31/07/2026
কনসোর্টিয়াম নিউজ:
ইউরেশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ একীভূত করছে যুক্তরাষ্ট্র - ৩০ জুলাই, ২০২৬
এম. কে. ভদ্রকুমার বলেছেন যে,
#ইরান এবং #ইউক্রেনের যুদ্ধগুলোকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কাস্পিয়ান সাগরের চারপাশে একটি নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
শুক্রবার।। যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে সংঘাতের সর্বশেষ পর্বের সমাপ্তি ঘোষণা করছিলেন, ঠিক তখনই পেন্টাগন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে নীরবে যুদ্ধক্ষেত্রকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত প্রসারিত করে। এই ঘটনাটি পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমে তেমন কোনো গুরুত্ব পায়নি।
কিন্তু সিজিটিএন —চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক—সম্ভবত এই আঁচ করে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোপনে কাস্পিয়ান অঞ্চলে তার যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে পারে, ২৫শে জুলাই রিপোর্ট করে।
ইরানি গণমাধ্যমে উদ্ধৃত গিলানের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার মতে, কাস্পিয়ান সাগর উপকূলবর্তী গিলান প্রদেশের জিবা কেনার এলাকায় বিপ্লবী গার্ড নৌবাহিনীর একটি সদর দপ্তরে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
ইরানি লেবার নিউজ এজেন্সির মতে, প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র বন্দর নগরী বান্দার আনজালিতে-ও আঘাত হেনেছে।
গিলান প্রদেশের পশ্চিমে আজারবাইজানের সীমান্ত রয়েছে, যার সাথে ট্রান্সককেশীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক আকর্ষণের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সম্পর্ক সমস্যাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই, ট্রান্স-ককেশিয়ায় মার্কিন এবং ন্যাটো এর প্রভাব বৃদ্ধির পর আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার সাথে রাশিয়ার সম্পর্কও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাকু এবং ইয়েরেভানে ট্রাম্পই এখন শহরের নতুন শেরিফ।। আর— তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ এরদোয়ান সহকারী শেরিফের ভূমিকা পালন করছেন।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এই বিষয়টি যে, আজারবাইজান তুরস্কের এক ঘনিষ্ঠ মিত্র, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঙ্কারা -
৯সমর্থিত আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সিরিয়ায় গোপনে ক্ষমতা দখলের কারণে মস্কোর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে।। ঐতিহাসিক ভাবে তুরস্ক ইরানের জন্য কখনও নির্ভরযোগ্য বন্ধু ছিল না। গত বছর ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়, তুরস্ক আজারবাইজান থেকে ইরানে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন বিমানকে তার আকাশসীমা খুলে দিয়েছিল।
আর— এই আজারবাই-জানই আবার ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান অভিযানিক ঘাঁটি।
ইউক্রেন সংঘাতের সুযোগ নিয়ে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং ন্যাটো রাশিয়ার মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলোর সীমান্তবর্তী ককেশাস ও কাস্পিয়ান অঞ্চলে ব্যাপক অনুপ্রবেশ করেছে এবং ইরানের নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, যখন দেশটি ইতিমধ্যেই মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের কারণে অস্তিত্বের সংকটের সম্মুখীন।
কাস্পিয়ান সাগর রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথ। তেহরানের জন্য বন্দর আনজালি বন্দর ঠিক তেমনই, যেমন কিয়েভের জন্য ওডেসা বন্দর, যেখান থেকে দেশটি পশ্চিমা অস্ত্রের জোগান পায়। প্রকৃতপক্ষে, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক রয়েছে।
শনিবার রাশিয়ার জলসীমায় কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইউক্রেনের হামলা—যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এ ধরনের প্রথম হামলা—কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কিয়েভ একটি ইরানি জাহাজে হামলার দায় স্বীকার করেছে,
যা ইঙ্গিত দেয় যে ইউরেশিয়ার অন্যতম স্থিতিশীল নিরাপত্তা অঞ্চলটি এখন ইউক্রেন সংঘাতের সরাসরি বিস্তারের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ক্রেমলিন বিষয়টি আমলে নিয়েছে এবং মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মঙ্গলবার তার দৈনিক ব্রিফিংয়ে মন্তব্য করেছেন যে, “কিয়েভ সরকারের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পরিধি প্রসারিত হচ্ছে।” এই ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি রহস্যজনকভাবে আরও বলেন যে, এই সবকিছু “আবারও একটি সফল ও পূর্ণাঙ্গ বিশেষ সামরিক অভিযানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।”
ইরানি জাহাজটির ওপর হামলাটি প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দূর থেকে চালানো হয়েছিল। মস্কো বারবার অভিযোগ করেছে যে, এত দূর থেকে এত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতার অনেক বাইরে এবং এটি কেবল পশ্চিমাদের সরাসরি অংশগ্রহণেই সম্ভব।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ২৪শে জুলাই আবারও এই বিষয়ে কথা বলেন: ভ্লাদিমির জেলেনস্কিকে —পশ্চিমাদের কাছ থেকে যে সমর্থন দেওয়া হয়, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর কারণ শুধু এই নয় যে আমেরিকানরা ইইউ-কে অস্ত্র বিক্রি করে, যা পরে ইউক্রেনে পাঠায়, বরং এর কারণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য ও পর্যবেক্ষণ সরবরাহ করে, স্টারলিংক সচল থাকে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ দক্ষতার প্রয়োজন হয় এ উন্নত প্রযুক্তিগুলো সেখানে আকস্মিকভাবে পৌঁছায় না। এটাই বাস্তবতা।
ইউক্রেনের হামলা নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটি -একটি ইরানি জাহাজে ইউক্রেনের হামলা দুটি যুদ্ধকে আর ও কাছে নিয়ে আসতে পারে— শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের শিরোনাম ছিল:
রাশিয়ায় ইরানের সরবরাহ লাইনে ইউক্রেনের আঘাতে কাস্পিয়ান সাগরে দুটি যুদ্ধ একত্রিত হচ্ছে।
আল জাজিরা আর—ও একটি নতুন মোড় দিয়ে জানায়, “ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ যখন একত্রিত হচ্ছে, তখন ইউক্রেনের জেলেনস্কি ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে চলেছেন।
বিবিসির একটি প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয় যে, এই ঘটনাটি —ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের মধ্যে প্রথম সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছে।তবে, নিবন্ধটির পরবর্তী অংশে যোগ করা হয়, “কিন্তু কিছু বিশেষজ্ঞ ইরানের সঙ্গে বিবাদে জড়ানোর কিয়েভের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।”
ট্রান্সককেশিয়ার ‘ট্রাম্প রুট:
ইরান সংঘাতের প্রভাব প্রাথমিকভাবে ইউক্রেনের জন্য নেতিবাচক বলে মনে হয়েছিল। এটি ট্রাম্পের আগে থেকেই টলমল করা মনোযোগকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।
তবে, ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সমর্থনে কোনো কমতি তো হয়নি, বরং রাশিয়ার ভূখণ্ডে গোপন অভিযান বাড়িয়ে দিয়ে মার্কিন সম্পৃক্ততা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও তীব্র হয়েছে। অবশ্য, এটা স্বীকার করতেই হবে যে, এই কৌশলগত সুবিধাগুলো শেষ পর্যন্ত কাজে নাও আসতে পারে, কারণ মস্কো+ও দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে ইউক্রেনের পুরো যুদ্ধক্ষেত্র জুড়েই হামলা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইরানি জাহাজের ওপর ইউক্রেনের হামলাটি ওয়াশিংটনের একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ হতে পারে। ইউক্রেন গিলান প্রদেশে মার্কিন বোমা বর্ষণের সাথে একই সময়ে এই পদক্ষেপ নেয়, যা এক ধরনের সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।
রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন যে, হামলার সময় জাহাজটি ভলগা নদীর মোহনা থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে ছিল।
যদি কাস্পিয়ানের সম্মিলিত নিরাপত্তা বিষয়ে মস্কো-নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক চুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে অঞ্চলের বাইরের সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই অঞ্চলকে কলুষিত করতে পারে, যা রাশিয়া ও ইরানের মূল স্বার্থকে প্রভাবিত করবে। তেহরান কাস্পিয়ান সাগরের এই ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন কৌশলগত ঘটনা হিসেবে নয়, বরং তার চারপাশের নিরাপত্তা পরিবেশে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রমাণ হিসেবে দেখছে।
গত আগস্টে হোয়াইট হাউসে— মার্কিন-আজারবাইজান-আর্মেনিয়া ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ট্রান্সককেশিয়ায় একটি প্রধান ট্রানজিট করিডোর তৈরি করবে এবং এর নাম হবে ‘ট্রাম্প রুট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’।
সহজ কথায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো কাস্পিয়ান অথবা মধ্য এশীয় অঞ্চলে রাশিয়ার আধিপত্যকে তীব্রভাবে চ্যালেঞ্জ করছে।
স্পষ্টতই।। কাস্পিয়ান সাগর আর সেই সংঘাতমুক্ত অঞ্চল নয়, যেমনটা একসময় মনে করা হতো। গত সপ্তাহান্তে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে, যা ইউরেশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে মৌলিকভাবে নতুন রূপ দিচ্ছে এবং সম্ভবত সংঘাতের একটি নতুন ভৌগোলিক রণাঙ্গনের সূচনা করছে।