21/09/2026
পুঁজিবাদী নীতিই চলমান জ্বালানি সংকটের জন্য দায়ী
জনস্বার্থভিত্তিক জ্বালানি নীতি: প্রস্তাবিত ইসলামী মডেল
PDF আকারে পড়ুন: https://shorturl.at/9vR4E
হে দেশবাসী, বর্তমান জ্বালানি সংকট সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর পরামর্শ এবং ক্যান্সারাস পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবাধ বেসরকারিকরণ নীতির একটি বাস্তব প্রতিফলন, যার নির্মম পরিণতি হচ্ছে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, দেশব্যাপী অসহনীয় লোডশেডিং, শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত এবং কারখানা-শ্রমিকদের জীবিকার অনিশ্চয়তা।
বর্তমান সরকার এই সংকটের দায় পতিত হাসিনা সরকারের উপর চাপালেও, বাস্তবে তারা সেই একই সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে আরও বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।
আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর শর্তের কারণে দেশের একমাত্র তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান BAPEX-এর রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা প্রত্যাহার করা হচ্ছে এবং জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পরিবর্তে আমদানি ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) নির্ভর জ্বালানি নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় বাজেট (২০২৫-২৬)-এ এলএনজি আমদানিতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৫৮,০০০ কোটি টাকা, অথচ গ্যাস অনুসন্ধান, জরিপ ও কূপ খনন প্রকল্পে বরাদ্দ কেবল ১,১২৯ কোটি টাকা।
পুঁজিবাদী নীতি উৎপাদন বন্টন চুক্তি (PSC)-এর মাধ্যমে ১৯৭৪ সাল থেকেই দেশের তেল-গ্যাস সম্পদের উপর লুটেরা বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য বিস্তার করছে। যার একটি নির্মম দৃষ্টান্ত হলো, মার্কিন বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি শেভরন (Chevron) একাই দেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
হে দেশবাসী, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এসব ধ্বংসাত্মক নীতি জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে প্রধান বাধা এবং জনগণের দুর্দশার মূল কারণ। এই সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে আমরা, হিযবুত তাহ্রীর, উলাই’য়াহ্ বাংলাদেশ খিলাফত রাষ্ট্রের জনস্বার্থভিত্তিক ইসলামী জ্বালানি নীতি উপস্থাপন করছি:
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এবং পেট্রোবাংলার যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনও গড়ে প্রায় ৩২.১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF) অ-আবিষ্কৃত গ্যাস মজুত রয়েছে। বর্তমানে বাৎসরিক উৎপাদন (০.৭১ TCF) হিসাব করলে, এই পরিমাণ গ্যাস প্রায় ৪৫ বছরের উৎপাদনের সমান। আবার, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ (GSB)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি প্রধান কয়লাক্ষেত্রে প্রায় ৭,৯৬২ মিলিয়ন টন উচ্চমানের বিটুমিনাস কয়লার মজুত রয়েছে। কিন্তু এই বিপুল কয়লা সম্পদের খুব সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত উত্তোলন ও ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ, U.S. Energy Information Administration (EIA)-এর সর্বশেষ বিশ্লেষণ (২০২৩) অনুযায়ী চীনের মোট প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬২% এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫৯.৩% কয়লা থেকে আসে। তাছাড়া, BAPEX সিলেটের কৈলাশটিলা ও হরিপুরে নতুন তেল মজুতের সন্ধান পেয়েছে।
শারী’আহ্ আইন অনুযায়ী তেল-গ্যাস-কয়লা জনগণের সম্পদ (গণমালিকানাধীন সম্পদ), যা ইজারা দেয়া বা বেসরকারিকরণ ইসলামে নিষেধ। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন: “মুসলিমরা (জনগণ) তিনটি বিষয়ে পরস্পরের অংশীদার (শরীক): পানি, চারণভূমি এবং আগুন (জ্বালানি)” [আবু দাউদ]। আনাস (রা.) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করার সময় এর সাথে যুক্ত করেছেন, “এবং এর মূল্য গ্রহণ করা হারাম (নিষিদ্ধ)।”
খিলাফত রাষ্ট্র, তেল-গ্যাস-কয়লাসহ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ থেকে উপনিবেশবাদী কোম্পানীসমূহকে উচ্ছেদ করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় উত্তোলন করবে এবং এগুলোর সুবিধা সর্বসাধারণের নিকট পৌঁছে দিবে।
বিদ্যুৎখাতে কুইক রেন্টাল প্রকল্পের নামে দেশি-বিদেশি কোম্পানীসমূহের (আদানি গ্রুপ, সামিট গ্রুপ) সাথে চুক্তিসমূহ বাতিল করবে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এই বিদ্যুৎ সুলভ মূল্যে জনগণের মধ্যে বন্টন করবে, এবং কল-কারখানায় সরবরাহ করবে।
জ্বালানি একটি কৌশলগত সম্পদ, তাই এই খাতকে সাম্রাজ্যবাদীদের দখলে প্রদান করা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এর মাধ্যমে তারা আমাদের উপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। আল্লাহ্ (ﷻ) বলেন, “...আর কিছুতেই আল্লাহ্ মু‘মিনদের উপর কাফিরদের কর্তৃত্বকে মেনে নিবেন না” [সূরা আন-নিসা : ১৪১]। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে খিলাফত রাষ্ট্র অন্যতম অগ্রাধিকার দিবে।
সোলার, বায়োগ্যাসের মত প্রকল্পসমূহ বেসরকারি কিংবা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই লক্ষ্যে রাষ্ট্র যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদান করবে।
হে দেশবাসী, আমরা হিযবুত তাহ্রীর, আপনাদের নিকট আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ উৎপাদনের দাবী জানান; জ্বালানি খাতকে দেশি-বিদেশি পুঁজিবাদী কোম্পানির কবল থেকে উদ্ধার করতে সকল রাজনৈতিক দলের উপর চাপ অব্যাহত রাখুন; পুঁজিবাদের বেসরকারিকরণ এজেন্ডাকে রুখে দাঁড়ান। সর্বোপরি, হিযবুত তাহ্রীর-এর সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজকে আরও শক্তিশালী করুন।
আল্লাহ্ (ﷻ) বলেন, “আর যে আমার স্মরণ (বিধি-বিধান) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, নিশ্চয়ই তার জীবিকা হবে সংকীর্ণ, আর তাকে কিয়ামাতের দিন উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়” [সূরা ত্বহা : ১২৪]।