23/04/2026
এক অদ্ভুত রাজ্যের গল্প
দূর মহাশূন্যের এক প্রান্তে ছিল এক বিস্মৃত রাজ্য নাম - নিওরান। এই রাজ্যের প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি স্পন্দনে দিন-রাতের চেয়েও বেশি শক্তিশালী ছিল স্মৃতি আর প্রতিশ্রুতির অদৃশ্য বাঁধন। বহু যুগ আগে, এক অসামান্য শক্তিধর জাদুকর, নিজেরই এক গভীর ইচ্ছাশক্তির বশবর্তী হয়ে, এক প্রাচীন পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে এক অলঙ্ঘনীয় শপথ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শপথ ছিল, তিনি আর কখনো শক্তির খেলায় প্রত্যাবর্তন করবেন না।
সেই শপথ, যেন মহাজাগতিক এক স্বাক্ষর, আগুনের অক্ষরে খোদাই হয়েছিল নিওরানের আকাশে। প্রতিটি চোখ তা দেখেছিল, প্রতিটি হৃদয় তা বিশ্বাস করেছিল। তারপর, তিনি হারিয়ে গেলেন—নক্ষত্রের ওপারে।
সতেরোটি নক্ষত্রবর্ষ অতিক্রান্ত হলো। নিওরান তখন এক ভয়ানক ও বিধ্বংসী জাদুকরের হাতে। নিওরানের সকল কিছু তার পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে লুটতরাজ করতে শুরু করলো , নিওরান পরিণত হলো এক ভয়ানক মৃত্যুপুরীতে। কিন্তু পুরনো রীতিনীতি, জীর্ণ শৃঙ্খল ভাঙতে শুরু করল নতুন প্রজন্মের অদম্য প্রাণশক্তি। তারা লড়াই করল অদৃশ্য শেকলের বিরুদ্ধে, অচেনা এক শক্তির বিরুদ্ধে, যা তাদের অস্তিত্বকে গ্রাস করতে চাইছিল। এই অসম লড়াইয়ে অনেকে হারিয়ে গেল কালের গর্ভে। কেউ রেখে গেল অমর নাম, কেউ শুধু এক ম্লান স্মৃতিচিহ্ন। তবুও, তাদের হৃদয়ের গভীরে জ্বলে ওঠা প্রতিবাদের আগুন নিভে যায়নি, বরং তা আরও প্রদীপ্ত হয়ে উঠল এবং সেই ফ্যাসিস্ট জাদুকরকে পালাতে বাধ্য করলো।
ঠিক তখনই—তিনি ফিরে এলেন। যে শপথ একদিন আগুনের অক্ষরে লেখা হয়েছিল, তা যেন হঠাৎ করেই মহাজাগতিক বাতাসে মিলিয়ে গেল। জাদুকর এবার ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল শান্তির প্রতিধ্বনি, তাঁর চোখে ছিল এক নতুন প্রতিশ্রুতির দ্যুতি, আর তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল এক অলৌকিক আলো। মানুষ আবার তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে শুরু করল, যেন এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখল নিওরান। কিন্তু সময়, সে তো কোনো সত্যকে চিরকাল লুকিয়ে রাখতে পারে না। নিওরানের আকাশে এক অদ্ভুত ছায়া ধীরে ধীরে গাঢ় হতে লাগল। তাদের কেউ চোখে দেখত না, কিন্তু তাদের উপস্থিতি সবাই অনুভব করত। তাদের নাম দেওয়া হলো ‘নীরব নিয়ন্ত্রক’। কেউ বলত, তারা দূর নক্ষত্রের বাসিন্দা, অচেনা কোনো জগৎ থেকে এসেছে। আবার কেউ ফিসফিস করে বলত, তারা আসলে কখনো যায়নি—তারা সবসময়ই ছিল, শুধু অদৃশ্য আবরণে ঢাকা ছিল।
যে তরুণরা একসময় মুক্তির জন্য লড়াই করেছিল, তাদের কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসতে লাগল। যে প্রতিশ্রুতি নিওরানের মানুষকে একতার বন্ধনে বেঁধেছিল, তা এখন ‘অপ্রয়োজনীয় শব্দ’ বলে বাতিল হয়ে গেল। আর যাদের একসময় অন্ধকারের প্রতীক বলা হতো, তারা ফিরে এল নতুন মুখে, নতুন নামে, কিন্তু তাদের পুরনো ছায়া যেন আরও দীর্ঘ হয়ে নিওরানের উপর চেপে বসল।
নিওরানের জ্ঞানদুর্গগুলো—যেখানে একসময় জ্ঞানের আলো ঝলমল করত, নতুন নতুন প্রশ্ন জন্ম নিত, সেখানে এখন আবার অস্থিরতা, সংঘর্ষ আর ভয়ের প্রতিধ্বনি। প্রতিটি কোণায় যেন এক অজানা আশঙ্কার সুর বাজছে।
দূরে সেই ভাসমান শহর তখনও জ্বলছে অপরিবর্তিত, নির্লিপ্ত, যেন নিওরানের সমস্ত ভুলভ্রান্তির সাক্ষী। আর নিচে নিওরান আবার নিজের গল্প লিখছে, নতুন করে, কিন্তু একই ভুলে।
“কিছু গল্পে খলনায়ক বদলায়… কিন্তু গল্পটা বদলায় না।”