিদ্ধার্থ তিরবিদ্ধ হংসকে জীবন দান দিয়েছিলেন।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড প্রতারকগণ রাজকুমার সিদ্ধার্থের এ পক্ষী-প্রেমের (হংস) প্রতীককে রামায়ণে ‘জটায়ু’ (গিদ্ধ) রূপে প্রস্তুত করা হয়েছে, যা রামের জন‍্য নিজের জীবন দিয়েছে দেখানো হয়েছে।

সন্দর্ভ প্রমাণ (Reference): বৌদ্ধ জাতক কাহিনীর বাল‍্যকালের সংস্করণ এবং অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিত’ (Buddhacharita).

৩) স্বয়ম্বর এবং ভারী ধনুষ চালনার ইতিহাস (The Archery tournament)
——————————-

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: রাজকুমার সিদ্ধার্থের বিবাহ কোনো সাধারণ বিবাহ ছিলনা। শাক‍্য পরাক্রমীদের পরম্পরানুসারে রাজকুমারী যশোধরার হাত পাওয়ার জন‍্য সিদ্ধার্থকে যুদ্ধকলার এক খোলা প্রতিযোগিতার মাধ‍্যমে (শিল্প-প্রদর্শন স্বয়ম্বরা) যেতে হয়েছিল। এ প্রতিযোগিতায় সিদ্ধার্থ পরাক্রমীদের এক প্রাচীন এবং অনেক ভারী ধনুষকে উঠিয়ে নিশানা লাগাতে হয়েছিল। যা অন‍্য কোনো রাজকুমারেরা উঠাতে পারছিলেননা। এ বীরত্বকে দেখেই যশোধরা তাঁকে বরমাল্য পরিয়ে দিয়েছিলেন।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড -প্রতারকেরা বুদ্ধের জীবনের এরূপ ঐতিহাসিক স্বয়ম্বর এবং ভারী ধনুষ চালানোর কৌশলকে চুরি করেছে। তারা ইহাকে ভগবান শিবের পিনাক ধনুষ নাম দিয়ে অমানবীয় এবং জাদুকরী চমৎকারে পরিবর্তন করে দিয়েছিল যে, রাম ধনুষ উঠিয়েছিলেন এবং তা মাঝখানে ভেঙ্গে গিয়েছিল। যাতে মূল মানবীয় বীরত্বকে লুকানো যেতে পারে।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ (Reference): বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘ললিত বিস্তর’ (Lalitavistara) অধ‍্যায়-১২) এবং মহাকবি অশ্বঘোষ বিরচিত ‘বুদ্ধচরিত’ (Buddhacharita) সর্গ-২) যেখানে সিদ্ধার্থ দ্বারা ভারী ধনুষ চালিয়ে দেবদত্ত এবং অন‍্য রাজকুমারদেরকে হারিয়ে যশোধরার সাথে বিবাহ করার সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে।

৪) সর্বদা সাথে থাকা বিশ্বাসী ভাই (The Companion)
———————————————

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: বুদ্ধের সাথে সর্বদা ছায়ার মতো তাঁর চাচাতো ভাই এবং সবচেয়ে বিশ্বাসী শিষ‍্য ‘আনন্দ’ স্থবির থাকতেন। তিনি যে কোনো পরিস্থিতিতে বুদ্ধের সাথে ছিলেন।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড প্রতারকগণ আনন্দ স্থবিরের এরকম ঐতিহাসিক এবং বিশ্বাসী চরিত্রকে রামের সাথে ‘লক্ষ্মণ’ রূপে যুক্ত করে দিয়েছে, যিনি ছায়ার মতো রামে সাথে থাকতেন।

প্রামান‍্য সন্দর্ভ (Reference): পালি গ্রন্থ দীর্ঘ নিকায়ের (Digha Nikaya) ‘মহাপরিনির্বাণ সূত্র’, যেখানে বুদ্ধ এবং আনন্দ স্থবিরের অটুট সম্বন্ধের বিবরণ রয়েছে।

৫) সম্মতির সাথে গৃহত‍্যাগ বনাম গর্ভবতীর ক্রুরতা সহকারে ত‍্যাগ
——————————————

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: ভণ্ড-প্রতারকগণ এরূপ দেখিয়ে থাকে যে, রাজকুমার সিদ্ধার্থ স্বীয় পত্নীকে রাতের গভীরে ঘুমন্ত অবস্থায় ত‍্যাগ করে পলায়ন করেছিলেন, যা হল সরাসরি মিথ‍্যা। রাজকুমার সিদ্ধার্থ যশোধরার সম্পূর্ণ সম্মতি এবং মানসিক প্রস্তুতির পরেই নতুন অনুসন্ধান এবং ধম্মের মার্গের খোঁজে বের হয়েছিলেন। সিদ্ধার্থের শ্বশুড় সুপ্রবুদ্ধ স্বয়ং ছিলেন বৌদ্ধ পরম্পরার জ্ঞাতা। বুদ্ধত্ব বা বুদ্ধ হওয়া প্রাচীন ভারতে এক সর্বোচ্চ মানসিক পদ (Title), যা তিনি কঠোর সাধনায় অর্জন করেছিলেন।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড-প্রতারকগণ এরূপ বৈজ্ঞানিক গৃহত‍্যাগকে বিকৃত করেছে এবং রাম দ্বারা গর্ভবতী সীতাকে ধোবীর অভিযোগের ভিত্তিতে অমানবীয় পদ্ধতিতে জঙ্গলে ত‍্যাগের ক্রুরতাপূর্ণ কাহিনী গড়ে দিয়েছে, যাতে সমাজে পিতৃ তান্ত্রিকতাকে স্থাপন করা যায়।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ (Reference): থেরীগাথা (Therigatha) এবং বৌদ্ধ ইতিহাসের ব‍্যখ‍্যা সমূহ, যা যশোধরা এবং সিদ্ধার্থের বৈচারিক ভাবনার প্রগাঢ় সম্বন্ধের প্রমাণ করে থাকে।

৬) ঘরের বাহিরে বার বছর থাকার সময় চক্র
——————————-

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: রাজকুমার সিদ্ধার্থ যখন স্বীয় জ্ঞান মার্গের অনুসন্ধানের জন‍্য বের হয়েছিলেন, তখন তিনি ছয় বছর পর্যন্ত জঙ্গলে কঠিন তপস‍্যা এবং ভ্রান্ত পথে ঘুরাফিরার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এর পর তিনি ধম্মের প্রচার করতে এবং নিজের ভিত শক্ত করতে নিয়োজিত ছিলেন। অর্থাৎ জ্ঞান প্রাপ্ত করার পর প্রায় ১১ বছর পর্যন্ত কপিলবাল্তুর বাহিরে থেকেছিলেন। এরপর তাঁর স্বীয় পিতৃরাজ‍্যে প্রত‍্যাবর্তন হয়েছিল।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড- প্রতারকেরা প্রাসাদ হতে বুদ্ধের ১১ বছর বাহিরের থাকার এরূপ ১১ বছরের ঐতিহাসিক সময় চক্রকে চুরি করেছে। বাল্মীকি রামায়ণে ইহাকে ১৪ বছরের বনবাস বানিয়ে দিয়েছে। যাতে, ইহার মূল বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘দশরথ জাতক’ হতে কিছুটা আলাদা হয়ে দেখা যায়। কিন্তু ইহার মূল শিকড় বুদ্ধের ১১ বছর হতেই চুরি করা হয়েছে।

প্রামাণিক সন্দর্ভ (Reference) বৌদ্ধ গ্রন্থ খুদ্দক নিকায়ের ‘দশরথ জাতক’ (Dasaratha Jataka- Jataka No. ৪৬১) যেখানে রামকথার সবচেয়ে প্রাচীন রূপ পাওয়া যায় এবং সেখানে পরিস্কার লিখা রয়েছে যে, রাজা দশরথ কর্তৃক পুত্র রামকে কেবল ১২ বছরের জন‍্যই বনবাসের আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

৭) দীপাবলীতে দীপ সমূহের প্রকৃত রহস্য (দীপদানোৎসব)
——————————

প্রকৃত কথা বৌদ্ধ ইতিহাস: যখন বুদ্ধ সম্বোধি জ্ঞান (Enlightenment) লাভ করে ১২ বছর পরে প্রথমবার কপিলবাস্তু প্রত‍্যাগমণ করেছিলেন, তখন তাঁকে স্বাগত জানাতে লোকেরা হাজার হাজার দীপক জ্বালিয়েছিলেন। বৌদ্ধ পরম্পরায় দীপের অর্থ ‘আন্তরিক জ্ঞানের আলো’ (Enlightenment) হয়ে থাকে। এজন‍্য আজও সমগ্র পৃথিবীতে বুদ্ধের মূর্তির সামনে দীপক জ্বালানো হয়।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: রামের দীপক বা আন্তরিক প্রকাশের (Enlightenment) বিজ্ঞানের কোনো লেনাদেনা নাই।

ভণ্ড-প্রতারকেরা বুদ্ধের পিতৃরা‍জ‍্যে প্রত‍্যাগমণের উপর পালনকারী এরূপ ঐতিহাসিক ‘দীপদানোৎসব’কে (কয়েক দশক হতে কার্তিক অমাবশ‍্যাতে পালনকারী উৎসব) চুরি করেছে এবং ইহাকে রামের অযোধ‍্যা প্রত‍্যাগমণের কাহিনীর সাথে জুড়ে দিয়েছে।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ ( Reference): বৌদ্ধ কালক্রমের ঐতিহাসিক নথি এবং সম্রাট অসোকের শিলালেখ যা কার্তিক অমাবশ‍্যাকে ‘দীপদানোৎসব’ রূপে প্রমাণিত করে থাকে।

৮) সর্বজীবে সদ্ভাব এবং আদিম হিংসা রোধ বনাম জাতিবাদ
——————————

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: বুদ্ধের ভাবনায়, উপদেশে এবং আদর্শে জন্মের ভিত্তিতে উঁচু-নীচু বন্টনের জাতি বিদ্বেষ ব‍্যবস্থা ছিলনা। মানব সভ‍্যতার প্রারম্ভে যখন কৃষির দ্বারা চাষাবাদের অনুসন্ধান করা হয়নি, তখন লোকেরা জীবন-যাপনের জন্য নানা রকমের পশুদের হত‍্যা করে ভক্ষণ করতো। এরূপ পরম্পরা দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছিল। সিন্ধু সভ‍্যতা হতে বৌদ্ধ পরম্পরা সমাজকে কৃষি এবং করুণার বৈজ্ঞানিক মার্গ দেখিয়ে এরূপ পশু হত‍্যা বন্ধ করেছিল এবং মনুষ‍্য হোক বা পশু, প্রত‍্যেক জীবের বেঁচে থাকার অধিকার প্রদান করা হয়েছিল।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ইহার বিপরীতে রামের চরিত্র সমাজকে জন্মের ভিত্তিতে বন্টন এবং বর্ণ ব‍্যবস্থাকে কঠোরভাবে লাগু করা হয়েছে। এরূপ ব‍্যবস্থা অনুসারে রামের দ্বারা শুদ্র তপস্বী ‘শম্ভূককে বধ’ করা হয়েছে। কেননা তিনি জ্ঞান আহরণ করছিলেন এবং শষ‍্যাদির ক্ষেত হওয়ার কারণে রামকে ক্রুরতা সহকারে হত‍্যা ( হরিণ শিকার) করতে দেখা গিয়েছে। যা বুদ্ধের সর্বজীবে সমভাবের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ ছিল।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ (Reference): বাল্মীকি রামায়ণ (উত্তর কাণ্ড), যেখানে রাম দ্বারা শুদ্র তপস্বী শম্বুককে হত‍্যার সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়েছে।

৯) হৃদয়ে বুদ্ধ বনাম হনুমান (The Title Rahul):
——————————

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: রাজকুমার সিদ্ধার্থের সন্তানের নাম রাহুল ছিল, যিনি বুদ্ধের ধম্মকে স্বীয় হৃদয়ে স্থান দিয়ে ভিক্ষু হয়েছিলেন।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড-প্রতারকগণ এ রাহুল শব্দের ভাবকে পরিবর্তন করে হনুমান নামে পাত্র বানিয়েছে, যে স্বীয় বুকে ছিড়ে হৃদয়ের ভিতরে রামের স্তুতি করার মতো দেখিয়েছে।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ (Reference): পালি গ্রন্থ ‘মজ্ঝিম নিকায়’ এর রাহুলোবাদ সূত্র, যেখানে বুদ্ধ তৎপুত্র রাহুলকে জ্ঞানের শিক্ষা দিয়েছেন।

১০) সম্রাট অসোকের সম্রাজ‍্যবাদী যুদ্ধ বনাম রাম-সীতার যুদ্ধ
———————————

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস‍ : সম্রাট অসোক কলিঙ্গের উপর আক্রমণ কোনো রাজকুমারী কারুবাকীর সাথে প্রেম বা তার উপর স্বীয় অধিকারের জন‍্য করেন নাই, কলিঙ্গ মৌর্য সম্রাজ‍্যের বাণিজ্যিক সমুদ্র মার্গের মধ‍্যে (Sea Routes) আসা শক্তিশালী স্বতন্ত্র গণরাজ‍্য ছিল। অসোক মৌর্য সম্রাজ‍্যের রাজনৈতিক, ভৌগোলিক এবং এবং আর্থিক বিস্তারের জন‍্য এরূপ ভীষণ যুদ্ধ লড়েছিলেন।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা : যখন ভণ্ড-প্রতারকেরা এ মহান সম্রাজ‍্যবাদী ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, তখন তিনি অসোকের এরূপ বিশাল রাজনৈতিক এবং পরাক্রমী যুদ্ধকে ‘রাম এবং রাবণ’ এর নিজস্ব যুদ্ধে পরিবর্তিত করেছে। তিনি দেখিয়েছেন যে, কোনো নীতির জন‍্য নয়, বরং স্বীয় পত্নী সীতাকে আবার ফিরে পাওয়ার জন‍্য লড়েছিলেন। যাতে সম্রাট অসোকের চক্রবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস সবসময়ের জন‍্য মুছে যায়।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ (Reference) : সম্রাট অসোকের ত্রয়োদশ শিলালেখনী (Major Rock Edict XIII) যা স্পষ্ট রূপে কলিঙ্গ যুদ্ধের শুদ্ধ রাজনৈতিক এবং রণনীতির কারণকে দর্শিয়ে থাকে। সেখানে কোনো রাজকুমারীর কোনো বর্ণনা নাই।

১১) কলিঙ্গ যুদ্ধের অন্ত এবং ‘অসোক বিজয়াদশমী’র অপহরণ
———————————

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: কলিঙ্গ যুদ্ধের ভীষণ রক্তপাতের ঠিক পরে প্রায় ৮ হতে ১০ দিনের মধ‍্যে সম্রাট অসোক সম্পূর্ণরূপে শস্ত্র ত‍্যাগ করেছিলেন এবং বৌদ্ধ ধম্মের দীক্ষা নিয়েছিলেন। যুদ্ধ বিজয়ের পরে ঠিক আশ্বিন শুক্লা দশমী দিনে সম্রাট অসোক দ্বারা বৌদ্ধ ধম্ম গ্রহণের এ ঐতিহাসিক ঘটনাকে ‘অসোক বিজয়াদশমী’ (Asoka Vijaya Dashami) বলা হয়।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড-প্রতারকগণ সম্রাট অসোকের ধম্ম বিজয়ের (অহিংসার প্রারম্ভ) এরূপ বাস্তবিক দিনকে সম্পূর্ণরূপে ভুলিয়ে দিয়েছে। তারা অসোক বিজদয়াদশমীকে ‘দশাহরা’ নাম দিয়েছে এবং কাহিনী বানিয়ে দিয়েছে যে, এ দিন রাম কর্তৃক রাবণকে বধ করা হয়েছে, যাতে লোকেরা ধম্ম বিজয়কে ভুলে হাতিয়ার এবং হিংসার ভণ্ডদেরকে পূজা করতে থাকে।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ (Reference): ঐতিহাসিক বৌদ্ধ পরম্পরা সমূহ এবং মৌর্য কালক্রমের নথিপত্র, যেগুলির ভিত্তিতে আজও ভারতের বহুজন সমাজ অসোক বিজয় দশমী পালন করে থাকে।

১২) রামসেতুর যৌক্তিক এবং গণিতীয় সত‍্য বনাম মৌর্য ইঞ্জিনিয়ারিং (The Floating Bridge Evidence)
————————————

লিখিত রামায়ণের ভুল গণিত: যেহেতু বাল্মীকি রামায়ণের চেয়ে পুরাতন রাম কথার আর কোনো লিখিত প্রমাণ উপলব্দ হয়না, সেহেতু আমরা ইহার লিখিত অক্ষরকেই অন্তিম সত‍্য বলে মান‍্য করব। বাল্মীকি রামায়ণ (যুদ্ধ কাণ্ড, সর্গ ২২, শ্লোক ৭৬) অনুসারে নল-নীল দ্বারা বানানো সেতুর দৈর্ঘ ১০০ যোজন এবং প্রস্ত বা চওড়া ১০ যোজন ছিল। প্রাচীন ভারতীয় পরিমাপ বিজ্ঞান অনুসারে ১ যোজন = ১২.৫ কিলোমিটার হয়ে থাকে।

এরূপ হিসাবে বাল্মীকি রামায়ণের সেতু ১২৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ‍্য এবং ১২৫ কিলোমিটার চওড়া বানিয়েছে। এদিকে ভারত হতে শ্রীলঙ্কার বাস্তবিক ভৌগোলিক দূরত্ব হল মাত্র ৩৫ কিলোমিটার। বাস্তবিক দূর হতে অনেক গুণ বেশী বড় এ সেতু এবং ভুল গণিত স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, এখানে সকল পাত্র এবং সম্পূর্ণ কাহিনী হল কাল্পনিক।

প্রকৃত ইতিহাসের চুরি পাটনার পীপা সেতুর প্রমাণ: মৌর্য কালে মগধ (বিহার) হতে কলিঙ্গ বা দক্ষিণ ভারত যাওয়ার জন‍্য সেনাকে গঙ্গা, পুনপুন বা মহানদীর মতো বিশাল এবং চওড়া নদী সমূহ পার করতে হতো। মৌর্য প্রকৌশলী নৌকা এবং ড্রামের মতো বিশাল বস্তু সমূহ যুক্ত করে নদী সমূহে বিশাল অস্থায়ী ভাসা সেতু (Floating Pontoon Bridges) বানাতো। যাতে হাজার হাজার সেনা এবং হাতী নদী পার করে যেতে পারে। এরকম পদ্ধতি এখনও পাটনায় গঙ্গা এবং পুনপুন নদীতে ‘পীপা সেতু’ রূপে জীবিত দেখা যায়। ভণ্ড-প্রতারকগণ মৌর্য কালের এরকম বাস্তবিক নদী প্রকৌশল বিদ‍্যাকে চুরি করেছে এবং ইহাকে বানরের দ্বারা সমুদ্রের উপর ভাসমান পাথরের যাদুকরী রামসেতু’র কাল্পনিক ভণ্ডামিতে পরিবর্তন করেছে।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ (Reference): বাল্মীকি রামায়ণ (যুদ্ধ কাণ্ড-সর্গ-২২, শ্লোক-৭৬) এবং ইহার প্রতিপক্ষে মৌর্য কালীন প্রশাসনিক নথিপত্র (মেহাস্থিনীজের ‘ইণ্ডিকা’ নাবি অধ‍্যক্ষ পদ) যা মৌর্যদের নদী-সেতু ইঞ্জিনীয়ারিংকে প্রমাণিত করে থাকে।

১৩) সোনার লঙ্কা এবং অশোক বাটিকার সত‍্যতা (The Golden Splendour)
————————————-

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: মৌর্য সম্রাজ‍্য এবং মৌর্য সম্রাট অসোকের নিজের আলীশান, সবুজে ভরা এবং সমৃদ্ধ মহল ও উদ‍্যান ছিল। যার নামই ছিল অসোক বাটিকা। মৌর্য সম্রাজ‍্যের রাজধানী পাটলীপুত্রের মহল সোনা এবং রূপার কারুকার্য এবং বৈভব দ্বারা এতই পূর্ণ ও সমৃদ্ধ ছিল যে, বিদেশী যাত্রীগণও আশ্চর্যান্বিত হতেন।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: পৌরাণিক কাহিনীতে এরকম ঐতিহাসিক নাম এবং মৌর্যদের ‘সোনা-রূপার প্রাসাদ সমূহের বৈভব’কে চুরি করা হয়েছে এবং তাকে রাবণের ‘সোনার লঙ্কা’র ভিতরে স্থিত ‘অশোক বাটিকা’ রূপে পেশ করে দিয়েছে।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ (Reference): মৌর্য কালীন পুরাতাত্বিক অবশেষ এবং পাটলিপুত্রের প্রাসাদের ইতিহাস (মেগাস্থিনীজের প্রসিদ্ধ পুস্তক ইণ্ডিকা)।

১৪) সীতার জন্ম (ক্ষেত হতে বের হওয়া) যৌক্তিক এবং সামাজিক সত‍্যতা (The Fiction Proof)
——————————-

কাল্পনিক চমৎকার: বিজ্ঞান এবং প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে যেকোনো জীবিত বাচ্চা জমিনের নীচে কলসীতে বন্ধ হয়ে জীবিত থাকতে পারেনা। ইহা হল সম্পূর্ণরূপে অমানবীয়, অসম্ভব এবং কাল্পনিক বিষয়। এ ঘটনা নিজেই প্রমাণ করে থাকে যে, ইহা হল একটি কাল্পনিক পাত্র (Fictional Character).

সামাজিক অপ্রিয় সত‍্য: প্রাচীন কাল হতে আজ পর্যন্ত সমাজে এরূপ দেখা যায় যে, যখন যেকোনো বাচ্চা লোক-লজ্জা, অবৈধ সম্বন্ধ বা সামাজিক ভয়ের কারণে জন্ম হয়, তখন লোকেরা ইহাকে নীরবে ক্ষেত, ঝোপঝাড় অথবা জঙ্গলে ফেলে দিয়ে থাকে।

কাহিনীর রূপক: বিচারকদের মান‍্যতা ইহাই যে, রাজা জনকও কোন এরকমই অবৈধ বাচ্চা ক্ষেতে পেয়েছিলেন, যাকে তিনি পালন-পোষণ করেছেন। পরে সে অপ্রিয় সামাজিক সত‍্যকে লুকানোর জন‍্য এবং রাজার পোষণ করা কন‍্যাকে ‘চমৎকারী’ প্রমাণ করার জন‍্য ভণ্ড-প্রতারকগণ কাহিনী বানিয়েছে যে, তিনি হলেন ধরিত্রীর কন্যা এবং সরাসরি মাটির কলসী হতে প্রকট হয়েছে।

১৫) রাবণ কে ছিলেন? মৌর্য বংশের অন্ত
—————————

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: ভণ্ড-প্রতারকগণ রাবণকে মহাপণ্ডিত এবং জ্ঞানী বলেছেন, কিন্তু তাঁকে খলনায়ক (Villain) বানিয়ে দিয়েছে। বাস্তবে রাবণের চরিত্র হল মৌর্য সম্রাজ‍্যের অন্তিম রাজাগণ (বৃহদ্রথ মৌর্যের মতো) এবং চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দ্বারা স্থাপিত বৌদ্ধ শাসন ব‍্যবস্থার প্রতীক।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: পুষ‍্যমিত্র শুঙ্গ যখন অন্তিম মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথ মৌর্যকে হত‍্যা করে বৌদ্ধ সম্রাজ‍্যকে নষ্ট করে দিয়েছেন, ইতিহাসের এ ঘটনাকে ভণ্ড-প্রতারকগণ ‘রাম দ্বারা রাবণ বধ’ এবং বৌদ্ধ মৌর্য শাসনের উপর প্রতারকদের জয় রূপে পৌরাণিক কাহিনীতে পরিবর্তন করে দিয়েছে।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ (Reference): ইতিহাসবিদ ড. রোমিলা থাপারের পুস্তক এবং বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’, যা পুষ‍্যমিত্র শুঙ্গ দ্বারা অন্তিম মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথের হত‍্যার ইতিহাসকে প্রমাণ করে থাকে। ইহার পরেই রামায়ণের বর্তমান স্বরূপ লিখা হয়েছে।

১৬) মহাপুরুষ বনাম মর্যাদা পুরুষোত্তম
————————-

প্রকৃত বৌদ্ধ ইতিহাস: বুদ্ধকে ইতিহাসে ‘মহাপুরুষ’ (মহান বৈজ্ঞানিক এবং যৌক্তিক মানব) বলা হয়।

কাল্পনিক পাত্রের রচনা: ভণ্ড-প্রতারকগণ তাঁর বিপরীতে রামকে ‘মর্যাদা ‘পুরুষোত্তম’ এর খেতাব প্রদান করেছে।

প্রামাণ‍্য সন্দর্ভ (Reference): পালি সূত্ত সমূহে বুদ্ধের জন‍্য ‘মহাপুরিস লক্খণ’ (Great Characteristics of a Great Man) এর বিবরণ রয়েছে।

বাল্মীকি রামায়ণে স্বীয় নিজের এরূপ ভুল গণিত (১২৫০ কিমির সেতু), মৌর্যের পীপা সেতু প্রকৌশলী এবং সম্রাট অসোকের ধম্ম বিজয়ের ইতিহাসকে চুরি করে প্রস্তুত কৃত ‘রাম’ এর এ পৌরাণিক কাহিনীর উপর আপনার অভিমত কি?

Daily Dhamma reflections, Vipassana teachings, and Buddhist programs from a senior Theravāda monk and scholar.

06/06/2026

"আপনি শোয়েডাগন প্যাগোডায় উপগুপ্তকে কতক্ষণ রাখতে চান? উপগুপ্ত আবার কে? উপগুপ্তের কথা 'চেতিয়াপণামা'-তেও নেই। অথচ বড় বড় সায়াদও (ভিক্ষু) এবং বয়স্করা এটি নিয়ে পড়ে আছেন।

আমি বলছি, যার কোনো অস্তিত্ব নেই, তা নেই। তারা বলে, 'ভান্তে, আপনি এসব প্রচার করবেন না।' কিন্তু আমি প্রচার করব! আমি করব! আমি তো বলছিই! ভিত্তিহীন জিনিসকে আমি ভিত্তিহীনই বলব।

আসুন, শুধু শুধু তর্ক করবেন না। আপনারা সবাই একপাশে বসুন, আমি একা বসব। আপনারা সঠিক কথাটা বলুন। আমি যা বলছি তা যদি ভুল হয়, তবে আমাকে বন্দুক দিয়ে গুলি করতে হবে না, গুলতি দিয়ে মারবেন। ঠিক আছে? কিন্তু কেউ আসবে না! কারণ তারা ভুল, তাদের কাছে কোনো প্রমাণ বা তথ্যসূত্র নেই।

বইপত্রে উপগুপ্তের জীবনী কোথায় আছে? বলা হয় 'জিম্মে পন্নাস' (Zinme Pannasa)-এ আছে। তিন ধরণের জিম্মে পন্নাস আছে— লাও, কম্বোডিয়া এবং থাই। কোন পৃষ্ঠায় আছে? আমাকে বইটা দিন। না, সেখানে নেই।
এর মানে হলো থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মের কোনো গ্রন্থে তার উল্লেখ নেই। তবে 'দিব্যাবদান' (Divyavadana) নামক একটি গ্রন্থে এর উল্লেখ আছে। এটি ১৯৩০ সালের দিকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। ওই বইটা দেখুন। ওটা থেরবাদ ত্রিপিটক নয়।

মিস্টার ও'নিল এটি লিখেছেন। ৬৯৩ নম্বর পৃষ্ঠায় গিয়ে দেখুন। নিজেরা লাইব্রেরিতে গিয়ে খুঁজুন। 'দিব্যাবদান' ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে, বার্মিজ ভাষায় এখনো হয়নি। এটি একটি মহাযান গ্রন্থ, থেরবাদ গ্রন্থ নয়। বুঝতে পেরেছেন?

তৃতীয় সঙ্গায়নের সময় উপগুপ্ত কর্তৃক মার-কে (Mara) দমন করার যে গল্প বলা হয়, তা একেবারেই সত্য নয়। এর একবিন্দুও সত্য নয়। সারা জীবন এটা মনে রাখবেন।
আজকাল যখন কোনো সেতু নির্মাণ করা হয় (যেমন তাংকালের পারামি সেতু), রাষ্ট্রপ্রধানদের নির্দেশে, তখন পাথরের ফলকে লেখা থাকে কে, কবে এটি উদ্বোধন করেছেন। যাতে ভবিষ্যতের মানুষ জানতে পারে।
তেমনি, উপগুপ্ত যদি সত্যিই রাজা সিরি ধম্মাসোকা (অশোক)-এর পুণ্যকর্মে সাহায্য করে থাকতেন, তবে কি সেই পাথরের শিলালিপিতে উপগুপ্তের অবদানের কথা লেখা থাকত না? আমাদের কাছে অশোকের মূল শিলালিপিগুলো আছে। সেখানে কোথাও 'উপগুপ্ত' নামটি নেই। এটা মনে রাখবেন।

সুতরাং বিনয়, পালি, অভিধম্ম, সুত্ত, সাহিত্য, পাথরের শিলালিপি, কালির লিপি বা ইতিহাসে কোথাও উপগুপ্তের জীবনীর একবিন্দুও উল্লেখ নেই। আর এই কারণেই আমরা ধম্ম প্রচারকরা সাহসের সাথে তাকে প্রত্যাখ্যান করি। বিষয়টি কি পরিষ্কার হলো? আপনারা তাকে অর্হৎ বা যাই বলুন না কেন, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
আমরা সমুদ্রের ওপর দিয়েও গিয়েছি। তাই না কো উইন জাও? দক্ষিণ চীন সাগর, সিঙ্গাপুর প্রণালী পার হয়ে যখন বিমানে করে যুক্তরাজ্যে যাচ্ছিলাম, তখন আমি নিচের দিকে তাকিয়ে তার তামার প্রাসাদ (যেখানে উপগুপ্ত থাকেন বলে পুরাণে বিশ্বাস করা হয়) খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমি এমন কিছু দেখতে পাইনি। আমি সত্যি কথাই বলছি।

🍂দেশনায়: ধাম্মাচোতী সায়াদও উ কোসালা
​মহা ধম্মাচরিয়া (Mahadhammacariya) সাসানতক্কসীল মহা ধম্মাচরিয়া
(​এম.এ ইন বুদ্ধিজম (M.A. in Buddhism)।
ধম্মকথিক বহুজনহিতধর।

মক্কা মানে বৌদ্ধ বিহারড. বরসম্বোধি ভিক্ষুইসলামের পবিত্র ভূমি মক্কা মানে হল মকান অর্থাৎ বৌদ্ধ বিহার ও কাবা মানে হল কুম্ভ,...
02/06/2026

মক্কা মানে বৌদ্ধ বিহার

ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

ইসলামের পবিত্র ভূমি মক্কা মানে হল মকান অর্থাৎ বৌদ্ধ বিহার ও কাবা মানে হল কুম্ভ, বৌদ্ধ স্তূপ এবং হজ্ব যাত্রা মানে হল বৌদ্ধ ধম্মযাত্রা।

আফগানিস্তানের নববহার বৌদ্ধ স্তূপকে মক্কা বলে জানা যেতো।

মক্কার কাবায় শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে প্রদক্ষিণ করা হয় এবং কাবার এরূপ প্রদক্ষিণ করাকে তবাফ (Tawaf) বলা হয়। শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে স্তূপের প্রদক্ষিণ করা হল প্রাচীন পরম্পরা।

স্তূপকে সাত বার প্রদক্ষিণ করা (Circumambulation) হল প্রচীন বৌদ্ধ পরম্পরা। আম্রপালি বুদ্ধকে এরূপ প্রদক্ষিণ করে নতজানু হয়ে বন্দনা করেছিলেন। অন‍্যান‍্য বুদ্ধ শিষ্য ও অনুগামীরাও সেভাবে প্রদক্ষিণ করে বন্দনা করতেন। এখনও স্তূপ পরিক্রমার সে প্রথা চলমান রয়েছে। কেননা স্তূপ বুদ্ধেরই প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। আম্রপালী বুদ্ধকে প্রদক্ষিণ পূর্বক নীচ আসনে উপবিষ্ট হয়ে বুদ্ধের দেশনা শ্রবণ করেছিলেন। জ্ঞান প্রাপ্তির পর বুদ্ধ বোধিবৃক্ষের আশেপাশে সাতদিন করে সাত সপ্তাহ দাঁড়িয়ে, বসে, চঙ্ক্রমণ করে ধ‍্যান করেছিলেন। বর্তমানেও বৌদ্ধরা বুদ্ধগয়ায় পবিত্র বোধিবৃক্ষ ও মহাবোধি চৈত‍্যকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে শ্রদ্ধা ও গৌরবভাব প্রদর্শন করে থাকেন।

প্রাচীন কালে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ গেরুয়া চীবর পরিধান করে মস্তক মুণ্ডন পূর্বক বুদ্ধ প্রতিবিম্ব ও স্তূপের প্রদক্ষিণ করতেন এবং পরে এর সামনে বসে বন্দনা তথা বুদ্ধ স্তূতি এবং ধ‍্যান অনুশীলন করতেন। অনুরূপভাবে প্রাচীন গৃহস্থ বৌদ্ধগণও সে আদর্শ অনুসরণ করে শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে তাঁরাও মস্তক মুণ্ডন করতেন এবং স্তূপ ও বুদ্ধ মূর্তির চারিদিকে প্রদক্ষিণ করতেন। বর্তমানের বৌদ্ধগণ এ মহান পরম্পরাকে ভুলে গিয়েছে, কিন্তু মুসলিমেরা এ পরম্পরা মক্কার কাবায় এখনও জীবিত রেখেছে।

শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে এবং মস্তক মুণ্ডন করে মুসলিমেরা হজ্ব যাত্রার সময় বৌদ্ধ পরম্পরা অনুসারে মক্কায় কাবা গৃহের সাতবার প্রদক্ষিণ করে থাকেন। মক্কার অর্থ মকান বা বিহার হয়ে থাকে এবং আফগানিস্তানের নববহার বুদ্ধ বিহারকেও মক্কা বলা হতো। সেখানে বৌদ্ধেরা স্তূপের প্রদক্ষিণ করে বুদ্ধকে অভিবাদন অর্থাৎ শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। (Umar al Kirmani and the Rise of Barmkids, Bosworth, 1994, BSOAS, 57 (2), p-268-82).

মহান ইহুদী ইতিহাসবিদ রাশিদ আল দিন স্বীয় গ্রন্থ ‘জামি-উল-নবারিখ’ লিখেছেন যে-‘ ইসলামের পূর্বে মক্কা এবং মদিনার সকল লোক বৌদ্ধ ছিলেন।’ (Rashid-Al-Din, Jami-ul- Tawarikh, pt. P-27).

ইসলামের পূর্বে মক্কা এবং মদিনার প্রায় সকল লোক বৌদ্ধ ছিলেন এরূপ সত‍্য প্রকাশ করেছেন ইতিহাসবিদ ও আমেরিকার অরিগন বিশ্ববিদ‍্যালয়ের অধ্যাপক রোকসান প্রাঝনিয়াকও (Roxann Prazniak)। অবিসিনিয়ার অমেজোন সাহসী যোদ্ধারাও পূর্বে বৌদ্ধ ছিলেন। (Ilkhanid Buddhism: Traces of a passage in Eurasian Prazniak, comparative studies in history and society, 2014, p-669).

অর্থাৎ ইসলামের পূর্বে আরবস্থানের আরবী লোকেরা বৌদ্ধ ছিলেন এবং মক্কা তথা মদিনা ছিল তাঁদের প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ কেন্দ্র।

https://varasambodhi.org

#সব্বদানং_ধম্মদানং_জিনাতি
#মক্কামানেবৌদ্ধবিহার
#মক্কা_মানে_বৌদ্ধ_বিহার

Explore dhamma teachings, daily reflections, and meditation guidance from a senior Theravāda Buddhist monk and scholar from Bangladesh.

Address

Raozan, Chattagram
Chittagong
4346

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when KBSK Welfare Trust posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share