13/01/2026
আন্দোলনের স্মৃতি থেকে ...
বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন নিয়ে নিজ ফেসবুক পোস্টে ডাঃ তৌফিক জোয়ার্দার এক স্মৃতিচারণ করেন। স্মৃতিচারণের মাঝে বিএনপি'র তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমান চেয়ারম্যান) তারেক রহমানের সততা ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল অবস্থান প্রস্ফুটিত হয়েছে।
নিম্নে পোস্টি দেয়া হলো —
“তারিখটা ৫ এপ্রিল ২০১৯। কুখ্যাত লাইলাতুল ইলেকশনে অংশগ্রহণের পর বিএনপি তখন স্বভাবতঃ বিপর্যস্ত ও হতঃবিহ্বল। আমরা কয়েকজন সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের কর্মকৌশল নিয়ে কাজ শুরু করি। তা প্রেজেন্ট করার জন্য Prof. Dr. Morshed Hasan Khan এবং বড় ভাই Dr-Shah Muhammad Aman Ullah-র উদ্যোগে লন্ডন যাই। ওই তারিখে লন্ডনের কিংস্টন লজ হোটেলে জনাব Tarique Rahman-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়।
কুখ্যাত সেই নির্বাচনের আগে থেকেই গোপনে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নানারকম কাজ শুরু করেছিলাম। আজ অনেকে একটা মাস বা একটা দিনকেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণমানুষের একমাত্র প্রতিরোধ হিসেবে মনে করে থাকেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই নানা ফ্রন্টে এবং নানা ফর্মে দেড় দশক ধরেই চলমান ছিল। আমরা জানতাম না ফ্যাসিবাদের পতন কখন, কিভাবে হবে; কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস ছিল একদিন না একদিন তা হবেই—এটা কেবল সময়ের ব্যাপার। কাজেই রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধের সলতেটা জালিয়ে রাখতে হবে যে কোনো মূল্যে।
সেই রেজিস্ট্যান্সের সবচেয়ে বড় অংশীদার ছিল Bangladesh Nationalist Party-BNP। তাই আমরা কোনো দলের সদস্য না হয়েও নিজ নিজ অবস্থান ও পেশাগত এক্সপার্টিজের জায়গা থেকে বিএনপিকে স্ট্র্যাটেজিক সাপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমরা বলতে, সেই প্রজেক্টে মূলতঃ কাজ করেছিলাম আমি, অর্থনীতিবিদ Zia Hassan ভাই এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্কুলের বড় ভাই Shafquat Rabbee Anik। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, আমি সেসময় কোনো দলের সাথে যুক্ত না থাকলেও বিএনপি এবং কিছু মধ্যবামপন্থী মোর্চার পক্ষে কিছু কাজ করেছিলাম, ফাইন্যান্সিয়াল ও নন-ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট যুগিয়েছিলাম কিছু কার্যক্রমে। ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট অবশ্য ডানপন্থী কিছু ব্যক্তি বা গ্রুপকেও দিয়েছিলাম সাধ্যমত, বিশেষ করে মোদির আগমন পরবর্তী ধরপাকড়ে হেফাযতে ইসলামের কর্মী সমর্থকরা যখন পর্যুদস্ত, তাদের জন্য। আরও ডিসক্লেইমার দেওয়া দরকার যে, যে সময়ের কথা বলছি সে সময় কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না হলেও আমি পরবর্তীতে Doctors Association of Bangladesh (DAB) এবং Ziaur Rahman Foundation-এর লাইফ মেম্বার হই। আমার সাথের বাকি দু’জনের রাজনৈতিক অ্যাফিলিয়েশনের কথা আমি জানিনা। ইন ফ্যাক্ট, এসব অ্যাফিলিয়েশেনের প্রশ্ন তখন মনেও আসতো না; আমাদের সবার উদ্দেশ্য ছিল এক—হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন।
Fatima Tuj Johra-র একটা পোস্ট ভাইরাল হয়েছে যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে জনাব তারেক রহমান বলেছেন, “এরকম মিথ্যা বলে মানুষকে বেশিদিন ঠকানো যায়না। সাময়িকভাবে তারা লাভ করতে পারে, কিন্তু আল্টিমেটলি সত্যকেই মানুষ গ্রহণ করবে”। সেই ২০১৯ সালেই জনাব তারেক রহমানের এই মনোভাবের প্রমাণ পেয়েছিলাম। যদিও যথেষ্ট দূরদৃষ্টি না থাকায় এবং বয়সে আরেকটু কাঁচা ও রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ হওয়ায় সে সময় তাঁর অবস্থান নিয়ে মনে উষ্মা জন্মেছিল—তা আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। সেই গল্পটা বরং বলি।
জনাব তারেক রহমান টানা প্রায় দুই ঘন্টা আমাদের প্রেজেন্টেশন দেখলেন, কথা শুনলেন এবং স্বভাবসূলভ অত্যন্ত ক্রিটিকাল সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। নিজের কোনো পদ-পদবি না থাকায়, সেসবের কোনো লোভ বা প্রয়োজন না থাকায় এবং সর্বোপরি সেসব যাচ্ঞা করার পরিস্থিতি না থাকায় তাঁর সাথে কোনো জড়তা ছাড়াই নানা তর্কে বিতর্কে সময়টা পার হয়। মুখের ওপর দুর্মুখের মতো নানা কথাও বলি যা তিনি প্রশ্রয়ের হাসি দিয়ে হজম করেছিলেন। এখন সেসব ভাবলে রীতিমতো বিব্রত বোধ করি, কিন্তু তিনি যে সত্যিই গণতান্ত্রিক মানসিকতার এক বিরল বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ, সেই প্রতীতিও তখনই জন্মে। আলোচনা—তর্ক বিতর্ক বলাই ভালো--আরও চলতো, কিন্তু জোহরের নামাযের সময় হয়ে যাওয়ায় বিনীতভাবে তিনি বিদায় নিয়েছিলেন।
আমরা তাঁকে দেশে ও দেশের বাইরে ইমপ্লিমেন্ট করার মতো নানা স্ট্র্যাটেজি দেই এবং আমরা কিভাবে সেখানে ভূমিকা রাখতে পারি তারও একটা আইডিয়া দেই। এর অনেকগুলো স্ট্র্যাটেজি ছিল সোশাল মিডিয়া, স্থানীয় মিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া নিয়ে। ’ন্যারেটিভ’ শব্দটা এখন বহু ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গেলেও সেসময় এটা মোটামুটি স্বল্পব্যবহৃত একটা অভিধা ছিল। এ বিষয়ে আমাদের পরামর্শ শুনে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, “এসব কাজ কি আওয়ামী লীগও করছে?” আমি বলেছিলাম, “জ্বি, করছে”। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, “তারা কি সত্যিই জনপ্রিয়?” তিনি কোথায় যাচ্ছেন তা তখনো বুঝতে না পেরে কিছুটা বিভ্রান্তির বোধ নিয়ে উত্তর দিয়েছিলাম, “না, তারা সত্যি সত্যি জনপ্রিয় নয়।” তিনি ফ্ল্যাট ফেইসে বললেন, “তাহলে আমরা কেন ওসব করতে যাব? মানুষকে মিথ্যা ন্যারেটিভের ফাঁদে ফেলে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতায় যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। মানুষ যখন জাগবে, আল্লাহ যখন চাইবেন, তখনই আমরা ক্ষমতায় যাব ইনশাল্লাহ।”
আগেই বলেছি, তাঁর কথায় সেদিন খুশি হতে পারিনি। কিন্তু তাঁর প্রত্যেকটা কথা নিউরোনে খোদাই হয়ে গিয়েছিল। আজ এতগুলো বছর পরে তাঁকে ডেলফির ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতো মনে হয়। আমার নিরাশ চেহারা দেখে মোরশেদ স্যার এবং আমান ভাই কৌতূক বোধ করেছিলেন; তাঁরা তো ভাইয়াকে আমার চেয়ে অনেক ভালো করে জানতেন। অনেকেই আজ তারেক রহমানের স্টেটম্যানশিপ নতুন নতুন দেখতে পেয়ে চমৎকৃত হচ্ছেন। অনেকে আবার সন্দেহময় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন, এগুলো লোক দেখানো নয়তো? আমার সৌভাগ্য যে তাঁর গণতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার ঝলক আমি আরও আগেই দেখেছি। সেটা যে লোক দেখানো ছিলনা তার প্রমাণ আমি পেয়েছি। কারণ, তা হলে তাঁর সেই অবস্থান এতগুলো বছর পরে আজও অটুট থাকতনা।”
#রাজনীতি #বিএনপি #তারেকরহমান