07/04/2026
মরহুম শোয়ায়েব আলী মাষ্টার সাহেবের জ্যেষ্ঠ কন্যা জহুরা বেগম।
- ইন্জিনীয়ার (ডক্টরেট ডিগ্রীধারী )
নিম্নের লিখাটি তিনার ফেইসবুক প্রোফাইল থেকে নেয়া।
লিখাটি যাকে কেন্দ্র করে লিখা হয়েছে, তিনি সরকার বাড়ীর বড়ো পুত্রবধু, মরহুম শোয়ায়েব আলী মাষ্টার সাহেবের সহধর্মিণী মোছাঃ খালেদা বেগম। সেই সুবাদে তিনি মরহুম রইছ উদ্দীন আহাম্মেদ (মাষ্টার) সাহেবের মাতৃসম বড়ো ভাবিজান।
◽আমার মা, মোছাঃ খালেদা বেগম
৮৪ বৎসরের বৃদ্ধা এক মহিয়ষী মহিলা। আমার নানা মোঃ ইসমাঈল হোসেন যিনি বাঙ্গালী এবং বাংলাদেশী হয়েও তৎকালীন পূর্ব পকিস্তান সরকারের একজন উচ্চ পদস্হ সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন। ছোটবেলাতেই তিনি পিতৃ-মাতৃহীন হন। কিন্তু তিনি ছিলেন অসম্ভব মেধাবী এবং দূরদর্শী। এই কারনে তিনি তার জন্মস্হানীয় এলাকার প্রভাবশালী, বিত্তশালী লোকদের নজরে পড়েন। বিশেষ করে স্হানীয় পভাবশালী এবং বিত্তশালী বক্তি মতিয়র রহমান সরকারের ( তৎকালীন জুরীর একজন সদস) )। মতিয়র রহমান সরকার-উনার আদরের ছোটমেয়ে শামসুন্নেছার সাথে আমার নানার বিয়ে দেন।
আমার নানা-নানীর প্রথম সন্তান আমার মা। আমার নানার আদরের, অতি আদরের এবং স্নেহধনা। আমার মা তাঁর বাবার মতই অতন্ত মেধাবী ছিলেন। কিন্তু বেশীদূর লেখাপড়া করতে পরেননি তাঁর নানা মতিয়র রহমান সরকারের কারণে। মতিয়র রহমান সরকার আমার মাকে বিয়ে দেন অল্প বয়সেই ১৯৪৮ সালে আমার নানার অনুপস্হিতির (অবশই আমার নানীর মতামত ছিল বিয়েতে) সুযোগ নিয়ে তৎকালীন জামালপুরের আরেক প্রভাবশালী বক্তি মোঃ আজগর আলী সরকার (আমার দাদা) এর ছেলে মোঃ শোয়ায়েব আলীর সাথে। এ বিয়েতে আমার মা সুখী হলেও আমার নানা সন্তুষ্ট ছিলেন না। কারণ আমার নানার স্বপ্ন ছিল আমার মা একজন ডাক্তার হবেন। আমার আম্মারও একইরকম ইচ্ছা ছিল। তাই পরবর্তীতে তিনি তাঁর ছোটবোনদের বালকালে বিয়ে দেয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। ফলশ্রতিতে আমার মেজখালা খোদেজা বেগম একজন ডাক্তার। এবং অন ২জন খালারা মাষ্টার্স ডিগ্রীধারী।
আমার মা উনার বাবার স্বপ্নে স্বপ্নচারী একমা। মধবিত্ত পরিবারে ৯(নয়) সন্তানের মা। তার উপর দেবর এবং দেবরদের সন্তান। সবমিলে ১৫-১৬ জন সন্তান এবং সন্তানতূল। অতি সাধারন জীবন ছিল আম্মার। আর দশটা বাঙ্গালী বধুর মতই আম্মা সংসার, পরিবার ও সমাজের বিভিন্ন কাজ করে দিন কাটিয়েছেন। এ চলার পথে আম্মার অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে। ছোটবড় সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছেন। অনেকের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন এবং এখনও হচ্ছেন।
আমার নানা সবসময় বলতেন আমার মা তাঁর ভাইবোনদের থেকে সবচেয়ে মেধাবী। আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি তিনি প্রতিদিন লেখাপড়া করেন। আজ ৮৪(চুরাশি) বছরেও তিনি প্রতিদিন বই পড়েন। নিউরো সায়েন্স বলে প্রানীকূল মধে কোষ এর কিছু অংশের জিন শুধুমাএ মা থেকে আসে। যা মেধাকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করে। তাইতো আম্মার ৯(নয়)সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। অনেকেই আমার মাকে বলে রত্ন--রত্না গর্ভা মা।
আমার মা ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন। স্কুল পড়ুয়া অবস্হায় বিয়ে হয়ে গিয়েছিল বলে তা হতে পরেনি। আমার নানা সবসময় আমার মাকে আদর আর সান্তনা দিতেন। বলতেন,তুই হতে পারিসনি তাতে কি হয়েছে। তোর সব সন্তানরাই তাই হবে। আমার নানা আমাদের বলতেন “I WISH EVERY SUCCESS IN YOUR LIFE” . আমার নানার আশীর্বাদ সব সময় আমাদের জন ছিল। আমার মার যে কোন বিপদের সময় দেখেছি আমার নানা পাশে এসে দাঁড়াতেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আর আনন্দের সময়ও চলে আসতেন ময়মনসিংহ থেকে জামালপুরে আম্মার পাশে। বলতেন, প্রাণখুলে হাস খালেদা, আমি দেখি।
১৯৮১ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ। নানা তখন ভীষণ অসুস্হ। ডায়াবেটিস এর রোগী তার উপর জন্ডিস। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলো নানাকে। অবস্হা সংগীন। আমার বড়ভাই ছলিম(ডাঃ মনজুর) সেই হাসপাতালেরই ডাক্তার। সে একাই যথেষ্ট। তবুও আমার মা নিজে জামালপুরের বাসা ছেড়ে ময়মনসিংহে আসতে পারছেন না বলে আমার আব্বা ও আমার আরেক বড়ভাই তিতুকে (ইন্জিনীয়ার) পাঠিয়ে দিলেন নানার পাশে সর্বক্খণ থাকার জন্য | নানার সেবা করার জন্য
আব্বার ছিল সরকারী এবং বদলীর চাকুরী। বিভিন্ন স্হানে ঘুরে ঘুরে আব্বা থিতু হলেন জামালপুর, মফস্বল শহরে। কারণ জামালপুরের মেলান্দহ হলো আব্বার বাপ-দাদার বাড়ী। জামালপুরে বদলীর পর আব্বা আমাদের সবাইকে নিয়ে উঠলেন আম্মার এক আত্মীয় মামা আবুল হোসেন সিদ্দীকি (মেজর সামছুল হায়দার সিদ্দীকি জুয়েল এর বাবা) এর বাসায়, বকুলতলায়। সেখান থেকে জিলা স্কুল ছিল খুব কাছেই। তাই আম্মার মামা আমাদের সবাইকে জিলা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু আমার আম্মা চাইলেন সিংহজানী স্কুলে সবাইকে ভর্তি করাতে। কারণ সিংহজানী স্কুল(নান্দিনা স্কুল নয়) থেকেই আমার নানা মোঃ ইসমাঈল হোসেন ১৯২৪ সালে সর্বোচ্চ স্হান অধিকার করে মেট্রিক পাশ করেছেন। এবং আমার আব্বা, চাচারা, দাদা সবাই ঐ স্কুল থেকেই পড়েছেন। আমার আম্মা তো তাঁর বাবার হৃদয়ের পুটলি, আদরের ধন। তিনি ময়মনসিংহ থেকে চলে এলেন জামালপুরে আম্মার এ সমসার সমাধান করাতে। ফলে আম্মা ৬(ছয়) ছেলের মধে ৩(তিন) ছেলেকে ভর্তি করালেন জিলা স্কুলে আর বাকী ৩(তিন) ছেলেকে সিংহজানী বয়েজ হাই স্কুলে। সেইসাথে আমাকেও ভর্তি করালেন সিংহজানী বয়েজ হাই স্কলে ২য় শেণীতে। আমার স্কুলজীবন শুরু এখান থেকেই। সে সময় সিংহজানী বয়েজ স্কুলে কোন মেয়ে ভর্তি করা যেতো না। আমি প্রথম মেয়ে ছাএী যাকে সেই স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল স্কুলকর্তৃপক্ষ। সম্ভবত নানা-দাদা, বাপ-চাচাদের কৃতিত্বের সাথে লেখাপড়া করার কারণে।
আম্মা তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচুৎ হননি। যে যে স্কুলে পড়ুক না কেন আম্মা তাঁর প্রতিটি সন্তানকে গড়ে তুলেছেন কঠোর পরিশ্রম আর গভীর মমতায়। ফলে আম্মার সন্তানরা(মানে আমরা ভাইবোনরা সবাই) শুধু মেধাবীই(কেউ কেউ সারাজীবন লেখাপড়ায় প্রথম স্হান অধিকার করেই গেছেন। আমার আম্মা আমার নানার সবচাইতে মেধাবী সন্তান ছিল বলেই হয়তো তা সম্ভব হয়েছে।) নয়, অমায়িক, ভদ্র , পরোপকারী, ধৈর্যশীল, কঠোর পরিশ্রমী , সমাজে সুপতিষ্ঠিত। সবাই লেখাপড়া করেছে –BUET, RUET,MMC,CMC, DU এবং RU থেকে। আমরা তিন বোন। আমি ইন্জিনীয়ার(ডক্টরেট ডিগ্রীধারী ), মেঝো ডক্টরেট ডিগ্রীধারী , ছোট ডাক্তার (মাষ্টার্স ডিগ্রীধারী)। আমার আম্মা তাঁর স্বপ্নপূরণ করতে পেরেছেন। তিনি নিজে ডাক্তার হতে পারেননি বটে তবে তাঁর প্রতিটি সন্তানকেই ডাক্তার এর সমপর্যায়ের মর্যাদায় গড়ে তুলেছেন। তিনি একজন স্বার্থক মা, সফল মা, রত্নগর্ভা মা, সর্বোপরি ভীষণ আত্মমর্যাদাশীল মা।
তাঁর এই চলার পথে তিনি শুধু চেয়েছেন আব্বাকে তাঁর পাশে থাকতে- তা পেয়েছেন। না চাইতেও পেয়েছেন আমার নানার সুশীতল আর্শীবাদ। যা আম্মাকে কর্মোদ্দম রেখেছে। কিন্তু কখনও কারও কাছ থেকে কোন আর্থিক সাহায্য নেননি অথবা চাননি। বরং তিনি সমাজের অনেককেই নিরবে আর্থিক সাহায্য করে গিয়েছেন নিরন্তর। তিনি যেমন তাঁর নিজের মেয়েদের লেখাপড়া শেষ না করিয়ে বিয়ে দেননি, তেমনই তাঁর দেবর ননদের মেয়েদেরকেও লেখাপড়া শেষ করে চাকুরী না করা পর্যন্ত বিয়ে দিতে বাঁধা দিয়েছেন। আমাদের দাদা বাড়ীর পুরো গ্রামের আভন্তরীন পরিবেশ বদলিয়ে দিয়েছেন। যেখানে মারামারি, লাঠালাঠি লেগেই থাকতো সেখানে লেখাপড়া করার মানসিকতা তৈরী করে দিয়েছেন। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। গ্রামের অনেক ছেলেরাই মেট্রিক , ইন্টারমিডিয়েট অথবা ডিগ্রী পরীক্ষার টেষ্টের পর যে তিন মাস পরীক্ষা প্রস্তুতির সময় থাকে সেই তিন মাস আমাদের বাসায় থেকে লেখাপড়া করার জন বইখাতা বস্তায় বেঁধে নিয়ে চলে আসতো। বলতো, জাঠিআম্মা, আপনার কাছে থেকে লেখাপড়া করবো। আম্মা নিজের বাসায় সাদরে ওদের থাকার সুববস্হা করে দিতেন। এবং সময়মতো খাওয়া দাওয়ারও বেবস্থা করতেন। যারা পরীক্ষার ফী দিতে পরতো না তাদের ফী টা পর্যন্ত দিয়ে দিতেন। আমার নানা বাড়ী গোড়াকান্দার অনেক আত্মীয় এবং ছাএ-ছাএীরাও এভাবে আমাদের বাসায় এসে থাকতো। এরকম অগণিত রয়েছে। আমার আম্মা এখন বার্ধকে। আজ তারা ঢাকায় এলে আম্মাকে দেখে যায়, সালাম করে যায়। তারা আম্মাকে সম্মান করে, আম্মা স্বার্থক। আম্মা তাঁর বাবার যোগ্য উত্তরসূরী। যা আমার নানা করতে পারেনি কিন্তু মনে মনে পোষণ করতেন এবং চাইতেন তাঁর সন্তানরা করুক তা আমার মা পূর্ণ করেছেন জামালপুরের মত একটা মফস্বল শহরে থেকেই।
আমি গর্বিত এমন মায়ের সন্তান হতে পেরে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা তিনি আম্মাকে দীর্ঘজীবি করুন, সুস্বাস্হ দান করুন।
উল্লেখ্য, মরহুম শোয়ায়েব আলী মাষ্টার সাহেবের সহধর্মিণী মোছাঃ খালেদা বেগম পরলোকগত হয়েছেন। তিনাদের পরকালীন জীবনের মঙ্গল কামনা করছি।