02/08/2026
সম্প্রতি একটি পডকাস্টে ‘ঢাকা পেপার্স’-এর সম্পাদক আরিফুজ্জামান তুহিন বলেছেন, “একটা ক্রসফায়ারের হিসেব দেখেন: ২০০৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত বার্কলি ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৬১% মানুষ বামপন্থী।” এর আগে নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান তার নিজস্ব ফেসবুক প্রোফাইলে একটি বিশ্লেষণে অনুরূপ দাবি করেছিলেন। তবে তিনি সেখানে ৬৩% উল্লেখ করেছিলেন। ধারণা করা যায়, সেই সংখ্যাটিকেই সূত্র ধরে আরিফুজ্জামান তুহিন ৬১%-এর হিসাব দিয়েছেন। তবে বাংলাফ্যাক্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, ক্রসফায়ারের শিকারদের রাজনৈতিক পরিচয়ের এ হারটি অসত্য। একই কারণে শেখ হাসিনার আমলে ক্রসফায়ারে নিহতদের বড় অংশটাই বামপন্থি–এই বয়ানও বিভ্রান্তিকর।
প্রথমত, বার্কলি ইউনিভার্সিটি এ ধরনের কোনো গবেষণা করে নি। তবে, নেত্র নিউজ ২০২৩ সালে “বডি কাউন্ট” নামে একটি প্রজেক্টে ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা নিহত ২,৫৭৯ জনের একটি তালিকা ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। প্রজেক্টটি সম্পন্ন করেন নাজমুল আহসান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায় মাস্টার্স করেছেন। প্রজেক্টটির সাথে বিশ্ববিদ্যালয়টির কয়েকজন যুক্ত থাকলেও তা বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনো গবেষণা বা প্রজেক্ট নয়।
নাজমুলের বিশ্লেষণটিতে দেখানো হয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়ভুক্ত ক্রসফয়ারে নিহতদের মাত্র ৩১ জন (১২.১%) বিএনপির। অথচ বিএনপির দাবি, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের ২২৭৬ জনকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে।
নাজমুল আহসান নেত্র নিউজের Body Count প্রজেক্টে ব্যবহৃত ডেটাসেটের ওপর ভিত্তি করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি বিশ্লেষণ গিটহাব ও ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন। বিশ্লেষণটি নেত্র নিউজের নয়, তাঁর নিজস্ব। নেত্র নিউজ ২,৫৭৯ জন নিহতের যে তালিকা দিয়েছিল, তার মধ্যে প্রায় ২,০০০টি ঘটনাকে ‘ক্রসফায়ার’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ২ হাজার জনের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া গেছে মাত্র ২৫৬ জনের। নাজমুলের বিশ্লেষণে এই ২৫৬ জনের মধ্যে ১৬৩ জন বা ৬৩% হলো সশস্ত্র বামপন্থী।
নাজমুল আহসান কেবল “রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া” ২৫৬ জনের ৬৩% কে উগ্রবাদী বামপন্থী বলেছেন। কিন্তু আরিফুজ্জামান তুহিন বলেছেন, ক্রসফায়ারে মোট নিহতদের ৬৩ শতাংশই বামপন্থী! অথচ মোটের (২০০০ জন) হিসেবে, ক্রসফায়ারে নিহতদের মাত্র ৮% সশস্ত্র বামপন্থী। উল্লেখ্য, নাজমুল আহসানের বিশ্লেষণে যে ১৬৩ জন বামপন্থী নিহতের তথ্য দেয়া আছে, তাদের সকলকেই “চরমপন্থী বাম” গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশে মূলধারার বা নিয়মতান্ত্রিক বামপন্থীদের একজনও এই তালিকায় নেই।
বিষয়টা এমন নয় যে, নেত্র নিউজের ডেটাসেট থেকে নেয়া ২৫৬ জনের বাইরে বাকি কারও কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। নেত্র নিউজের প্রজেক্টটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাই যেসব প্রতিবেদনে নিহতের রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ ছিল না, তারা মোট পরিসংখ্যানে থাকলেও নাজমুল আহসানের বিশ্লেষণের আওতায় আসেনি।
কেবল সংবাদমাধ্যমের খবরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ডেটাসেট ক্রসফায়ারে নিহতদের রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত করতে পারে না। অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় যেমন সংবাদে না আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি অনেক ক্রসফায়ারের ঘটনা হয়তো আদৌ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসেনি। চূড়ান্তভাবে নাজমুল আহসানের বিশ্লেষণ কিংবা আরিফুুজ্জামান তুহিনের বয়ান থেকে ক্রসফায়ারে নিহতদের বেশিরভাগ কোন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তি তা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা মেলে না।