25/06/2026
কারবালা—ইসলামের ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত প্রান্তর, যেখানে একদিকে ছিল সত্য, ন্যায়, ঈমান ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র আহলুল বাইত; অন্যদিকে ছিল ক্ষমতার অহংকার, জুলুম ও নিষ্ঠুরতা।
একদিকে মাত্র বাহাত্তর জন। অন্যদিকে হাজারে হাজার সশস্ত্র সৈন্য—জনপ্রিয় ঐতিহ্যিক বর্ণনায় যার সংখ্যা বাইশ হাজার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়।
ইতিহাস কখনো সংখ্যাকে স্মরণ করে না; ইতিহাস স্মরণ করে কারা সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: “তোমরা আল্লাহর পথে যারা নিহত হয়েছে তাদের মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৫৪)
যাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “হুসাইন আমার অংশ এবং আমি হুসাইনের অংশ।” রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করেছিলেন: "হাসান ও হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) জান্নাতের যুবকদের দুই সর্দার"।
সেই ইমাম হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)—রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, তাঁর কলিজার টুকরা, তাঁর রক্তের উত্তরাধিকারী—তাঁকেই কারবালার উত্তপ্ত মরুভূমিতে পানি থেকে বঞ্চিত করা হলো। ফোরাত নদী চোখের সামনে প্রবাহিত হচ্ছে, অথচ নবী পরিবারের শিশুদের এক ফোঁটা পানিও দেওয়া হলো না।
ইতিহাস সাক্ষী, তিনি আহ্বান করেছিলেন—“আছে কি কেউ, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে? আছে কি কেউ, যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পরিবারের সম্মান রক্ষা করবে?”কিন্তু জবাবে উঠেছিল তলোয়ার।
যখন তাঁর ছয় মাসের শিশু পুত্র আলী আসগর (আবদুল্লাহ)-এর জন্য এক ফোঁটা পানির আবেদন করা হলো, তখন পানির পরিবর্তে উত্তর এলো একটি তীর, যা নিষ্পাপ শিশুটির গলাকে বিদীর্ণ করেছিল। মানবতার ইতিহাসে এর চেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য আর কতগুলো আছে?
একে একে শহীদ হলেন তাঁর সাথীরা। শহীদ হলেন তাঁর আপনজনেরা। অবশেষে তিনি নিজেও শাহাদাত বরণ করলেন। এরপর তাঁর পবিত্র দেহ থেকে মুবারক শির মোবারক বিচ্ছিন্ন করে ক্ষমতার দরবারে পাঠানো হলো।
এ কেবল একজন মানুষের শাহাদাত ছিল না। এ ছিল উম্মতের বিবেকের পরীক্ষা। এ ছিল ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তগুলোর একটি। এ ছিল সেই দিন, যেদিন ক্ষমতা ভেবেছিল সত্যকে হত্যা করা যায়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় শহীদের রক্তই ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষ্য হয়ে রইল।
আজও কেউ কেউ উম্মাহর ইতিহাসের এই কলঙ্কিত অধ্যায়কে আড়াল করতে চায়, কেউ আবার এর গুরুত্বকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সত্য কখনো ক্ষমতার অনুমতি নিয়ে দাঁড়ায় না। সত্য একাই দাঁড়ায়। ন্যায় একাই দাঁড়ায়। আর আল্লাহর দরবারে সত্যের মূল্য কখনো সংখ্যার দ্বারা নির্ধারিত হয় না। সত্যের পাল্লাই সর্বদা ভারী, আর ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সত্যের পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়।
কারবালা আমাদের শেখায়—সত্যের জন্য যদি বাহাত্তর জনও দাঁড়ায়, আর মিথ্যার পক্ষে যদি হাজারে হাজার মানুষও দাঁড়ায়, তবুও বিজয় সত্যেরই।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজও যখন কেউ কারবালার শোক, ইমাম হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাহাদাত কিংবা আহলুল বাইতের প্রতি ভালোবাসার কথা উচ্চারণ করেন, তখন কেউ কেউ অযথাই তাকে “শিয়াবাদ” কিংবা অন্য কোনো মতবাদের তকমা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ কারবালার বেদনা কোনো শিয়াবাদ, কিংবা কোনো “বাদ”-এর বিষয় নয়; এটি ইসলামের, মানবতার এবং বিবেকের বিষয়। এটি সেই রক্তের শোক, যে রক্তের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রক্তের সম্পর্ক ছিল; এটি সেই পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, যাদের ভালোবাসাকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতের জন্য শিক্ষা দিয়ে গেছেন। কারবালার প্রতি শ্রদ্ধা কোনো সম্প্রদায়ের একচেটিয়া সম্পদ নয়; এটি প্রতিটি ন্যায়পরায়ণ, বিবেকবান ও রাসূলপ্রেমী মুসলিমের হৃদয়ের স্পন্দন। আহলুল বাইতের প্রতি ভালোবাসা বিভেদের নয়, বরং উম্মাহর ঐক্য, ঈমান ও মানবিক বিবেকের পরিচয়।
আজ প্রশ্নটি আগের মতোই রয়ে গেছে—আপনি কি ইমাম হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ন্যায়, সত্য ও আত্মত্যাগের পাশে? নাকি ক্ষমতা, জুলুম ও ইতিহাসের কলঙ্কের পাশে?
কারবালা কোনো অতীত নয়। কারবালা প্রতিটি যুগে ফিরে আসে। প্রতিবার যখন সত্যকে নীরব করতে ক্ষমতা উঠে দাঁড়ায়, তখন প্রতিটি বিবেকবান মানুষের সামনে আবারও সেই একই প্রশ্ন উচ্চারিত হয়—আপনি কোন পাশে?