13/08/2026
লেখাটি আবেগ, শ্রদ্ধা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও গভীর করে মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণলেখা/ফিচার হিসেবে পরিমার্জন করলে এমন হতে পারে—
Writing
কিংবদন্তি সাংবাদিক ও জননেতা আনোয়ার জাহিদের মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা
মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা
কিংবদন্তি সাংবাদিক, বিশিষ্ট জননেতা, সাবেক মন্ত্রী এবং গণমানুষের কণ্ঠস্বর—আমার রাজনীতি ও সাংবাদিকতার শিক্ষক, পথপ্রদর্শক আনোয়ার জাহিদের মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছি।
আজ তিনি আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর কর্ম, আদর্শ, চিন্তা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংবাদিকতার সাহস এবং মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা আজও আমাদের পথ দেখায়। সময়ের ব্যবধান যতই দীর্ঘ হোক, কিছু মানুষকে কখনো বিস্মৃত হওয়া যায় না। আনোয়ার জাহিদ তেমনই একজন বিরল ব্যক্তিত্ব।
আমার রাজনীতি ও সাংবাদিকতার শিক্ষক
আনোয়ার জাহিদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক সহকর্মী কিংবা সাংবাদিকতার অঙ্গনের একজন পরিচিত মানুষের সম্পর্ক ছিল না। তিনি ছিলেন আমার রাজনীতি ও সাংবাদিকতার শিক্ষক, অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক।
তাঁর কাছ থেকে আমি শিখেছি কীভাবে মানুষের কথা বলতে হয়, কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হয় এবং কীভাবে রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে মানুষের কল্যাণের একটি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হয়।
তিনি বুঝিয়েছেন—সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ লেখা নয়; সাংবাদিকতার সঙ্গে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, সত্যের প্রতি আনুগত্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
রাজনীতিও তাঁর কাছে ছিল কেবল পদ-পদবির বিষয় নয়। মানুষের অধিকার, জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখাই ছিল রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য।
সাংবাদিকতায় এক উজ্জ্বল অধ্যায়
আনোয়ার জাহিদ ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক, যিনি সাংবাদিকতাকে জীবনের একটি মহান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁর লেখনীতে ছিল সাহস, বক্তব্যে ছিল দৃঢ়তা এবং চিন্তায় ছিল সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করবে। তাই অন্যায়, অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষেত্রে তিনি কখনোই আপসের রাজনীতি করেননি।
সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, অধিকার-বঞ্চনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নানা সংকট তাঁর চিন্তা ও কর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—একজন সাংবাদিকের কলম কেবল খবর প্রকাশ করবে না; মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে।
জননেতা হিসেবে মানুষের পাশে
সাংবাদিকতার পাশাপাশি জনজীবনেও আনোয়ার জাহিদ তাঁর নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
তিনি ছিলেন গণমানুষের রাজনীতিতে বিশ্বাসী একজন জননেতা। মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আন্তরিক ও হৃদয়গ্রাহী। সাধারণ মানুষের কথা শোনা, তাঁদের সমস্যা বোঝা এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে সেই সমস্যাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।
জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কই একজন প্রকৃত জননেতার সবচেয়ে বড় শক্তি। আনোয়ার জাহিদের মধ্যে সেই শক্তি ছিল।
তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল।
জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শক্তির ঐক্যে ভূমিকা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তিকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের ধারায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও আনোয়ার জাহিদের ভূমিকা স্মরণযোগ্য।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ঐক্য প্রয়োজন।
তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—নিজস্ব আদর্শে দৃঢ় থাকা, কিন্তু বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের পথ খোলা রাখা।
এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তাঁকে একজন দূরদর্শী রাজনীতিক হিসেবে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছিল।
একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়
আনোয়ার জাহিদের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—তিনি মানুষের মানুষ ছিলেন।
পদ, ক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারতেন। তাঁর কাছে মানুষ ছিল রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র ও রাজনীতির সমস্ত কর্মকাণ্ডের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ।
এই মানবিক দর্শনই তাঁর সাংবাদিকতা ও রাজনীতিকে এক সুতোয় গেঁথেছিল।
আমার জীবনে তাঁর প্রভাব
আমার ব্যক্তিগত জীবনে আনোয়ার জাহিদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর।
আমি যখন সাংবাদিকতা ও রাজনীতির পথচলায় নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি, তখন তাঁর সান্নিধ্য আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তাঁর কথাবার্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, সংবাদ ও সমাজ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
তিনি শুধু কথা বলে শিক্ষা দিতেন না; তাঁর জীবন ও কর্মই ছিল একটি জীবন্ত পাঠশালা।
তাঁর কাছ থেকে আমি উপলব্ধি করেছি—একজন মানুষকে বড় করে তাঁর পদ নয়, তাঁর আদর্শ, সততা, সাহস এবং মানুষের জন্য তাঁর অবদান।
আজ আমি যখন সাংবাদিকতা ও রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করি, তখন বহু মুহূর্তে তাঁর শিক্ষা ও উপদেশ মনে পড়ে। মনে হয়, তিনি যেন দূর থেকে এখনও বলে যাচ্ছেন—মানুষের পক্ষে থাকো, সত্যের পক্ষে থাকো এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস করো না।
তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি
আনোয়ার জাহিদের চলে যাওয়া শুধু তাঁর পরিবার কিংবা ঘনিষ্ঠজনদের জন্য নয়; সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও দেশের গণমানুষের জন্যও ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক, প্রাজ্ঞ রাজনীতিক ও মানুষের কাছের নেতা একসঙ্গে হারানো সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
তাঁর অনুপস্থিতি আমরা প্রতিনিয়ত অনুভব করি। বিশেষ করে যখন সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতে সত্য, ন্যায়, মূল্যবোধ ও জনস্বার্থের প্রশ্ন সামনে আসে, তখন তাঁর মতো মানুষের প্রয়োজন আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়।
মৃত্যুবার্ষিকী হোক আদর্শের পুনর্জাগরণের দিন
মৃত্যুবার্ষিকী শুধু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর দিন নয়। এটি আত্মসমালোচনা ও অঙ্গীকারেরও দিন।
আনোয়ার জাহিদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তখনই নিবেদন করা সম্ভব, যখন আমরা তাঁর আদর্শকে নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারব।
সত্যের পক্ষে কথা বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, মানুষের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসা, সাংবাদিকতার নৈতিকতা বজায় রাখা এবং রাজনীতিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা—এসবই হতে পারে তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।
নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ সময় বদলালেও সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও মানুষের অধিকার—এই মূল্যবোধগুলোর প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না।
স্মৃতিতে আপনি অমর
মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়, কিন্তু তাঁর কর্ম থেকে যায়। তাঁর আদর্শ থেকে যায়। তাঁর সৃষ্টি ও অবদান থেকে যায়। মানুষের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকেন।
আনোয়ার জাহিদও তেমনই একজন মানুষ।
তাঁর চলে যাওয়ার বহু বছর পরও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা তাঁকে স্মরণ করেন, সাংবাদিকতার মানুষ তাঁকে স্মরণ করেন, আর তাঁর মতো একজন অভিভাবক ও শিক্ষককে যারা কাছ থেকে পেয়েছেন, তারা তাঁকে স্মরণ করেন গভীর ভালোবাসায়।
আমার কাছে তিনি শুধু অতীতের একজন রাজনৈতিক নেতা বা সাংবাদিক নন; তিনি আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম, একজন শিক্ষক, একজন অভিভাবক এবং একজন অনুপ্রেরণার উৎস।
শেষ শ্রদ্ধা
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সেই মহান মানুষটিকে, যিনি তাঁর কর্ম দিয়ে একটি প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছেন।
শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি তাঁর সাংবাদিকতার সাহসকে।
শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে।
শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে।
শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি তাঁর শিক্ষা ও আদর্শকে।
কিংবদন্তি সাংবাদিক ও জননেতা আনোয়ার জাহিদ, আপনার শারীরিক অনুপস্থিতি আমাদের হৃদয়ে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। কিন্তু আপনার কর্ম, আদর্শ, শিক্ষা ও স্মৃতি আমাদের মাঝে চিরজাগরুক হয়ে থাকবে।
মহান আল্লাহ আপনার জীবনের সকল নেক আমল কবুল করুন, আপনার ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
আপনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, অশেষ ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।
আপনি নেই—কিন্তু আপনার আদর্শ আছে।
আপনি নেই—কিন্তু আপনার শিক্ষা আছে।
আপনি নেই—কিন্তু আপনার কর্ম আমাদের মাঝে বেঁচে আছে।
কিংবদন্তি সাংবাদিক ও জননেতা আনোয়ার জাহিদ—আপনার স্মৃতি ও আদর্শ আমাদের পথচলার অনন্ত প্রেরণা হয়ে থাকুক।
বিনম্র শ্রদ্ধা ও দোয়া।