04/08/2026
অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬ বাতিল সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় অসহনীয় করে তুলবে
বড় শিল্পপতিদের স্বার্থরক্ষার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার কর
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)-এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সমন্বয়ক মাসুদ রানা এক বিবৃতিতে অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬ বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়ে বলেন-“গতকাল সোমবার মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এর ফলে আজ থেকে পুনরায় দেশে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সেসব ওষুধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বহাল থাকবে। অর্থাৎ বর্তমানে দেশে অত্যাবশকীয় ওষুধ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে ৩২ বছর আগে তৈরি করা ১১৭টি ওষুধের তালিকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) বিবেচনায় ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ’ হলো সেই ওষুধগুলো- যা একটি দেশের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের অগ্রাধিকারমূলক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণ করে। যে কোন দেশের সরকার তার দেশের জনগণের স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি অনুযায়ী অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করে। এই ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দেয় এবং ওষুধ কোম্পানিগুলো এর বেশি দাম নির্ধারণ করতে পারে না।
১৯৯৪ সালের তালিকায় ডায়াবেটিসের মতো রোগের ওষুধকেও অত্যাবশকীয় ওষুধ হিসেবে ধরা হয়নি। হাইপ্রেশারের মাত্র দুইটি ওষুধ (যা খুব কম ব্যবহৃত হয়), কয়েকটি অ্যান্টিবায়োটিক, প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড, কিছু জরুরি টিকা ও কিছু প্রয়োজনীয় অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধ এই তালিকায় আছে। ৩২ বছর আগে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকও এখন পুরনো, রেজিস্ট্যান্সের কারণে বর্তমানে এইসকল অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সীমিত। এই ৩২ বছরে দেশের মানুষের রোগের ধরন পরিবর্তনসহ চিকিৎসার নানামুখী পরিবর্তন হয়েছে- কিন্তু অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকার পরিবর্তন হয়নি।
১৯৯৪ সালের পর বাংলাদেশে মোট ৩ বার (২০০৮, ২০১৬ ও সর্বশেষ ২০২৬ সাল) অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ বা নতুন করে প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে সরকারি আদেশের পরও আইনি জটিলতার কথা তুলে কিংবা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি করে কোনোটিই শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা হয়নি। ওষুধ কর্পোরেটদের চাপে আমরা ১৯৯৪ সালের তালিকা নিয়েই আছি এবং এর ফলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের দাম কোম্পানিগুলো যথেচ্ছা বাড়াচ্ছে। এমনকি বাজারে একই ওষুধের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্তও দামের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে বাজারে প্রায় ১,৩০০ থেকে ১,৪০০টি জেনেরিক ওষুধ রয়েছে। কিন্তু ১৯৯৪ সালের আদেশের কারণে সরকার মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যার সুযোগ নিয়ে বাকি ১২শ’এরও বেশি ওষুধের দাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের উপর বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি ২ বছর পরপর এই তালিকাটি হালনাগাদ করে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে প্রকাশিত ২৪তম মডেল তালিকায় মোট ৫২৩টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এরমধ্যে কোর লিস্টেই আছে ৪১৪টি ওষুধ। বাংলাদেশে ২০০৮ সালের সরকারি গেজেটে প্রকাশিত অত্যাবশকীয় ওষুধ তালিকায় ছিল ২০৯টি ওষুধ, ২০১৬ সালের ওষুধনীতিতে সেই তালিকা সম্প্রসারিত করে ২৮৫টি ওষুধের তালিকা করা হয়েছিল এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের জানুয়ারির সরকারি আদেশে এই তালিকা ছিল ২৯৫টি ওষুধের। কেবলমাত্র আইনসঙ্গত হয় নাই, এই যুক্তি দেখিয়ে সরকার ২০২৬ সালের এই সরকারি আদেশটি বাতিল করলেন এবং ১১৭টি মান্ধাতার আমলের ওষুধের তালিকা কার্যকর করলেন। জনগণের কাছে মুখরক্ষার জন্য তারা বললেন, আরও উন্নত একটি তালিকা তারা আইসম্মতভাবে প্রস্তুত করবেন।
বাংলাদেশের ওষুধখাতে বড় বড় শিল্পপতিদের বিনিয়োগ- যাদের টাকায় তারা দল পরিচালনা করেন, নির্বাচন পরিচালনা করেন, সরকারে আসেন। হেলথ কার্ড, বিনামূল্যে চিকিৎসা, সবার জন্য স্বাস্থ্য- এসব কথা তারা বলেন ভোট পাওয়ার জন্য। জনগণের জীবনের দায় তাদের উপর নেই, তাদের উপর আছে একেবারে নগ্নভাবে বৃহৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষার দায়। জনগণের দায় তাদের উপর থাকলে তারা বুঝতেন যে, ওষুধের দাম নিয়ে জনগণ কী পরিমাণ আর্থিক চাপে আছে।
মাত্র দুইমাস আগে ‘বিআইডিএস’ তাদের রিপোর্টে প্রকাশ করেছে- বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই রোগীকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পায় না। দরিদ্র মানুষ তাদের আয়ের ৩৫ শতাংশ চিকিৎসার জন্য খরচ করেন।
এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে, চিকিৎসা ব্যয় অসহনীয় করে তুলবে। আমরা অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।”
বার্তা প্রেরক—
সীমা দত্ত
০১৭১২৯৮১৪২২