16/07/2026
দৃশ্যটা আপনি রোজ দেখেন। সিগন্যালে দাঁড়ানো একটা সাইকেল, পিঠে কোম্পানির রঙের চৌকো ব্যাগ, ঘামে ভেজা একটা তরুণ মুখ। বৃষ্টি হলে সে ভেজে, রোদ হলে পোড়ে, আর অ্যাপে অর্ডার আসলে ছোটে।
এখন একটা সহজ প্রশ্ন, এই ছেলেটার চাকরিদাতা কে?
কোম্পানির রঙ সে বহন করছে, কোম্পানির ব্যাগ তার পিঠে, কোম্পানির অ্যাপ তার ফোনে, কোম্পানির নির্দেশে সে শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় ছোটে। অথচ গত বিশ বছর ধরে এই প্রশ্নের আইনি উত্তর ছিল, কেউ না।
কাগজে সে ছিল ‘রাইডার’, ‘পার্টনার’, ‘ফ্রিল্যান্সার, সবকিছু, শুধু শ্রমিক না। আর যেহেতু শ্রমিক না, ফলে নিয়োগপত্র নাই, ন্যূনতম মজুরি নাই, ছুটি নাই, দুর্ঘটনার দায় নাই, ছাঁটাইয়ের নোটিশ নাই।
কয়েক মাস আগে উত্তরটা বদলেছে। শ্রম আইনে ঢুকেছে নতুন শব্দ। কিন্তু কীভাবে ঢুকেছে, সেই গল্পটা বোঝা দরকার। কারণ গল্পটা এখনও ঝাপসা। অর্ধেক।
➖
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬, শ্রমিকের অধিকারের মূল দলিল। সেখানে শ্রমিকের যেই সংজ্ঞা, সেটা লেখা হয়েছিল এমন এক পৃথিবীতে যেখানে কারখানা আছে, মালিক আছে, নিয়োগ আছে। অ্যাপ বলে কিছু নাই।
প্ল্যাটফর্মগুলি এই ফাঁকটাকেই ব্যবসার ভিত বানিয়েছিল। তারা বলতো, আমরা তো নিয়োগকর্তা না, আমরা "সংযোগকারী প্রযুক্তি" মাত্র। ছেলেটা আমাদের কর্মী না, “আমাদের পার্টনার।”
শব্দটা খেয়াল করেন। পার্টনার মানে অংশীদার। অংশীদার হলে মুনাফার ভাগ পাওয়ার কথা, বোর্ড মিটিংয়ে বসার কথা। এই "পার্টনার" পায় প্রতি ডেলিভারিতে কয়টা টাকা, আর কোম্পানি চাইলে যেকোনো মুহূর্তে তার আইডি বন্ধ করে দিতে পারে, কারণ দর্শানো ছাড়াই।
যেই সম্পর্কে একজনের হাতে সুইচ আর আরেকজনের হাতে হ্যান্ডেলবার, সেটার নাম অংশীদারত্ব না।
আগের এক লেখায় ব্রডশিট দেখিয়েছিল, রাষ্ট্র কীভাবে মৃত্যুর নাম "বন্যা" রেখে দায় আকাশের দিকে পাঠায়।
করপোরেশনও একই খেলা খেলে। শ্রমিকের নাম "পার্টনার" রাখলে শ্রম আইন আর তাকে স্পর্শ করে না। নামকরণ এইখানেও আইনের ফাঁক গলানোর যন্ত্র।
➖
এতদিন তার মালিক কে ছিল? সহজ উত্তর, অ্যালগরিদম।
এমন মালিক, যার অফিস নাই, চেহারা নাই, যার সাথে তর্ক চলে না। কিন্তু সে সব দেখে। কয়টা অর্ডার নিলেন, কয়টা ফেরালেন, কাস্টমার কয়টা স্টার দিলো, কত মিনিটে পৌঁছালেন, সব তার খাতায়।
রেটিং পড়লে অর্ডার কমে, অর্ডার কমলে আয় কমে। আর ‘পারফরম্যান্স’ বেশি খারাপ হলে একদিন সকালে অ্যাপ খুলে দেখবেন, আইডি ব্লক।
মানুষ-মালিকের যুগে শ্রমিক অন্তত জানতো কার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। অ্যালগরিদম-মালিকের কোনো দরজা নাই যেখানে কড়া নাড়বেন।
এই ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতম দিকটা ধরা পড়েছে শ্রম-গবেষণা সংস্থা বিলসের এক কর্মকর্তার বলা ছোট্ট গল্পে। তার স্ত্রী অনলাইনে ডিম অর্ডার করেছিলেন। ডেলিভারির ছেলেটা আসার পর দেখা গেলো ডিমগুলি বিজ্ঞাপনের চেয়ে ছোট।
তিনি নিতে চাইলেন না। ছেলেটা হাতজোড় করে বললো, আপা, নেন, না নিলে দামটা আমার বেতন থেকে কাটবে।
ডিম ছোট হওয়ার দায়ও শেষমেশ যার ঘাড়ে, সে-ই এই চেইনের একমাত্র মানুষ যার কোনো দর কষার ক্ষমতা নাই।
আয়ের হিসাবও একই কথা বলে। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের ফেয়ারওয়ার্ক-গবেষণা বছর বছর বাংলাদেশের প্ল্যাটফর্মগুলিকে দশ নম্বরের স্কেলে মাপে।
২০২১ সালের প্রথম রিপোর্টে দশটা প্ল্যাটফর্মের কেউ এক-এর বেশি পায়নি। ২০২৩ সালের পাঁচটা প্ল্যাটফর্মের ঘরে শূন্য।
আর তাদের হিসাবে, তেল-মেরামতের খরচ বাদ দিলে এই খাতের বহু শ্রমিকের আয় নামে দেশের ন্যূনতম মজুরিরও নিচে।
বাইকের তেল পোড়ে শ্রমিকের পকেট থেকে। ব্যাগের বিজ্ঞাপন-ভ্যালু জমে কোম্পানির ব্র্যান্ডে।
➖
তারপর, গত নভেম্বরে, বিশ বছরের এই হিসাবে প্রথম ফাটল ধরলো।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশন গত বছরের এপ্রিলে রিপোর্ট দিয়েছিল। নভেম্বরে সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে এলো শ্রম আইনের সংশোধনী অধ্যাদেশ, আর এই এপ্রিলে সংসদে পূর্ণাঙ্গ আইন। সব মিলিয়ে প্রায় নব্বইটা সংশোধনী।
দেশের শ্রম আইনের ইতিহাসে এত বড় ঢেউ আর আসেনি। পেছনে চাপও ছিল বিস্তর, আইএলও-তে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চলা অভিযোগ, ইউরোপের ক্রেতাদের সাপ্লাই-চেইন আইন, আর অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ঋণ।
যেই শ্রমিকরা রাস্তায় রক্ত দিয়েছিল, তাদের কিছু ফেরত দেওয়ার দায়।
এই ঢেউয়ের ভিতরেই ঘটেছে সেই ঘটনা। শ্রম আইনের ১৭৫ ধারায়, ট্রেড ইউনিয়নের অধ্যায়ে, এই প্রথম ঢুকেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের শ্রমিক। রাইড-শেয়ারিং, ফুড ডেলিভারি, ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস। গোলাপি ব্যাগের ছেলেটা এখন আইনত ইউনিয়ন করতে পারে।
এবং ন্যায্যতার খাতিরে এটাও লেখা থাকুক, এইবার সুপারিশ হিমাগারে যায়নি। কমিশনের রিপোর্ট থেকে আইন, এক বছরের মধ্যে। এই দেশে এটা প্রায় অলৌকিক গতি।
তাহলে গল্প শেষ? দুঃখজনক উত্তর হল, না।
এখানেই আইনটার সবচেয়ে সূক্ষ্ম কারিগরি লুকানো, এবং এটাই এই লেখার আসল খবর।
গিগ-শ্রমিক ঢুকেছে ১৭৫ ধারায়, ইউনিয়নের দরজা দিয়ে। কিন্তু মূল শ্রমিক-সংজ্ঞায় সে এখনো ঢোকে নাই। আর ওই মূল সংজ্ঞাতেই বাঁধা আছে শ্রমিকের আসল প্রাপ্যগুলি, ন্যূনতম মজুরি, ছুটি, গ্র্যাচুইটি, ক্ষতিপূরণ, কর্মঘণ্টা।
মানে আইন তাকে সংগঠিত হওয়ার অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু প্ল্যাটফর্মের ঘাড়ে নিয়োগকর্তার দায় চাপায়নি।
মিছিল করার অধিকার পেয়েছে, কিন্তু মজুরি চাওয়ার আইন পায়নি। দাবি তোলার মঞ্চ পেয়েছে, কিন্তু দাবিটা যার কাছে তুলবে, সেই নিয়োগকর্তাই আইনের খাতায় অনুপস্থিত।
দরজাটা খুলেছে, তবে বারান্দা পর্যন্ত। ঘরের চাবি এখনো ঝুলছে।
একই অর্ধেক-নকশা গৃহকর্মীদের বেলাতেও। এই প্রথম আইন তাদের চিনলো, দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ আর ইউনিয়নের অধিকার পেলো লাখো গৃহকর্মী, যাদের সিংহভাগ নারী। ঐতিহাসিক, সন্দেহ নাই।
কিন্তু ন্যূনতম মজুরি? কর্মঘণ্টা? সাপ্তাহিক ছুটি? এখনো নাই।
➖
আন্তর্জাতিক তুলনাটা এইবার আরও জরুরি, কারণ ফুডপান্ডার মালিক বার্লিনের ডেলিভারি হিরো, উবারের সদর দপ্তর সান ফ্রান্সিসকো। ঢাকার সিগন্যালে ভেজা ছেলেটা কাজ করে সেই একই বৈশ্বিক করপোরেশনের জন্য।
যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছে, উবার-চালকরা শ্রমিক, ন্যূনতম মজুরি, ছুটির টাকাসহ। অস্ট্রেলিয়া গিগ-শ্রমিককে "কর্মীসদৃশ" স্বীকৃতি দিয়ে ন্যূনতম মজুরির আওতায় এনেছে।
ভারত ২০২০ সালেই সামাজিক নিরাপত্তা আইনে গিগ-শ্রমিকের কল্যাণ তহবিলের কাঠামো বানিয়েছে।
পার্থক্যটা ধরেন। ওরা গেছে প্রাপ্যের দিকে। টাকা, বিমা, মজুরি। আমরা দিয়েছি কণ্ঠের অধিকার, সংগঠন, ইউনিয়ন। কণ্ঠ জরুরি, কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে তো ভাত হয় না, কণ্ঠ দিয়ে ভাত চাইতে হয়। আর চাওয়ার আইনি ঠিকানাটাই এখনো ফাঁকা।
করপোরেশন কোথাও দয়া করে অধিকার দেয় না, আইন আদায় করে। লন্ডনে আইন পুরোটা চেয়েছে, তাই পুরোটা দিতে হয়। ঢাকায় আইন অর্ধেক চেয়েছে, কতটুকু মিলবে, নিজেই অনুমান করেন।
➖
আরেকটা প্রশ্ন এই লেখা এড়াতে পারে না, লাখো রাইডারের ভিতরে মেয়ে কই?
সংখ্যাটা এতই নগণ্য যে আলাদা করে গোনাই হয় না। অথচ এই কাজে ডিগ্রি লাগে না, মামা-খালু লাগে না। শুধু একটা বাহন আর একটা ফোন। কাগজে এটা নারীর জন্য সবচেয়ে খোলা দরজা হওয়ার কথা ছিল।
দরজা বন্ধ করলো কীসে? মোটরসাইকেল বা সাইকেলের মালিকানা পুরুষের। রাতের শহর পুরুষের। রাস্তার পাশের টয়লেট পুরুষের। অচেনা বাড়ির দরজায় একা কড়া নাড়ার নিরাপত্তাটুকুও পুরুষের।
মানে ডেলিভারি-অর্থনীতি পুরুষের হয়ে ওঠেনি। শহরটাই পুরুষের, ডেলিভারি তার একটা উপসর্গ মাত্র।
➖
তবে শ্রমিকরা কোনোদিনই আইনের অপেক্ষায় বসে ছিল না।
২০২১ সালেই ঢাকার রাস্তায় ফুডপান্ডার রাইডাররা নেমেছিল। কমিশন আর বকেয়া মজুরির প্রতিবাদে। রাইডারদের ফেসবুক গ্রুপগুলিতে হাজার হাজার সদস্য। ইউনিয়ন ছিল না, কিন্তু ইউনিয়নের ছায়া তৈরি হচ্ছিল।
আর সবচেয়ে কৌতূহল-জাগানো বিদ্রোহটার নাম গবেষকরা দিয়েছেন "খ্যাপ।" ফেয়ারওয়ার্কের গবেষণায় উঠে এসেছে, চালকরা ক্রমশ প্ল্যাটফর্ম এড়িয়ে সরাসরি কাস্টমার ধরছে, অ্যাপে পরিচয়, তারপর ফোন নম্বর, তারপর কমিশনের ভাগ না দিয়ে সোজা চুক্তি।
যেই অ্যালগরিদম তাকে নিংড়ায়, সে সেই অ্যালগরিদমকেই মাঝপথে ফেলে দিচ্ছে।
এটাকে চুরি বলবেন না। এটা দর কষাকষি, যার ইউনিয়ন ছিল না, সে দর কষেছে পায়ে।
এখন ইউনিয়নের আইনি রাস্তা খুলেছে। প্রশ্নটা তাই সামনে, এই দেশের প্রথম নিবন্ধিত গিগ-ইউনিয়নটা কে বানাবে, কবে বানাবে, আর বানানোর পর তার প্রথম দাবিটা কী হবে?
উত্তরটা আসলে ওই অর্ধেক আইনেরই লেখা আছে।
➖
শেষ হিসাব।
একটা খাত জিডিপির পাঁচ শতাংশ জোগায়, দশ লাখের বেশি পরিবার চালায়, "ডিজিটাল বাংলাদেশের" প্রতিটা প্রেজেন্টেশনে তার ছবি থাকে। গোলাপি ব্যাগ, হাসিমুখ, স্মার্টফোন।
বিশ বছর পর আইনের অভিধানে সেই মানুষটার নাম উঠেছে। এটা ছোট ঘটনা না, যেই শব্দ ছিলই না, সেটা এখন আছে, এবং ইতিহাস বলে অভিধানে ঢোকাটাই শ্রমিকের প্রথম জয়।
কিন্তু নামটা উঠেছে ফুটনোটে। মূল পাতায় যেখানে মজুরি লেখা হয়, ছুটি লেখা হয়, ক্ষতিপূরণ লেখা হয়, সেই পাতায় সে এখনও অনুপস্থিত।
#ব্রডশিট #গিগঅর্থনীতি #শ্রমিক #বাংলাদেশ #শ্রমআইন