01/08/2025
জু লা ই ঘো ষ ণা প ত্র
৫ আগস্ট বাংলাদেশে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়; কিন্তু ৮ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য একটি সেনাসমর্থিত উপদেষ্টা সরকার গঠন করা হয়। সংবিধানকে জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিশাবে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব ঘটানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায়, ছাত্র-জনতা-সিপাহীর মৈত্রীর ভিত্তিতে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল বর্তমানে তাকে বিভিন্নভাবে ক্রমাগত নস্যাৎ করার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাজির হওয়া জনগণকে বাদ দিয়ে লুটেরা-মাফিয়াশ্রেণীকে আবার ক্ষমতায় বসানোর জন্য তথাকথিত ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয় এবং তাদের বৈধতার দলিল আকারে “জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫” নামে যা সামনে আনা হচ্ছে– আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, তা প্রত্যাখ্যান করি। কারণ তা জনগণের অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে পুরনো ফ্যাসিস্ট শক্তির পুনর্বাসন এবং বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার একটা কৌশল বৈ আর কিছু নয়।
তাই যে ঘোষণা বাংলাদেশের জনগণকে দিতে দেওয়া হয়নি, অথচ যে ঘোষণা জনগণের রক্তে অর্জিত অধিকার, আমরা তা সকলের অবগতির জন্য পুনর্ব্যক্ত করছি।
জুলাই ঘোষণা ২০২৫
আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গণসার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গঠন করবার জন্য লড়াই করেছি, শহীদ হয়েছি এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছি। শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সংবিধান বাতিল ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা উৎখাত করে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আকারে গঠন করাই আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ। তাই সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব ঘটিয়ে– অর্থাৎ ফ্যাসিস্ট সংবিধানের অধীনে শপথ নিয়ে সেনাসমর্থিত উপদেষ্টা সরকার গঠনের পরিবর্তে আমরা অবিলম্বে একটা পূর্ণ গাঠনিক ক্ষমতাসম্পন্ন “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার” গঠন করার আহ্বান জানাচ্ছি।
আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, তথাকথিত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের (state sovereignty) নামে জনগণের সকল মানবিক ও নাগরিক অধিকার হরণ এবং চরম গণবিরোধী আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র অবিলম্বে বন্ধ করবার জোর দাবি জানাচ্ছি।
আমরা, বাংলাদেশের জনগণ সংসদীয় সার্বভৌমত্বের (parliamentary sovereignty) নামে সংসদকে লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণীর লুটপাটের দরবারে পর্যবসিত করবার সকল ষড়যন্ত্র অবিলম্বে বন্ধ করবার দাবি জানাচ্ছি।
বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে আমরা ঘোষণা করছি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একমাত্র ও প্রধান কর্তব্য হচ্ছে– গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠন।
অতএব, আমরা, বাংলাদেশের জনগণ পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দাবি জানাই; অবিলম্বে গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের লক্ষ্যে গণপরিষদ (Constituent Assembly) নির্বাচন এবং গণপরিষদ দ্বারা একটি খসড়া গঠনতন্ত্র প্রণয়নে ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করবার জোর দাবি জানাচ্ছি। খসড়া গঠনতন্ত্র গণভোটের দ্বারা জনগণের কাছ থেকে অনুমোদনের মধ্য দিয়ে গৃহীত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হবে, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাজির হওয়া জনগণের অলিখিত অভিপ্রায়কে লিখিত গঠনতন্ত্রের রূপ দেওয়া এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংগঠিত সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার ও আহত-পঙ্গুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম কাজ হবে সত্য নির্ণয় ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা কমিশন (Truth & Justice Commission) গঠন করা। সমাজের ক্ষত ও দ্বন্দ্ব-বিরোধ মীমাংসার এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়।
আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করছি যে, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাজির হওয়া জনগণের গঠনতন্ত্রের ভিত্তি হবে–
১। রাষ্ট্র এমন কোনো আইন বা নীতি প্রণয়ন করতে পারবে না যা ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ বা হরণ করে;
২। রাষ্ট্র এমন কোনো আইন বা নীতি প্রণয়ন করতে পারবে না যা প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ ও বাংলাদেশের জনগণের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐক্য নষ্ট করে এবং
৩। রাষ্ট্র এমন কোনো আইন বা নীতি প্রণয়ন করতে পারবে না যা জনগণের জীবন ও জীবিকার ক্ষতি কিংবা ধ্বংস করে।
পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর ফরমানের ভিত্তিতে সরকার ও রাষ্ট্র চলবে। একটা নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং জনগণ কর্তৃক অনুমোদিত হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান আইনই বহাল থাকবে। তবে যেসব আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেসব আইন আপনা আপনি বাতিল হয়ে যাবে। নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং তার ভিত্তিতে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠিত হবার পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুন গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। নির্বাচিত নতুন সরকারের শপথ নেবার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিলুপ্ত হবে।
আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, গণভ্যুত্থানের পক্ষের সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য এক সঙ্গে কাজ করবার আহ্বান জানাই।