08/06/2026
**সাবেকুন নাহার সনির ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী
রক্তের ঋণ, বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া এবং বুয়েটে গুপ্ত প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে আমাদের অঙ্গীকার**
আজ ৮ জুন। ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ মাত্র নয়; বুয়েটের ইতিহাসে এটি এক বেদনাবিধুর স্মৃতি, এক অপূর্ণ বিচারের আর্তনাদ। আজ থেকে চব্বিশ বছর আগে এই দিনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিকৌশল বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনি নির্মম সহিংসতার শিকার হয়ে আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নেন। তাঁর অকালপ্রয়াণ শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি; ক্ষতবিক্ষত করেছে সমগ্র শিক্ষাঙ্গনের বিবেককে।
কিন্তু সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—দুই যুগেরও অধিক সময় পেরিয়ে গেলেও সনির রক্তের বিচার আজও অধরা। এই বিচারহীনতা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ব্যর্থতার নাম নয়; এটি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় সত্যকে বারবার নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে।
২০০২ সালের সেই রক্তাক্ত সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি। জাতি প্রত্যক্ষ করেছে কীভাবে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে ন্যায়বিচারের পথকে জটিল ও দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। একজন নিরপরাধ শিক্ষার্থীর নিথর দেহের ওপর দাঁড়িয়ে যারা রাজনৈতিক সুবিধার হিসাব কষেছে, ইতিহাস তাদের দায় কখনো বিস্মৃত হবে না।
চব্বিশ বছর পরও বিচারহীনতার এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি কখনো কেবল প্রকাশ্যে নয়, আড়ালেও সক্রিয় থাকে। সনির হত্যাকারীরা কিংবা তাদের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ানো শক্তিগুলো আজও সম্পূর্ণ জবাবদিহির মুখোমুখি হয়নি। এই বাস্তবতা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার প্রতীক নয়; এটি ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রামরত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি।
আরও উদ্বেগের বিষয়, আজকের বুয়েটে দৃশ্যমান রাজনীতির অনুপস্থিতির আড়ালে এক ধরনের গুপ্ত প্রতিক্রিয়াশীলতার চর্চা ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে। প্রগতিশীল চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সংকুচিত করার যে অদৃশ্য প্রবণতা ক্যাম্পাসজুড়ে সক্রিয়, তা শিক্ষার মৌলিক চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। নামহীন, মুখোশধারী এই অপতৎপরতা প্রকাশ্য সংঘাতের চেয়েও অনেক সময় বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা আজ দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করছে—সাবেকুন নাহার সনি হত্যার বিচার নিশ্চিত করতেই হবে। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল, যারা খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে, যারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে—তাদের প্রত্যেককে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। বিচারহীনতা কখনো স্থায়ী আশ্রয় হতে পারে না; ইতিহাস একদিন তার সকল হিসাব বুঝে নেয়।
সনির স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা কেবল ফুলেল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর প্রতি সত্যিকারের সম্মান হবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে, হবে এমন এক শিক্ষাঙ্গন নির্মাণের মধ্য দিয়ে যেখানে মুক্তচিন্তা অবদমিত হবে না, প্রগতিশীলতার পথ রুদ্ধ হবে না, গণতান্ত্রিক চর্চা ভয়ের কাছে পরাজিত হবে না।
মরহুমা সাবেকুন নাহার সনির রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।
সনির রক্তের দাগ ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায়নি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সেই স্মৃতি আমাদের বিবেককে জাগ্রত রাখবে, আমাদের সংগ্রামকে প্রেরণা জোগাবে।
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু