16/08/2026
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের এই ফটোকার্ড শেয়ার করে যারা বিদ্যুৎ ঘাটতি ও রাস্তার নৈরাজ্য বিষয়ে অটো রিক্সাকে দায়ী করছেন তারা আসল সত্য জানে কী?
মধ্যবিত্তের ক্ষোভের জায়গাটা বুঝতে পারা কঠিন নয়, কিন্তু সেই ক্ষোভের তীরটি যখন ব্যবস্থার মূল অপরাধীদের বদলে একদম তলানির প্রান্তিক মানুষের দিকে তাক করা হয়, তখন তা মূল সমস্যাকে আড়াল করে রাষ্ট্রীয় সিন্ডিকেটের দুর্নীতিকেই পার পাইয়ে দেয়। এই যুক্তির ভেতরের অসারতা এবং রাষ্ট্রের মৌলিক ব্যর্থতাগুলো বোঝা জরুরি।
বিদ্যুৎ চুরির আসল খলনায়ক কে?
অটোচালক রাতে লাইটপোস্টে গিয়ে সরাসরি তার লাগিয়ে বিদ্যুৎ চুরি করে না। চুরিটা হয় অবৈধ চার্জিং গ্যারেজগুলোতে। এই গ্যারেজগুলো চলে বিদ্যুৎ বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, বিদ্যুৎ বোর্ডের অসাধু কর্মচারী, স্থানীয় রাজনৈতিক ক্যাডার এবং পুলিশের ত্রিপক্ষীয় সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ মদদে। চালক কিন্তু প্রতিদিন তার কষ্টার্জিত টাকা থেকে গ্যারেজ মালিককে চার্জের নির্দিষ্ট ভাড়াই দেয়। রাষ্ট্র যখন নিজের বিদ্যুৎ খাতের সীমাহীন দুর্নীতি, অপচয় এবং 'ক্যাপাসিটি চার্জ'-এর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটের হিসাব মেলাতে পারে না, তখন দায় চালকদের ওপর চাপিয়ে আসল চোরদের আড়াল করা হয়।
"বিনা পরিশ্রম" এবং ভ্যাট (VAT)-এর বাস্তবতা
কড়া রোদে বা ঝড়ে দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা জ্যামের মধ্যে অমানুষিক কায়িক শ্রম দিয়ে টিকে থাকাকে "বিনা পরিশ্রম" বলা চরম বাস্তবতা বিবর্জিত। আর ট্যাক্সের হিসাব করলে—বাংলাদেশে রাজস্বের সিংহভাগ আসে পরোক্ষ কর (VAT) থেকে। একজন অটোচালক যখন চাল, ডাল, তেল বা ওষুধ কেনেন, তিনিও সমান হারে ভ্যাট দেন। কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া বড় বড় কর্পোরেট ও ঋণখেলাপিদের পেছনে রাষ্ট্র ছোটায় না, অথচ পরোক্ষ কর দেওয়া প্রান্তিক চালকের গায়ে 'অনুদানের ওপর বেঁচে থাকা পরজীবী'র তকমা এঁটে দেয়।
গণপরিবহনের ধস ও রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতা
রাস্তায় আজ ৬০ লাখ অটোরিকশা কেন? কারণ রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের জন্য একটি সাশ্রয়ী, সুশৃঙ্খল ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। শহরের রাস্তায় প্রাইভেট কার ৭০% জায়গা দখল করে মাত্র ১০% যাত্রী পরিবহন করে। পর্যাপ্ত বাস না থাকায় এবং যানজটে নগর স্থবির হয়ে পড়ায় অটোরিকশা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের চলাচলের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। কর্মসংস্থান তৈরিতে রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতাই লাখ লাখ মানুষকে বাধ্য করেছে আত্মকর্মসংস্থান হিসেবে এটি বেছে নিতে।
লাইসেন্সিং ও নীতিহীনতার খেলা
রাষ্ট্র চাইলে এই অটোরিকশাগুলোকে নির্দিষ্ট কাঠামোর অধীনে এনে, সাশ্রয়ী দামে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট বানিয়ে, চালকদের সঠিক ড্রাফটিং ও ট্রাফিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারত। কিন্তু রাষ্ট্র তা করেনি। কারণ ব্যবস্থাটা 'অবৈধ' থাকলে হাজার হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও ঘুষের বাজার চালু রাখা যায়, যা ওপরতলা থেকে নিচতলা পর্যন্ত ভাগ-বাটোয়ারা হয়।
গাড়িতে স্ক্র্যাচ লাগলে ক্ষতি হওয়াটা কষ্টের, কিন্তু সেই ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে পুরো একটা অর্থনৈতিক শ্রেণিকে অপরাধী বানানো রাষ্ট্রের কাঠামোগত অপরাধকে ঢাকা দেওয়ার শামিল। অটোচালকরা এই অকার্যকর ব্যবস্থার সৃষ্টি, তারা এই ব্যবস্থার জনক নয়। সমস্যা চালক নয়—সমস্যা হলো একটি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র, যা না পেরেছে বিদ্যুৎ চুরি থামাতে, না পেরেছে সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা দিতে।