27/09/2026
উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক আকাশের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র মাহবুবে এলাহি হযরত খাজা সৈয়দ মুহাম্মদ নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)। স্রষ্টার প্রেম ও নিখাদ মানবসেবার আলোয় যিনি পুরো ভারতবর্ষের অন্ধকার দূর করেছিলেন, সেই ‘মেহবুব-এ-ইলাহি’ বা আল্লাহর প্রিয়পাত্রকে গড়ে তোলার অন্যতম কারিগর ছিলেন তাঁর রত্নগর্ভা মা হযরত বিবি জুলেখা (রহ.)। দিল্লির মানুষ আজ ৭০০ বছর পরও যাকে পরম শ্রদ্ধায় ‘মাই সাহিবা’ বা ‘শ্রদ্ধেয় মাতা’ বলে ডাকেন, তাঁর জীবন কেবল একজন মা হিসেবে নয়, বরং আধ্যাত্মিক সাধনা ও অটল বিশ্বাসের এক অনন্য ও অমর অধ্যায়। তাসাউফের সুউচ্চ মাকামে তাঁর স্থান এতটাই উচ্চে ছিল যে, খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মতো মহান সাধকের জীবনের প্রতি পদে তাঁর আধ্যাত্মিক ছায়া ও শক্তির প্রভাব ছিল স্পষ্ট।
বিবি জুলেখা (রহ.) ছিলেন হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পবিত্র বংশধারা বা আহলে বাইতের এক সুবাসিত ফুল। চেঙ্গিজ খানের মঙ্গোল আক্রমণের অবর্ণনীয় সংকটের মুখে তাঁর পরিবার বুখারা থেকে ভারতের বাদায়ুন শহরে হিজরত করে। খাজা নিজামুদ্দিন(রহ) এর বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। চরম দারিদ্র্য ও একাকীত্বের মাঝে সুতা কেটে এবং কাপড় বুনে কোনোমতে সন্তানকে বড় করার কঠিন সংগ্রামে নামেন এই মহিয়সী নারী। পেটের ক্ষুধা যেখানে নিত্যসঙ্গী, সেখানেও বিবি জুলেখা (রহ.) পুত্রের আত্মিক ও বুদ্ধিভিত্তিক শিক্ষার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আপস করেননি। বাদায়ুনের সেরা শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে তিনি বালক নিজামুদ্দিনের দ্বীনি শিক্ষার এক মজবুত বুনিয়াদ গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীকালের সুবিশাল চিশতিয়া ধারার অন্যতম ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) তাঁর স্মৃতিকথায় শৈশবের এক মরমী অধ্যায় স্মরণ করে লিখেছেন, অনেক সময় এমন দিন যেত যখন তাঁদের ঘরে এক দানা অন্নও থাকত না। অনাহারের সেই চরম মুহূর্তে তাঁর মা বিবি জুলেখা কোনো হাহাকার না করে অত্যন্ত প্রশান্ত মুখে বলতেন, "নিজাম! আজ আমরা আল্লাহর মেহমান।" মায়ের মুখের এই একটি বাক্য বালক নিজামুদ্দিনের অন্তরে উপবাসের কষ্টকে এক অলৌকিক আনন্দ ও খোদার প্রতি পরম তৃপ্তিতে রূপান্তর করে দিত।
মায়ের এই আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও রিয়াজতই খাজা নিজামুদ্দিনকে ভবিষ্যতের একজন মহান জাহিদ (সংসারবিরাগী) এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। পরবর্তীতে দিল্লির নিজামুদ্দিন দরগাহে যে সুবিশাল উন্মুক্ত লঙ্গরখানা গড়ে উঠেছিল, যেখানে ধনী-দরিদ্র, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অন্ন পেত, তার অন্যতম প্রেরণা ও অমর ভিত্তি ছিল মায়ের শেখানো সেই পরম তাওয়াক্কুল ও ধৈর্যের দিনগুলোই।
বিবি জুলেখা কেবল জন্মদাত্রী মা ছিলেন না, ছিলেন পুত্রের প্রথম আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ও এক অনন্য আত্মিক আশ্রয়স্থল। পুত্রের জ্যোতির্ময় চোখের দিকে তাকিয়ে মা প্রায়ই ভবিষ্যদ্বাণী করতেন, "নিজামুদ্দিন, তুমি একদিন মানবতার এক বিশাল আশ্রয়স্থল হবে।" যখন পুত্র পরম কৌতুহলে জানতে চাইতেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ কবে আসবে, মা মৃদু হেসে উত্তর দিতেন, "যখন আমি এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব।" ১২৫০ খ্রিস্টাব্দে এই পুণ্যবতী নারী যখন মৃত্যুর শয্যায়, তখন পুত্রের হাত নিজের হাতে নিয়ে পরম আকুলতায় মোনাজাত করেছিলেন, "হে আল্লাহ! আমি আমার এই সন্তানকে তোমার আমানত হিসেবে সঁপে দিয়ে গেলাম।"
মায়ের এই দোয়ায় খাজা নিজামুদ্দিন আউলীয়া (রহ.) এর আধ্যাত্মিক জীবনের এক নতুন ও অলৌকিক দুয়ার উন্মোচিত হয়।আজ দক্ষিণ দিল্লির আধচিনি গ্রামে অবস্থিত ‘দরগা মাই সাহিবা’ হলো মা বিবি জুলেখার পবিত্র মাজার শরীফ, যা শত শত বছর ধরে আজও মানবসেবা ও আধ্যাত্মিকতার এক জীবন্ত কেন্দ্র। বর্তমানের ভোগবাদী ও অস্থির সমাজে মা বিবি জুলেখার ধৈর্য, পরম আত্মত্যাগ এবং তাসাউফে নারীর এই অনন্য শ্রেষ্ঠত্বের ভূমিকা আমাদের নতুন করে পথ দেখাতে পারে। একটি পবিত্র ও আধ্যাত্মিক হৃদয়ের মা-ই যে সমাজকে একজন ‘সুলতানুল মাশায়েখ’ উপহার দিতে পারেন, এই ইতিহাস তারই এক শাশ্বত ও গৌরবোজ্জ্বল স্মারক।
তথ্যসূত্র:
১.ফাওয়ায়িদ আল-ফুয়াদ।
২.সিয়ার আল-আউলিয়া (আমীর খুর্দ)।
সংকলন ও সম্পাদনা: Gulshan-e-Chishty