27/06/2026
• আব্দুল গফুর বালুচ •
মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে থাকা এক পাকিস্তানির অকুতোভয় দুঃসাহসী বন্ধুর গল্প..
এ যেন কোনো সিনেমার কাহিনি নয়, ইতিহাসের এক অনন্য সত্য।
আব্দুল গফুর বালুচ পাকিস্তানের নাগরিক হয়েও যিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিরস্ত্র বাংগালীর উপর নৃশংস বর্বরোচিত গণহত্যা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গনহত্যার প্রতিরোধে যিনি বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন নিজের জীবন ও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে—তিনি হলেন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আব্দুল গফুর বালুচ।
১৯৩৬ সালের ১২ই জুলাই করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল গফুর বালুচ। মায়ের দিক থেকে তিনি ছিলেন ইরানি বংশোদ্ভূত। মাত্র ১৫ বছর বয়সে করাচির কাদরি স্পোর্টস ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবলে যাত্রা শুরু করেন।
১৯৫৮ সালে করাচি কিকার্স দলের হয়ে আগা খান গোল্ডকাপ খেলতে প্রথম ঢাকায় আসেন। সেই আগমনই বদলে দেয় আব্দুল গফুর বালুচ এর জীবনের গতিপথ।
ঢাকায় এসে ফুটবলার আব্দুল গফুর বালুচ শুধু ফুটবল খেলেননি, ভালোবেসে ফেলেছিলেন এই বাংলার মানুষকে। পূর্ব পাকিস্তান ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে খেলেছেন, থেকেছেন গোপীবাগের ঐতিহাসিক ‘ভূত বাংলো’-তে (বর্তমান আনসার ক্যাম্প এলাকায়)। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গোপীবাগের আপন মানুষ।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অনেক অবাঙালি পাকিস্তানে ফিরে গেলেও গফুর বালুচ থেকে যান ঢাকায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতা ও গনহত্যা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল।
নিজের পাকিস্তানি পরিচয় ও খ্যাতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আব্দুল গফুর বালুচ বহু নিরীহ বাঙালিকে রক্ষা করেন। গোপীবাগের অসংখ্য মানুষ তাঁর কারণে পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতন থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ফুটবলার আব্দুল গফুর বালুচ এর বাসায় লুকিয়ে রাখা হতো। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, খাদ্য ও নানাভাবে সহযোগিতা করতেন।
ব্রাদার্স ইউনিয়নের সাবেক অধিনায়ক শহীদউদ্দিন আহমেদ সেলিম, সাদেক হোসেন খোকাসহ এলাকার অনেক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফুর বালুচ এর বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতার কথা স্মরণ করেছেন।
একবার ফুটবলার আব্দুল গফুর বালুচ নিজেই বলেছিলেন— “আমার সঙ্গে খেলত এক আর্মি অফিসার। সে আমাকে সব সময় সন্দেহ করত। বলত, আমি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছি। ঘরে উঁকি দিত, কিন্তু কখনো কঠোরভাবে তল্লাশি করত না।”
স্বাধীনতার পরও ফুটবলার আব্দুল গফুর বালুচ
এই দেশ ছেড়ে যাননি। ১৯৭২ সালে ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের খেলোয়াড় ও পরে কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একই সময়ে গোপীবাগের তরুণদের নিয়ে
ফুটবলার আব্দুল গফুর বালুচ গড়ে তোলেন ব্রাদার্স ইউনিয়নের সোনালি প্রজন্ম। সবার কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘ওস্তাদ গফুর’ নামে।
ফুটবলের প্রতি আব্দুল গফুর বালুচ এর ভালোবাসা ছিল অসীম। আজীবন অবিবাহিত ছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে বিয়ে না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন—
"কেয়া হোগা শাদি বানাকে, আকেলি হুঁ, আচ্ছা হুঁ। ইয়ে ফুটবল হি তো মেরা সংসার, মেরা মোকাম, বিবি-বাচ্চা। ইস সে জ্যাদা মুঝে কুছ ভি নেহি চাইয়ে।"
অর্থাৎ—"বিয়ে করে কী হবে? একা আছি, ভালোইতো আছি। এই ফুটবলই আমার সংসার, আমার স্ত্রী-সন্তান। এর চেয়ে বেশি আমার কিছুই চাই না।"
বাংলাদেশের প্রতি আব্দুল গফুর বালুচ এর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করে। স্বাধীন দেশের মাটিকেই তিনি নিজের শেষ ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
১৯৯৭ সালের ২৫ জুন ফুটবলার আব্দুল গফুর বালুচ
ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের ফুটবল এবং গোপীবাগের মানুষের অঅন্যতম একজন আপনজন।
আজ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বন্ধু ফুটবলার আব্দুল গফুর বালুচ এর মৃত্যুবার্ষিকী। আজকের এই দিনে উনাকে গভীর ভাবে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধের এই অকৃত্রিম বন্ধুকে।
বর্তমান প্রজন্মের জাতি হয়তো আব্দুল গফুর বালুচকে খুব বেশি স্মরণ করে না, কিন্তু ইতিহাস কখনো তাঁকে ভুলে যাবে না। বিনম্র শ্রদ্ধা আব্দুল গফুর বালুচ।
আপনি প্রমাণ করে গেছেন—মানুষের পরিচয় জাতি, ভাষা বা রাষ্ট্রে নয়; মানুষের পরিচয় তার মানবতা, বিবেক এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসে।
কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু
আব্দুল গফুর বালুচকে।
#গফুরবালুচ
#বন্ধু
#মুক্তিযুদ্ধ
#ইতিহাস
#গোপীবাগ
#ঢাকা
#বাংলাদেশ
Gopibag • The Neighborhood