08/09/2026
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞা ছিলেন এক পরিচিত নাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, উপাচার্যের দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ পদ—দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি রেখে গেছেন নানা পরিচয়।
কিন্তু তাঁর ব্যক্তিজীবনের গল্পটি ছিল একেবারেই আলাদা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন অবিবাহিত। তাঁর এই একাকী জীবনের পেছনে একটি অপূর্ণ প্রেমের গল্পের কথাও পাওয়া যায় বিভিন্ন জীবনীমূলক বর্ণনায়।
১৯৩৫ সালের দিকে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের মুর্শিদাবাদে জন্ম মনিরুজ্জামান মিঞার। পরে তাঁর পরিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে বসতি স্থাপন করে। উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ফ্রান্সে। প্রায় পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর একাডেমিক ও প্রশাসনিক পথচলা দীর্ঘ। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভাগীয় চেয়ারম্যান, ডিন, সিনেট ও সিন্ডিকেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। ১৯৯২ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়েও তাঁর কর্মপরিসর ছিল বিস্তৃত। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে সেনেগালে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান হন। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটির সঙ্গে তাঁর নামেই ‘মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষা কমিশন’ নামটি পরিচিত হয়ে ওঠে। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি পান একুশে পদক।
এতসব পরিচয়ের আড়ালে মনিরুজ্জামান মিঞার ব্যক্তিজীবন ছিল অনেক বেশি নিঃসঙ্গ। তিনি কখনো বিয়ে করেননি। ২০১৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁকে ‘চিরকুমার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
কেন তিনি সারা জীবন অবিবাহিত থেকে গেলেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁর জীবনের একটি প্রেমের গল্পের কথা উঠে আসে। তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত একটি জীবনীমূলক বর্ণনা অনুযায়ী, ছাত্রজীবনে তিনি এক তরুণীর প্রেমে পড়েছিলেন। সম্পর্কটি ছিল গভীর। কিন্তু কোনো এক ভুল বোঝাবুঝি ও দুঃখজনক পরিণতিতে সেই সম্পর্ক আর পূর্ণতা পায়নি। বর্ণনাটি অনুযায়ী, ওই তরুণী ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এরপর মনিরুজ্জামান মিঞা আর বিয়ে করেননি।
তবে এই প্রেমের গল্পটির স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রাথমিক সূত্র পাওয়া যায় না। ফলে এটিকে তাঁর জীবনের নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং তাঁকে নিয়ে প্রচলিত জীবনীমূলক বর্ণনা হিসেবেই উপস্থাপন করা বেশি যুক্তিসংগত। তাঁর আজীবন অবিবাহিত থাকার বিষয়টি অবশ্য একাধিক সূত্রে প্রতিষ্ঠিত।
এই গল্পের সঙ্গে তাঁর বিড়ালপ্রেমের কথাও বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনেও তাঁর অনেক পোষা বিড়াল ছিল। একটি জীবনীমূলক বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে, হারিয়ে যাওয়া সেই প্রিয় মানুষের স্মৃতির সঙ্গে এক ধরনের আবেগগত সম্পর্ক থেকেই তিনি বিড়াল পুষতেন।
গল্পটির প্রতিটি অংশের সত্যতা যাচাই করা কঠিন হলেও এর মধ্যে একজন সফল মানুষের ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতার একটি মানবিক ছবি ফুটে ওঠে। একদিকে তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও প্রশাসক; অন্যদিকে ব্যক্তিজীবনে বয়ে বেড়িয়েছেন একাকিত্ব।
এক জীবনে তাঁর পরিচয়ের সংখ্যা কম নয়—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপাচার্য, কূটনীতিক, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার এবং শিক্ষা নীতি প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য পেয়েছেন একুশে পদকও।
২০১৬ সালের ১৩ জুন ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল প্রায় ৮১ বছর। মনিরুজ্জামান মিঞার জীবন তাই শুধু একজন শিক্ষাবিদ কিংবা প্রশাসকের সাফল্যের গল্প নয়। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদে পৌঁছে যাওয়ার গল্প, রাষ্ট্রীয় নানা দায়িত্ব পালনের গল্প এবং ব্যক্তিগত জীবনে এক অপূর্ণতার সঙ্গে দীর্ঘ পথচলার গল্প।
সব অর্জনের পরও মানুষের জীবনে কিছু গল্প থেকে যায়, যেগুলোর কোনো পরিণতি হয় না। মনিরুজ্জামান মিঞার জীবনের সেই নীরব অধ্যায়টিও হয়তো তেমনই—একটি প্রেম, যা পূর্ণতা পায়নি; কিন্তু যার স্মৃতি তাঁর দীর্ঘ একাকী জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার গল্প আজও বলা হয়।
#পাবলিকিয়ান