08/03/2023
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যে বড় বড় বিস্ফোরণের ঘটনাগুলি ঘটছে সেগুলোর বেশিরভাগ এর মূল কারণ আবদ্ধ স্থানে জমে থাকা দাহ্য গ্যাস।
২০২০ সালের নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ,
২০২১ সালে মগবাজার ওয়ারলেস গেটে বেঙ্গল মিটের শোরুমে বিস্ফোরণ, সম্প্রতি সাইন্স ল্যাব এলাকায় বিস্ফোরণ সবগুলির মূল কারণ হচ্ছে আবদ্ধ জায়গায় জমে থাকা গ্যাস। বিষয়টি খুব সহজে আলোচনা করার চেষ্টা করব যাতে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ বুঝতে পারে।
ন্যাচারাল গ্যাস বা মিথেন গ্যাস বাতাসের তুলনায় হাল্কা হওয়ায় উৎস থেকে সহজেই যেকোনো ফাকফোকর দিয়ে বের হয়ে উপরের দিকে চলে যায় এবং বদ্ধ পরিবেশ পেলে জমা হতে থাকে ।
বাসা, অফিস, রান্নাঘর, বাথরুম, গুদামঘর, সেপটিক ট্যাংক বা অন্য কোন স্থান আবদ্ধ থাকলে মিথেন গ্যাস নানা কারনে নানা উৎস হতে জমা হতে পারে।
পুরনো গ্যাসের লাইন লিকেজ হয়ে , রান্নার সিলিন্ডার গ্যাসের রেগুলেটর ,হোজ পাইপ বা ভাল্বের লিকেজ থেকে, সুয়ারেজ লাইনের পাইপের লিকেজ থেকে, সেপটিক ট্যাংক ভেতরে বা পাইপলাইন লিকেজ হতে, ক্যামিকেল স্টোরেজ থেকে বা গ্যাস উৎপাদনের কোন উৎস থাকলে। এমনকি পুরনো গ্যাসের লাইন বন্ধ করে দিলেও সেই গ্যাস লাইন থেকে গ্যাস লিকেজ হতে পারে ।
এইসব জমে থাকা গ্যাস কোন আগুনের উৎস যেমন বৈদ্যুতিক স্পার্ক, শর্ট সার্কিট, দেয়াশলাই, লাইটার, সিগারেটের আগুন, এমনি সুইচ অন করার সময় সুইচের ভেতরে স্পার্ক ইত্যাদির সংস্পর্শে আসলে বিস্ফোরিত হতে পারে। পুরো আবদ্ধ জায়গাটি তখন একটি বড় বোমার মত কাজ করবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আবদ্ধ জায়গার বাতাসে কি পরিমান মিথেন গ্যাস জমা হলে সেটি বিস্ফোরকের মত কাজ করতে পারে? এটার পেছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি ? সেটি বুঝতে হলে আমাদের ১ নং ছবির দিকে ভালোভাবে দেখতে হবে ।
সাধারণত বাতাসের সাথে মিথেন বা ন্যাচারাল গ্যাস যদি আয়তন অনুযায়ী (volume/volume) মাত্র ৫ ভাগ থেকে ১৫ ভাগ পর্যন্ত মিশ্রিত হয় তবে সেই বাতাস ও মিথেনের মিশ্রনটি বিস্ফোরক হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ কোন আবদ্ধ রুমের বাতাসের আয়তনের যদি ন্যূনতম পাঁচ ভাগ মিথেন গ্যাস কোনভাবে প্রবেশ করতে পারে তবে পুরো রুমটি একটি এক্সপ্লোসিভ হিসেবে কাজ করতে পারে যেটিকে লোয়েস্ট এক্সক্লুসিভ লিমিট বা সংক্ষেপে এল ই এল বলে। মিথেনে পরিমাণ বাড়তে বাড়তে বাতাসের ১৫ ভাগ হলেও সেটি একইভাবে কাজ বিস্ফোরক হিসেবে কাজ করবে। তবে ১৫ ভাগের বেশি হয়ে গেলে আর সেটি বিপদজনক নয় যাকে বলা হয় হাইয়েস্ট এক্সপ্লোসিভ লেভেল বা এইচ ই এল।
সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে আবদ্ধ জায়গায় গ্যাস বিস্ফারণ এর জন্য বেশি গ্যাস প্রয়োজন হয় না । বাতাসের আয়তনের ৫-১৫ ভাগই যথেষ্ট।
এখন প্রশ্ন হলো সেই বিস্ফোরণের মাত্রা বা ভয়াবহতা কেমন হবে। সেটা অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করবে। বিল্ডিংয়ে রুমের সাইজ বা আয়তন কত বড়, উপাদান, ডিজাইন, অবস্থান, চারিদিকের পরিবেশ কেমন, ভেন্টিলেশনের অবস্থা কেমন ইত্যাদির উপর। আরেকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কত ভাগ গ্যাস জমা হয়েছে। ২ নং ছবিটি ভালোভাবে দেখলে বুঝতে পারবেন। বাতাসে মিথেনের অনুপাত প্রায় ৯, ১০ বা ১১ ভাগের কাছাকাছি থাকলে বিস্ফোরণের ভয়াবহতা হবে সবচেয়ে বেশি।
এজন্য সাম্প্রতিক সময়ের উল্লেখিত সকল ঘটনায় 'বিহাইন্ড দ্যা স্টোরি' একই রকম কিন্তু ভয়াবহতা ভিন্ন প্যারামিটার এর জন্য ভিন্ন রকম।
নারায়ণগঞ্জ এর মসজিদের ঘটনা গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে। লিকেজ হয়ে টাইলসের ফাক দিয়ে বের হয়ে গ্যাস জমা হয়েছিলো। দরজা বন্ধ ছিলো। সুইচ অন করতেই বিস্ফারিত হয়।
মগবাজারের বেংগলমিটের চিলার রুমে বাড়ির পুরনো বন্ধ গ্যাস লাইন থেকে গ্যাস লিকেজ হয়ে জমা হয়েছিলো। সেখানেও একই রকম ঘটনা।
সায়েন্স ল্যাবের শিরীন ম্যানশনের ৩ তলায়ও বিস্ফোরণের ঘটনায় মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে ।
গুলিস্তানের ঘটনায় তদন্ত চলছে। সেটির 'রহস্য'ও অচিরেই বের হবে।
এখন এসি 'বিস্ফোরণে' র কথায় আসি। এসিতেও দূর্ঘটনা হতে পারে। তবে তার রেট খুবই কম । নিম্নমানের এসি ব্যবহার করলে, কম্প্রেসারে ময়লা জমলে, সার্ভিসিং না করানো সহ টেকনিক্যাল ত্রুটির কারনে হতে পারে তবে সেটি এতো ভয়াবহ আকারের হয় না। যে স্কেলে হয় তার সাথে সাম্প্রতিক ঘটনার তুলনা অনেকটা এটম বোমার সাথে পটকার তুলনার মত হাস্যকর।
আরেকটি বিষয় হলো সেপটিক ট্যাংক ও পানির ট্যাংক পরিস্কারের সময় আমাদের দেশের মিস্ত্রি বা কর্মীরা গ্যাস আছে কিনা পরীক্ষার জন্য একটা দিয়াশলাই বা মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা করে। এমন করতে গিয়ে প্রায়ই বিস্ফোরণ এর ঘটনা দেখবেন পত্রিকায় আসে। মিরপুরে এক বাসার পানির ট্যাংক পরিস্কারের সময় এমন ঘটনা ঘটেছিলো। তার মানে হলো, এসব ট্যাংক এ গ্যাস থাকলেও ভেন্টিলেশনের অভাবে জমে থাকে এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকে একটি বিস্ফোরণের।
এখই সময় সচেতন হওয়ার। এখনি সময় সব 'দখিনের জানালা' খুলে দেয়ার।