12/08/2026
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মিছিল-সমাবেশ বাদে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর অসামান্য অবদানের একাংশ নিম্নে তুলে ধরা হলো—
১. জুলাইয়ে ইসলামী আন্দোলনের তালিকাভুক্ত দলীয় শহীদ ২২জন, এই ২২জন দেশের নানান প্রান্তে নানান সময়ে দলীয় দায়িত্বে ছিলেন।
সমর্থকের কথা বলা হয়নি—দায়িত্বশীলের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র দায়িত্বশীল শহীদ হয়েছেন ২২জন, সমর্থকদের তালিকা করলে তা নিশ্চয়ই শততে গিয়ে দাঁড়াতো। প্রশ্ন আসতে পারে—তাহলে কেন তা করা হলো না? উত্তরটা সহজ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জুলাইকে ব্যবহার করে রাজনীতি করতে চায়নি, তাই শহীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সাধারণ সমর্থকদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়নি, করা হয়েছে জীবদ্দশায় কোনো সময়ে দায়িত্বপালন করেছে এমন শাহাদাত বরণ করা নেতাদের নাম।
উল্লেখ্য যে, এই তালিকাটা প্রথম দিকে প্রস্তুতকৃত, ফলে এছাড়াও এমন অনেক দলীয় শহীদ রয়েছে, যাদের নাম এই তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি। পরবর্তী আপডেট তালিকা প্রকাশ করা হবে।
২. শহীদ তালিকার ১০ ও ১১নং ক্রমের দিকে বিশেষ নজর দিন। শহীদ মুগ্ধ ও তাহমিদের নাম রয়েছে। শহীদ তাহমিদ একান্তই ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের শহীদ, তার পূরণ করা সদস্য ফরম সহ সংগঠনে সময় দেওয়ার নানান ছবি সংরক্ষিত আছে।
জীবনের মায়া ত্যাগ করে পানি বিতরণ করতে থাকা মুগ্ধ পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কর্মজীবনে চলে গিয়েছিলেন, অর্থাৎ ছাত্র আন্দোলন করার বয়স মানুষটার ছিলো না। তবে তার বাবার সাক্ষ্যদান এমন যে—শহীদ মুগ্ধ ছাত্র জামানায় ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যপদ পূরণ করে সদস্য হয়েছিলেন। ছেলে সম্পর্কে বাবার এমন সাক্ষ্যদান সকল তর্ককে ধুয়েমুছে ফেলে, অর্থাৎ বাবার সাক্ষ্যদানের মধ্য দিয়ে শহীদ মুগ্ধও ছাত্র আন্দোলনের নিজস্ব শহীদ হিসাবে বিবেচিত হয়।
এখানে সুন্দর একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়—শহীদ মুগ্ধ ও তাহমিদ দেশ বিখ্যাত শহীদদের অন্যতম। জুলাইকে পুঁজি করে রাজনীতি করার ক্ষেত্রে এই দুজনকে ব্যবহার করতে পারাটা যে কারো জন্যই সৌভাগ্য বয়ে আনতো। কিন্তু ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ সে পথে হাঁটেইনি, সংগঠনটি অন্যান্য দলগুলোর মত জুলাইকে কুক্ষিগত করতে চায়নি, ফলে এই গর্বভরা সত্যিগুলোও মানুষের অজানা রয়ে গেছে।
৩. জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বর্তমান বাংলাদেশে জুলাইয়ের সবথেকে বড় প্রমাণ বহন করছে। সেখানেও ছাত্র আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। জুলাই জাদুঘরে শহীদ আব্দুর রহমান জিসানের এক ব্যান্ডানা সংরক্ষিত আছে, যা পরে সে জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতো, ব্যান্ডানাতে সুস্পষ্ট করে লেখা—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
জিসান একজন শিক্ষার্থী, জুলাই শহীদ। জীবনের সবথেকে কঠিন মুহুর্তগুলোতে তার কপালে লেপ্টে থাকতো একটি দলের নাম—এরপরও কি আরো কোনো প্রমাণের দরকার পড়ে?
৪. দেশসেরা পাবলিকেশনগুলোর মধ্যে অন্যতম এক পাবলিকেশন—ইউপিএল পাবলিকেশন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও মনস্তত্ত্ব রক্ষার্থে তারা কয়েকটা বই প্রকাশ করেছে, যারমধ্যে অন্যতম—পনেরো মাদরাসা সমন্বয়কের সাক্ষাৎকার। এখানে তারা সেসব ছাত্রনেতাদের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা দেশের নানানপ্রান্তে কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে আন্দোলনে নামানোর ক্ষেত্রে নানানভাবে ভূমিকা পালন করেছিলেন।
ইউপিএল কর্তৃপক্ষ সমন্বয়ক নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো দল বা সংগঠনের সাহায্য নেয়নি বরং এক্টিভিটি পর্যালোচনা ও আন্দোলনকারীদের সাক্ষ্যদানের প্রেক্ষিতেই ছাত্রনেতাদের বাছাই করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, বইটা পাবলিশ হওয়ার পর দেখা যায়—পনেরো জনের মধ্যে কাকতালীয় ভাবে ১০জনই ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে যুক্ত। অর্থাৎ ইউপিএলের মত আন্তর্জাতিক মানের এক প্রতিষ্ঠানের বাছাই করা জুলাই নেতৃত্বের অধিকাংশ নেতাই ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের দলীয় নেতা। বিষয়টা সাধারণ কোনো বিষয় নয়, বস্তুতই এটা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের নজরানার এক বিশাল প্রমাণ বহন করছে।
উল্লেখ্য যে—এই পনেরো সমন্বয়ক বাদেও এই সংগঠনের হাত ধরে যাত্রা করা ‘বৈষম্যবিরোধী কওমী ছাত্র আন্দোলন’-এর সদস্য সচিব মাকসুদুর রহমান সহ আরো এমন অনেক নেতৃত্বদানকারী জুলাই যোদ্ধা রয়েছে যা শুনলে যে কারোর চোখ কপালে উঠতে বাধ্য হবে।
৫. জুলাই যখন তুঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এমন সময়ে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, বিশেষ করে যাত্রাবাড়ীতে মাদ্রাসার ছাত্রদের তুমুল অংশগ্রহণ আন্দোলনকে এক নতুনমাত্রা দিয়েছিলো, একথা তো সকলেরই জানা। কিন্তু এর নেপথ্যের গল্প ক'জন জানে?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণার পর আন্দোলন যখন স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে তখন ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কওমী মাদ্রাসা সম্পাদকের সাথে ফরিদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, সাঈদনগর, বারিধারা, ইক্বরা সহ ঢাকার সুনামধন্য মাদ্রাসাগুলোতে থাকা দলীয় নেতাদের অনলাইনে এক বিশেষ মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এমন একটা প্লাটফর্ম তৈরী করার, যেখান থেকে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করা হবে এবং আন্দোলনে পাঠানোর নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা করা হবে। এই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ‘বৈষম্যবিরোধী কওমী ছাত্র আন্দোলন’-এর যাত্রা শুরু হয়। যার আওতায় দেশের সুনামধন্য মাদ্রাসাগুলো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে আন্দোলনটাকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে সাহায্য করেছিলো। গর্বের বিষয় হলো, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলেও বৈষম্যবিরোধী কওমী ছাত্র আন্দোলন এখনো জুলাইয়ের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের পরোক্ষ নেতৃত্বে প্রতিবছর এই সংগঠনের দায়িত্বশীল পরিবর্তন হচ্ছে, সংগঠনের ধারাবাহিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এসব নজরানা কেবলমাত্র জনপ্রত্যাশার বাংলাদেশ বিনির্মানের জন্য পেশ করা হয়েছিলো। আমরা দেশ, জাতি ও ধর্মের স্বার্থে দলীয় কোনো স্বার্থ ছাড়াই জীবন ত্যাগ করতে দ্বিধাবোধ করিনি। এখন আপনাদের পালা, আমাদের সকলের প্রত্যাশিত—জনপ্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে আপনাদের সহযোগিতা ও সমর্থন আমাদের একান্ত কাম্য, আপনারা সাথে থাকছেন তো?
লেখা কৃতজ্ঞতা:
Suhail Tanvir
সাবেক সহ-সভাপতি, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ, ঢাকা মহানগর উত্তর।