14/08/2026
"নাস্তিকদের কাছে নৈতিকতার মানদণ্ড কী?"—এই প্রশ্ন ধার্মিকরা করে থাকে। যদিও এই প্রশ্নের উত্তর বহুবার দেওয়া হয়েছে, মানদণ্ড সম্পর্কে তাদের ধারণা ও আমাদের ধারণার মধ্যে যে তফাৎ আছে, সেই বিষয়টা তাদের বোঝানো কঠিন। মানদণ্ড বলতে তারা বোঝে আগে থেকেই বিদ্যমান এমন কিছু, যার মাধ্যমে ভালো-মন্দ শতভাগ নিখুঁতভাবে যাচাই করা যায়। আমাদের কাছে মানদণ্ড "আগে থেকে প্রদত্ত" কিছু নয়। আমাদের মতে, মানদণ্ড মানব সভ্যতার হাতে সর্বদা নির্মিত হতে থাকে। এই মানদণ্ড নির্মাণে যেমন কনফুসিয়াসের হাত আছে, সক্রেটিসের হাত আছে, তেমনি হাত থাকবে ভবিষ্যৎ দার্শনিকদেরও। আমাদের মানদণ্ডের নির্মাণ কখনো শেষ হবে না, কারণ আমরা বিশ্বাস করি না নৈতিকতার পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ড বলে কিছু সম্ভব। আমাদের জগৎ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান যত বাড়তে থাকে, ততই আমাদের নৈতিকতার মানদণ্ডের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। অনেক অপরাধের কারণ সম্পর্কে আমাদের অতীত ধারণা স্পষ্ট ছিল না, ধীরে ধীরে এর কারণগুলো আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। এই কারণগুলো জানার সাথে সাথে নৈতিকতা নিয়ে আমাদের আগের ধারণাও বদলে গেছে।
মুসলিমদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা আছে—হিজড়া হওয়ার কারণ স্বামী-স্ত্রীর সহবাসকালে জিনের অংশগ্রহণ, বা সহবাসের ইসলামি নিয়ম-কানুন অনুসরণ না করা। বিকলাঙ্গ শিশু কেন জন্মগ্রহণ করে, তা নিয়েও মুসলিমদের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণার শেষ নেই। তাদের হাদিস গ্রন্থে এসেছে—একদা নবী সুলায়মান শপথ করেন, তিনি তাঁর একশো স্ত্রীর সাথে সহবাস করবেন এবং তার ফলে একশো ছেলে সন্তান জন্ম নেবে, এবং সেই ছেলেরা বড় হয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে। নবী সুলায়মান তাই করলেন, পরে দেখা গেল একশো শিশুর বদলে জন্ম হয়েছে একশোটি মাংসের দলা। আল্লাহ নবী সুলায়মানকে বললেন—সে ঐ শপথ নেবার পর "ইনশাআল্লাহ" বলেনি, তাই তার একশো স্ত্রী একশোটি মৃত মাংসের দলা প্রসব করেছে। এইভাবে ইসলামসহ যাবতীয় ধর্ম বিকলাঙ্গ শিশু হওয়ার আসল কারণ আড়াল করে রাখে। ইসলাম বলছে চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো ভাই বোনে বিয়ে করা হালাল কিন্তু রক্তের সম্পর্ক নাই এমন দুই জন যদি এক নারীর দুধ পান করে তাহলে তাদের বিয়ে হারাম। দুধ ভাই বোন নামের ফালতু ধারণার উপর ভিত্তি করে তারা বাংলাদেশে মিল্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বন্ধ করে দিয়েছে তউহিদী জনতা নামের বর্বরের দল।
এখন আমরা জানি হিজড়া সন্তান কেন হয়, শিশু বিকলাঙ্গ কেন হয়। বিজ্ঞান এই বিষয়গুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার করায় হিজড়াদের বিষয়ে আমাদের নৈতিক আচরণের পরিবর্তন এসেছে। আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ বলছেন—হাদিসে এসেছে হিজড়াদের বাড়ি থেকে বের করে দিতে হবে। অনেক বাবা-মা ইসলামের এই বিধান না মেনে হিজড়া সন্তানকে লালন-পালন করে, সম্পত্তিতে অধিকার দেয়। আপনি এমন কোনো হুজুর দেখাতে পারবেন না, যে তার হিজড়া সন্তানকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় নাই; সম্পত্তির অধিকার দেওয়া তো বহু পরের বিষয়। এখন আমরা জানি ইসলামে হালাল কাজিন বিয়ের কারণে সন্তানের বিকলাঙ্গ হবার সম্ভাবনা বাড়ে, পাকিস্তানে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে এই কাজিন বিয়ের কারণে, আর অপর দিকে বিজ্ঞান আমাদের বলছে একই নারীর দুধ পান করা দুইজনের সাথে ভবিষ্যৎ বিয়েতে কোন সমস্যা নাই। মিল্ক ব্যাঙ্ক থেকে কেউ যদি দুধ কিনে তার সন্তানকে পান করায় এবং পরবর্তীতে ঐ একই মিল্ক ব্যাঙ্ক থেকে দুধ পান করা কোন শিশুর সাথে বড় হবার পর যদি তাদের বিয়ে হয় তাহলে তারা জানতেও পারবে না কোন নারীর তারা দুধ পান করেছিল, আর তাদের বিয়েতে শারীরিক কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নাই। ইসলাম এখানে যা খারাপ তাকে করেছে হালাল আর যা ভাল তাকে করেছে হারাম, কারণ হলো ইসলামের নৈতিকতার যে মানদণ্ড, তার কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের যে মানদণ্ড, তা নতুন জ্ঞানের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়—ভবিষ্যতেও মানিয়ে নেবে।
রাজিবুর রহমান,
২২ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (৬ আগস্ট ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ)