06/06/2026
ঘরে-বাইরে মশা দমনের আধুনিক ত্রিমুখী উপায় (বৈজ্ঞানিক কৌশল)
বাংলাদেশে মশার উপদ্রব এবং ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকনগুনিয়া বা ফাইলেরিয়ার মতো মশাবাহিত মারাত্মক রোগগুলো বর্তমানে একটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সংকট। এডিস মশা সাধারণত ঘরের ভেতরের বা বাইরের স্বচ্ছ ও স্থির পানি (যেমন: টব, ডাবের খোসা, টায়ার, এসি-ফ্রিজের ট্রে ও ছাদবাগান) এবং কিউলেক্স ও অ্যানোফিলিস মশা যথাক্রমে ময়লা নর্দমা, বদ্ধ ড্রেন, কচুরিপানা যুক্ত জলাশয় ও পাহাড়ী স্যাঁতসেঁতে ঝোপঝাড়ে বংশবৃদ্ধি করে। অথচ আমাদের শহরগুলোতে যে "ফগিং" বা ধোঁয়া ছিটানোর ঐতিহ্যবাহী কার্যক্রম চালানো হয়, তা মূলত একটি সাময়িক ও লোকদেখানো পদ্ধতি; যা বাতাসে থাকা মাত্র ১০-২০% উড়ন্ত মশা মারতে পারলেও পানির নিচের কোটি কোটি লার্ভা বা ডিম সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখে দেয়। উপরন্তু, একই রাসায়নিক বছরের পর বছর ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে কীটনাশক সহনশীলতা (Insecticide Resistance) তৈরি হয়েছে, যার কারণে এই ধোঁয়ায় মশা আর মরে না এবং রাস্তাঘাটে ছিটানো এই ধোঁয়া ঘরের কোণে বা আলমারির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এডিস মশা পর্যন্ত পৌঁছাতেও পারে না—যার ফলে গ্রামীণ ও নগর জীবনে মশার বেহাল দশা অপরিবর্তিতই থেকে যায়।
এই ব্যর্থতা থেকে মুক্তি পেতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আমেরিকার CDC অনুমোদিত আন্তর্জাতিক মানের সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা (Integrated Vector Management - IVM) প্রয়োগ করা জরুরি, যার মূল লক্ষ্য উড়ন্ত মশা মারার চেয়ে লার্ভা পর্যায়েই তাদের ধ্বংস করা। এর সবচেয়ে কার্যকর বৈজ্ঞানিক সমাধান হলো জলাশয় ও ড্রেনে BTI (Bacillus thuringiensis israelensis) নামক প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়ার পাউডার বা ট্যাবলেট এবং নোভালুরন/মেথোপ্রেন নামক ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর ব্যবহার করা, যা লার্ভাকে পূর্ণাঙ্গ মশায় রূপান্তর হতে দেয় না এবং মানুষ ও মাছের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। পাশাপশি স্থায়ী জলাশয় বা গ্রামে প্রাকৃতিকভাবে লার্ভা ধ্বংস করতে গাপ্পি, তেলাপিয়া বা খলসে মাছ এবং হাঁস চাষ করা অত্যন্ত কার্যকর জৈবিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সপ্তাহে অন্তত একবার ঘরের চারপাশ ও ছাদবাগানের জমা পানি পরিষ্কার করে (৩ দিনে ১ দিন, জমা পানি ফেলে দিন) উৎস নির্মূল করতে হবে এবং দিনের বেলা মশার আশ্রয়স্থল বাড়ির আশেপাশের ঝোপঝাড় ছেঁটে ফেলতে হবে; এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ল্যাবে তৈরি ক্ষতিকরহীন উলবাকিয়া (Wolbachia) ব্যাকটেরিয়াযুক্ত পুরুষ মশা প্রকৃতিতে ছেড়ে প্রাকৃতিকভাবেই এডিস মশার বংশ বিলুপ্ত করা হচ্ছে।
সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক এই উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে সুরক্ষিত থাকতে আধুনিক ও আন্তর্জাতিকভাবে সার্টিফাইড কিছু কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘরের জানালা, দরজা এবং ভেন্টিলেটরে মেটাল বা নাইলনের নেট (Mesh Wire) ব্যবহার করা, যা মশার প্রবেশে একটি স্থায়ী ফিজিক্যাল ব্যারিয়ার হিসেবে কাজ করে। এছাড়া বাইরে বের হওয়ার সময় বা ঘরে মশার কামড় থেকে বাঁচতে ত্বকে ও কাপড়ে DEET (১০-৩০%), Picaridin, IR3535 অথবা প্রাকৃতিক লেমন ইউক্যালিপটাস তেল (Oleum citriodora) যুক্ত মশার নিরোধক (Repellent) ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার করা উচিত, যা মশাকে দীর্ঘসময় দূরে রাখে। ঘুমানোর সময় সাধারণ মশারির বদলে দীর্ঘস্থায়ী ওষুধযুক্ত বিশেষ LLIN (Long-Lasting Insecticidal Net) মশারি ব্যবহার করা, যার সংস্পর্শে আসামাত্রই মশা মা/রা যায় এবং ঘরের ভেতরে মশা আকর্ষণের জন্য কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও UV আলো উৎপন্নকারী আধুনিক আলোক ফাঁদ (Mosquito Trap) স্থাপন করা—সব মিলিয়ে এই ত্রিমুখী আন্তর্জাতিক মানের সমাধানগুলোই মশার উপদ্রব থেকে সত্যি আশানুরূপ ফল এনে দিতে পারে।
#মশা 🦟🦟🦟