22/03/2026
চেকের মামলায় নোটিশ জারি নিয়ে যুগান্তকারী রায়ঃ ৩৯ বিএলডি ও ৬৪ ডিএলআর-এর ব্যাখ্যা
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
ব্যাংকিং বা ব্যবসায়িক লেনদেনে 'চেক ডিজনার' বা এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলার প্রাণভোমরা হলো 'লিগ্যাল নোটিশ'। যদি লিগ্যাল নোটিশ জারিতে সামান্যতম ত্রুটি থাকে, তবে পুরো মামলার ভিত্তি ধসে যেতে পারে। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে বারবার উঠে এসেছে, নোটিশ জারি না হওয়া বা জারিতে অনিয়ম আসামিকে খালাস দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এম.এ লতিফ বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য মামলা যা ৩৯ বিএলডি (২০১৯) ২২২ (হাইকোর্ট বিভাগ) মামলার মূল ঘটনায় দেখা যায় এই মামলায় আসামি (দরখাস্তকারী) এর বিরুদ্ধে একটি চেক ডিজনারের অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগকারী দাবি করেন যে, চেকটি ব্যাংক থেকে ফেরত আসার পর তিনি আইন অনুযায়ী আসামিকে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন। অন্যদিকে, আসামি দাবি করেন যে তিনি কোনো নোটিশ গ্রহণ করেননি এবং অভিযোগকারী নোটিশ জারির কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ যেমন: একনলেজমেন্ট ডিউ বা এডি কার্ড আদালতে পেশ করতে পারেননি।
মূল প্রশ্নটি ছিল কেবল ডাকযোগে নোটিশ পাঠানোই কি ১৩৮ ধারার শর্তপূরণের জন্য যথেষ্ট, নাকি সেটি আসামির নিকট পৌঁছানো বা পৌঁছানোর চেষ্টার বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকলে তার সুবিধা আসামি পাবেন?
হাইকোর্ট বিভাগ মামলাটি পর্যালোচনাকালে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন। ১৩৮ ধারার (বি) উপধারা অনুযায়ী, চেক ডিজনার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে দেনাদারকে লিখিত নোটিশ প্রদান করা একটি আবশ্যিক পূর্বশর্ত। এই শর্ত পূরণ না হলে মামলার কোনো ভিত্তি থাকে না। আদালত বলেন, যদি নোটিশ জারির বিষয়ে কোনো যৌক্তিক সন্দেহ তৈরি হয় এবং রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে আসামি নোটিশটি পাওয়ার সুযোগ পাননি বা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাননি, তবে সেই সন্দেহের সুবিধা আসামি পাবেন। এক্ষেত্রে অভিযোগকারীকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি সঠিক ঠিকানায় নোটিশটি পাঠিয়েছিলেন। যদি পোস্টাল রসিদ বা জারিকারকের রিপোর্টে কোনো অসংগতি থাকে, তবে ধরে নেওয়া হবে যে নোটিশ যথাযথভাবে জারি হয়নি। এ বিষয়ে আদালত মন্তব্য করেন যে, কোনো ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ অর্থাৎ নোটিশের মাধ্যমে টাকা পরিশোধের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি ফৌজদারি জালে জড়ানো ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এর ফলে উচ্চ আদালত আসামির দ-াদেশ বাতিল করেন এবং তাকে মামলার দায় হতে খালাস প্রদান করেন।
মোঃ আজহার আলী বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য মামলা, ৬৪ ডিএলআর (২০১২) ২৫৫ মামলার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারা মতে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ পাঠালে একটি প্রাথমিক অনুমান তৈরি হয় যে নোটিশটি পৌঁছেছে। কিন্তু এটি একটি বা খ-নযোগ্য অনুমান। যদি আসামি প্রমাণ করতে পারেন যে পিয়নের রিপোর্ট ভুল ছিল বা ঠিকানা সঠিক থাকা সত্ত্বেও তিনি নোটিশ পাননি, তবে মামলার কার্যকারিতা থাকবে না। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নোটিশ জারির ত্রুটি কোনো সামান্য টেকনিক্যাল ভুল নয়; এটি একটি মৌলিক ভুল। যেহেতু ১৩৮ ধারা একটি বিশেষ আইন এবং এটি দ-মূলক, তাই এর শর্তাবলী কঠোরভাবে পালন করতে হয়। যদি বাদী প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন যে তিনি আইনসম্মতভাবে নোটিশ জারি করেছেন, তবে আসামি ফৌজদারি দায় থেকে মুক্তি পাবেন।
ধারা ২৭-এর শুরুতেই বলা আছে, জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট (১৮৯৭) পাস হওয়ার পর যেসব আইন তৈরি হয়েছে, কেবল সেই আইনগুলোর ক্ষেত্রেই ২৭ ধারার এই সুবিধা পাওয়া যাবে।
লিগ্যাল নোটিশ হলো এন.আই অ্যাক্টের মামলার প্রবেশদ্বার। এই দ্বারে ত্রুটি থাকলে ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত আসামিকে খালাস দিতে বাধ্য। আইনজীবীদের উচিত নোটিশ জারির সময় পোস্টাল রসিদ, এডি কার্ড এবং সঠিক ঠিকানার দিকে নজর রাখা। অন্যদিকে, আসামিপক্ষ যদি প্র্রমাণ করতে পারে যে নোটিশটি তাদের হাতে পৌঁছায়নি বা জারিকারক কোনো কারসাজি করেছে, তবে তারা খালাস পাওয়ার পূর্ণ দাবিদার।