03/08/2026
সত্যের সন্ধানে
(পর্ব–৩/৫)
আদম (আ.) থেকে মুহাম্মদ (ﷺ)-
আল্লাহপ্রদত্ত দ্বীনের ধারাবাহিক ইতিহাসঃ
মানবজাতির প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী ছিলেন আদম (আ.)। তাঁর মাধ্যমেই এক আল্লাহর ইবাদত (তাওহীদ)-এর শিক্ষা শুরু হয়। মানুষ যখন সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তখন আল্লাহ যুগে যুগে নবী ও রাসূল প্রেরণ করে একই আহ্বান জানিয়েছেন— "আর অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির কাছে একজন রাসূল পাঠিয়েছি (এই নির্দেশ দিয়ে যে), ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগূতকে বর্জন করো।’"
— সূরা আন-নাহল, ১৬:৩৬
আরও বলেন— "আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তার কাছে এ ওহীই পাঠিয়েছি যে, ‘আমি ছাড়া কোনো (সত্য) উপাস্য নেই; সুতরাং তোমরা শুধু আমারই ইবাদত করো।’"
— সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:২৫
কুরআনে উল্লেখিত ২৫ জন নবীর সম্ভাব্য কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতা
১. আদম (আ.)
মানবজাতির প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী। আল্লাহ তাঁকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেন, সব বস্তুর নাম শিক্ষা দেন এবং পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি (খলিফা) হিসেবে প্রেরণ করেন। ইবলিস তাঁকে সিজদা করতে অস্বীকার করে অহংকার প্রদর্শন করে। পরে শয়তানের প্ররোচনায় নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার পর আল্লাহ তাঁদের পৃথিবীতে পাঠান এবং তাঁদের তাওবা কবুল করেন।
২. ইদরীস (আ.)
তিনি ছিলেন সত্যবাদী (সিদ্দীক), ধৈর্যশীল ও আল্লাহর অনুগত বান্দা। আল্লাহ তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেন।
৩. নূহ (আ.)
তিনি তাঁর জাতির মধ্যে ৯৫০ বছর অবস্থান করে তাওহীদের দাওয়াত দেন। অল্পসংখ্যক মানুষ ঈমান আনে। আল্লাহর নির্দেশে তিনি নৌকা নির্মাণ করেন। মহাপ্লাবনে অবাধ্যরা ধ্বংস হয়; এমনকি তাঁর স্ত্রী ও এক পুত্রও ঈমান না আনায় রক্ষা পায়নি।
৪. হূদ (আ.)
তিনি 'আদ জাতির কাছে প্রেরিত হন। তারা শক্তি ও সম্পদের অহংকারে আল্লাহকে অস্বীকার করেছিল। অবশেষে আল্লাহ প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ুর মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করেন।
৫. সালিহ (আ.)
তিনি সামূদ জাতির নবী ছিলেন। আল্লাহ তাদের জন্য উটনীকে একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে পাঠান। তারা উটনীকে হত্যা করলে আল্লাহ তাদের ওপর ভয়াবহ শাস্তি নাযিল করেন।
৬. ইবরাহিম (আ.)
তিনি ছিলেন তাওহীদের মহান দাঈ ও খলিলুল্লাহ। মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করায় তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হলেও আল্লাহ আগুনকে তাঁর জন্য শীতল ও নিরাপদ করে দেন। আল্লাহর নির্দেশে পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে কাবার প্রাচীন ভিত্তির ওপর কাবা পুনর্নির্মাণ করেন।
৭. লূত (আ.)
তিনি সাদূমবাসীদের কাছে প্রেরিত হন। তাদের অশ্লীলতা ও সমকামিতার মতো পাপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। অবাধ্য জাতি ধ্বংস হয় এবং তাঁর স্ত্রীও অবাধ্যদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় রক্ষা পাননি।
৮. ইসমাঈল (আ.)
তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও একজন সম্মানিত নবী। কাবা পুনর্নির্মাণে পিতাকে সহযোগিতা করেন। কুরবানির কঠিন পরীক্ষায় আল্লাহর আদেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন এবং নিজ পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দিতেন।
৯. ইসহাক (আ.)
তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর পুত্র ও সম্মানিত নবী। তাঁর বংশ থেকেই পরবর্তীতে বনী ইসরাঈলের বহু নবীর আগমন ঘটে।
১০. ইয়াকূব (আ.)
তিনি ইসরাঈল নামে পরিচিত। বনী ইসরাঈলের বারো গোত্রের পূর্বপুরুষ। ইউসুফ (আ.)-এর বিচ্ছেদে দীর্ঘদিন ধৈর্য ধারণ করেন; পরে আল্লাহ তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন।
১১. ইউসুফ (আ.)
তিনি ধৈর্য, সততা, পবিত্রতা ও ক্ষমার অনন্য দৃষ্টান্ত। স্বপ্নের ব্যাখ্যার মাধ্যমে মিসরকে দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষার পরিকল্পনা করেন এবং আল্লাহ তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন।
১২. শু'আইব (আ.)
তিনি মাদইয়ান জাতির কাছে প্রেরিত হন। ওজনে-পরিমাপে প্রতারণা ও অর্থনৈতিক দুর্নীতি থেকে মানুষকে সতর্ক করেন। অবাধ্য জাতি আল্লাহর শাস্তিতে ধ্বংস হয়।
১৩. আইয়ূব (আ.)
দীর্ঘ রোগ, সম্পদ ও সন্তান হারানোর পরীক্ষায়ও ধৈর্য ধারণ করেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি সুস্থতা লাভ করেন এবং পূর্বের চেয়েও অধিক নেয়ামত লাভ করেন।
১৪. যুল-কিফল (আ.)
কুরআনে তাঁকে ধৈর্যশীল, সৎকর্মপরায়ণ ও নেককারদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। তাঁর জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য কুরআনে উল্লেখ নেই।
১৫. মূসা (আ.)
আল্লাহ তাঁকে তাওরাত দান করেন। ফেরাউনের বিরুদ্ধে সত্যের সংগ্রাম করেন এবং বনী ইসরাঈলকে মুক্ত করেন। আল্লাহ তাঁর হাতে বহু মুজিযা প্রকাশ করেন; যেমন লাঠি সাপে পরিণত হওয়া ও সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া।
১৬. হারূন (আ.)
তিনি মূসা (আ.)-এর ভাই ও সহকারী নবী। মূসা (আ.) তূর পাহাড়ে গেলে তিনি বনী ইসরাঈলের নেতৃত্ব দেন এবং তাদের সংশোধনের চেষ্টা করেন।
১৭. দাউদ (আ.)
তিনি ছিলেন নবী ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। আল্লাহ তাঁকে যাবূর দান করেন। তিনি জালুতকে পরাজিত করেন এবং আল্লাহ তাঁর জন্য লোহা নরম করে দেন।
১৮. সুলাইমান (আ.)
তিনি দাউদ (আ.)-এর পুত্র। আল্লাহ তাঁকে বিরাট রাজত্ব দান করেন এবং জিন, বাতাস ও পাখিদের অনুগত করে দেন। সাবার রাণী তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করেন।
১৯. ইলিয়াস (আ.)
তিনি বনী ইসরাঈলকে 'বা'ল' নামক মূর্তির উপাসনা ত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান।
২০. আল-ইয়াসা (আ.)
তিনি বনী ইসরাঈলের একজন নবী ছিলেন। কুরআনে তাঁকে সৎ ও নির্বাচিত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
২১. ইউনুস (আ.)
তিনি নিনেভেহবাসীদের কাছে প্রেরিত হন। আল্লাহর চূড়ান্ত অনুমতির পূর্বেই নিজ জাতিকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় মাছের পেটে পরীক্ষার সম্মুখীন হন। সেখানে তিনি, "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমীন"—এই দোয়া করেন। আল্লাহ তাঁর তাওবা কবুল করেন এবং পরে তাঁর জাতি ঈমান আনলে তাদের থেকে শাস্তি প্রত্যাহার করে নেন।
২২. যাকারিয়া (আ.)
বৃদ্ধ বয়সে ও স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর কাছে নেক সন্তান প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করে ইয়াহইয়া (আ.)-এর সুসংবাদ দেন।
২৩. ইয়াহইয়া (আ.)
তিনি যাকারিয়া (আ.)-এর পুত্র। আল্লাহ তাঁকে শৈশবেই প্রজ্ঞা দান করেন। তিনি পবিত্র চরিত্র, সংযম ও আল্লাহভীতির জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন।
২৪. ঈসা (আ.)
আল্লাহ তাঁকে ইনজিল দান করেন এবং বহু মুজিযা প্রদান করেন। আল্লাহর অনুমতিতে তিনি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করতেন এবং মৃতকে জীবিত করতেন। তাঁকে হত্যা বা ক্রুশবিদ্ধ করা হয়নি; বরং আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে উঠিয়ে নেন।
২৫. মুহাম্মদ (ﷺ)
তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসূল (খাতামুন নবিয়্যীন)। আল্লাহ তাঁর ওপর পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেন, যা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী মুজিযা। বিদায় হজ্জে আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করেন। তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না।
সুতরাং বুঝা যায় যেঃ
আদম (আ.) থেকে মুহাম্মদ (ﷺ) পর্যন্ত সকল নবীর মূল দাওয়াত ছিল একটাই—এক আল্লাহর ইবাদত, শিরক বর্জন, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং আখিরাতের প্রস্তুতি। শরীয়তের কিছু বিধান পরিবর্তিত হলেও তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের বিশ্বাস সর্বদা অপরিবর্তিত থেকেছে।
পরবর্তী পর্বেঃ
হিন্দুধর্ম, ইহুদিধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, ইসলামসহ বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি ধর্মগুলোর মৌলিক পার্থক্য, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কেন আলাদা, এবং সত্যের সন্ধানে একজন অনুসন্ধানীর নিরপেক্ষভাবে কীভাবে এগোনো উচিত—তা সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।