28/06/2026
চট্টগ্রামের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের অবদান শুধু ব্যবসা বা সমাজসেবায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তারা স্বদেশপ্রেম, শিক্ষা বিস্তার এবং দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে একটি যুগের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। তেমনই একজন ছিলেন আবদুল বারী চৌধুরী। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের অন্যতম প্রথম সারির শিল্পোদ্যোগী, শিক্ষানুরাগী এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব।
আবদুল বারী চৌধুরীর জন্ম ১৮৭০ সালে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে। তার পিতা ছিলেন নুর আলী চৌধুরী এবং মাতা সকিনা বিবি। শৈশব থেকেই তিনি সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ ছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে তার কর্মজীবন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
চট্টগ্রামের শিল্পোন্নয়নের ইতিহাসে আবদুল বারী চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি ছিলেন শহরের প্রথম কাতারের শিল্পোদ্যোগীদের একজন। একই সঙ্গে শিক্ষা বিস্তারেও রেখেছেন অসাধারণ অবদান। তিনি দৌলতপুর এবিসি (আবদুল বারী চৌধুরী) উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়া রাউজান আর.আর.এ.সি. মডেল সরকারি হাই স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ফটিকছড়ি করোনেশন সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের দাতা প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ফটিকছড়ি মাদ্রাসা এবং নাজিরহাট বড় মাদ্রাসার অন্যতম দাতা প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও তার নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তার অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
ব্রিটিশবিরোধী চেতনা এবং স্বদেশপ্রেম থেকেই তিনি চট্টগ্রামে বেঙ্গল বার্মা স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল দেশীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠা এক গুরুত্বপূর্ণ নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। একসময় ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী তার আমন্ত্রণে জাহাজে আসেন। কিন্তু জেটিতে এসে জাহাজে ব্রিটিশ পতাকা উড়তে দেখে তিনি থেমে যান। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আবদুল বারী চৌধুরী নিজেই জাহাজ থেকে ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে দেন। এরপর গান্ধী জাহাজে উঠে তার সঙ্গে আলাপচারিতার সময় উচ্চারণ করেন সেই বহুল আলোচিত উক্তি—“চট্টগ্রাম সবার আগে।”
আবদুল বারী চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল সমৃদ্ধ। তার তিন পুত্র ও দুই কন্যা সন্তান ছিলেন। তাদের মধ্যে জহুরুল হক চৌধুরী, রেজওয়ান নুর চৌধুরী এবং মোজাহেরুল কুদ্দুস চৌধুরী ছিলেন তার তিন পুত্র। বড় মেয়ে শামসুন নাহার চৌধুরানী ১৯৩৫ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী থাকাকালীন পরবর্তীকালের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা এ কে খান-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কনিষ্ঠ কন্যা ছর্ফুনেছা চৌধুরানী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ড. নজরুল ইসলাম-এর সঙ্গে।
নিজের প্রতিষ্ঠিত দুটি লঞ্চের নামও তিনি রেখেছিলেন তার দুই কন্যার নামে—‘নুর নাহার’ এবং ‘সামশুন নাহার’। এটি তার পারিবারিক ভালোবাসার পাশাপাশি নিজের উদ্যোগের সঙ্গে পরিবারের স্মৃতিকে যুক্ত করে রাখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৯৪৪ সালের ২৩ এপ্রিল, ৭১ বছর বয়সে, চট্টগ্রাম শহরের চকবাজারের লালচান্দ রোডের নিজ বাসভবনে আবদুল বারী চৌধুরীর মৃত্যু হয়। পরে তাকে ফটিকছড়ির দৌলতপুর গ্রামের চৌধুরী মহল (এবিসি এলাকা)-এর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আবদুল বারী চৌধুরীর জীবন শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীর গল্প নয়; এটি চট্টগ্রামের শিক্ষা, শিল্প, সমাজসেবা এবং স্বদেশপ্রেমের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশীয় শিল্পের বিকাশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং ব্রিটিশবিরোধী চেতনা লালনের মাধ্যমে তিনি যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা আজও চট্টগ্রামের ইতিহাসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
মেইন পোস্টঃ https://www.facebook.com/share/p/1K9hyrXLH8/