23/07/2026
" আত্মসমালোচনা "
রাজনীতি, সংগঠন, শৃংখলা এবং সংবিধান !
২০০৬ সাল আমি তখন ৮ম শ্রেণীতে পড়ি। তখন জোহরের নামাজ পড়তাম আমার বিদ্যাপীঠ জামিরা বাজার আসমোতিয়া স্কুল সংলগ্ন মসজিদে। মসজিদে নিয়মিত জোহরের নামাজ আদায়ের কারণে পরিচয় হয় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন ইউনিয়ন দায়িত্বশীল মাসুদ ভাই, আল-আমিন ভাই সহ কয়েকজন ভাইয়ের সাথে। তাঁরা আমাকে ইসলামের পরিপূর্ণ জীবন বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সাহায্য করেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যেন জামাতের সহিত আদায় করি সেই দাওয়াত দেন এবং পরবর্তীতে বেশ কিছু দিন পর মাসিক 'কিশোর কন্ঠ' প্রকাশনা এবং বেশ কিছু ইসলামিক বই দেন পড়ার জন্য। তাদের ব্যবহার, ইসলামিক বিধান সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান সর্বোপরি অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আমাকে ধীরে ধীরে আকৃষ্ট করে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য "আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল (সা.) প্রদর্শিত বিধান অনুযায়ী মানুষের সার্বিক জীবনের পুনর্বিন্যাস সাধন করে আল্লাহর সন্তোষ অর্জন।"
-- এর উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে সংগঠনের সংবিধান অনুসারে সমর্থক ফর্ম পূরণ করে সমর্থক হলাম ।
পরবর্তীতে প্রতিদিনকার রিপোর্ট লেখা, সংগঠন প্রদত্ত ইসলামী বই এবং দাওয়াতি কাজে অংশগ্রহণ করি । এভাবে নিয়মিত অনিয়মিতভাবে সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকি।
দীর্ঘ সময় পর নিজ এলাকায় ইউনিয়ন দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে ২০১২ সালে সংগঠনের কর্মী হিসেবে উত্তীর্ণ হলাম। কারণ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কখনো ক্ষমতা, সিনিয়রিটি দেখে পদ পদবী নির্ধারণ করে না।
নির্দিষ্ট একটা সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে দিয়ে নির্দিষ্ট সিলেবাসের পড়ালেখা, সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে পরবর্তী পদোন্নতি লাভ করতে হয়।
এরপর বি.এল কলেজে মার্কেটিং বিভাগে বিবিএ (অনার্স) ভর্তি হবার পরে খুলনা মহানগরের বি.এল কলেজ শাখার শিবিরের সাথে পথচলা শুরু। পরিচিত হলাম সাদিক ভাই, দিপু ভাই , আকরাম ভাই সহ আরো কয়েকজনের সাথে।
শুরু হলো সাথী শপথ নেওয়ার কার্যক্রম। যেখানে নিয়মিত রিপোর্ট লেখা বাধ্যতামূলক । রিপোর্ট বইয়ের বিষয়বস্তু ছিল প্রতিদিন কয় ওয়াক্ত নামাজ জামাতে, কাজা আদায় এবং আদায় হয়নি সেটা লেখা, তরজমা সহ কোরান শরীফ কত আয়াত, হাদীস কয়টি পড়া হয়েছে, পাঠ্যপুস্তক কত ঘন্টা, পত্রিকা পড়া, খেলাধুলা, দাওয়াতি কাজ কতজনকে করেছি,কাউকে সমর্থক বানাতে পেরেছি কিনা, সর্বশেষ একটা কলাম থাকতো যেটা একজন মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কলামটি ছিল "আত্মসমালোচনা" । প্রতিদিন আমি কি কি কাজ করছি , সেটা খারাপ নাকি ভালো, আমার দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলো কিনা এমন নিজের দৈনন্দিন সকল কাজ রাতে ঘুমানোর আগে কিছুটা সময় দিয়ে ভাবতে হতো। এমন আরো কয়েকটি তথ্য ঐ রিপোর্ট বইতে প্রতিদিন লিখতে হতো। এবং প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার দিনব্যাপী কর্মশালায় উপস্থিত হয়ে রিপোর্ট দেখানো লাগতো।
তখন বি.এল কলেজ শাখায় অন্তর্ভুক্ত থাকায় বি.এল কলেজের তৎকালীন সভাপতি সুজন কাজী ভাই ছিলেন আমার দায়িত্বশীল। রিপোর্ট এ সমস্যা থাকলে দায়িত্বশীলের নিকট জবাবদিহিতা করা লাগতো। প্রতিমাসে সাধ্যমত বাতুলমালে ইয়ানত দিতাম।
কয়েকবার সাথী শপথ নিতে ইচ্ছুক হলেও নামাজ কাজা সহ রিপোর্ট লেখা পরিপূর্ণ না থাকায় দায়িত্বশীল সাথী শপথ নিতে মহানগরে পাঠায় নাই। ২০১৪ সালে অনেক পরিশ্রম করার পরেও খুলনা মহানগর অফিসে পরিক্ষা দিয়েও রিপোর্ট এবং হাদিস মুখস্থ সম্পূর্ণ না থাকায় সাথী শপথ না নিয়ে ফেরত আসা লাগে।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালের প্রথম দিকেই আবারো আমরা প্রায় ২৫-৩০ জনের মতো সাথী শপথের পরীক্ষা দিতে খুলনা যাই। সেদিন সকাল থেকে পড়াশোনা করার পর পরীক্ষার্থী ভাইদের নিয়ে অফিসেই যোহরের নামাজের ইমামতি দায়িত্ব পড়ে। সেজদায় অবণত হয়ে আল্লাহর কাছে শুধু চেয়েছিলাম, এবার যেন শহীদি কাফেলার সাথী হয়ে ফিরতে পারি।
তৎকালীন খুলনা মহানগরের দায়িত্বশীল মোজাহিদ ভাইয়ের কাছে দেওয়া পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা প্রায় ২১ জনের মতো সাথী শপথ গ্রহণ করি।
আলহামদুলিল্লাহ, আমার সমসাময়িক সাথী হওয়া Rakib Hasan ভাই বর্তমান খুলনা মহানগরের সভাপতি।
সেদিন শপথ গ্রহণ করার পর মনে হয়েছিল , ততদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে আমার অর্জনের শ্রেষ্ঠ অর্জন ছিল শিবিরের সাথী হওয়া। কারণ আমার জীবনে কোন কিছু অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ একাগ্রতা,কষ্ট, ধৈর্য আর পরিশ্রম করেছিলাম শিবিরের সাথী হওয়ার জন্য।
এরপর দায়িত্ব পেলাম সরকারি বি.এল কলেজ শাখার মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি হিসেবে। সবসময়ই ভয় হতো দায়িত্ব পালনে ব্যার্থ হওয়ার।
বড় সিলেবাসে প্রস্তুতি নিতে লাগলাম সদস্য হওয়ার জন্য। নিয়মিত রিপোর্ট , ইসলামী বই, কোরানের আয়াত এবং হাদিস মুখস্থ করার মাধ্যমে। কিন্তু হঠাৎ ব্যক্তিগত একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি তখন মনে হয় এটা আমার সংগঠনের পরিপন্থী কাজ , নিজেকে ফিরিয়ে আনতেও চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু নফসের সাথে তখন হেরে যাই।
পরবর্তীতে মনে হয়েছিলো, যে সংগঠন কে আমি মনে প্রাণে ভালোবাসি আমি চাইনা আমার কারণে, আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা কখনো কেউ সংগঠন সম্পর্কে খারাপ মনোভাব পোষণ করুক। আত্মসমালোচনা করে দায়িত্বশীলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে নিজের অপারগতা স্বীকার করে ২০০৮-২০১৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছরের ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছাত্রত্য জীবনের ইতি টানি।
আমি এখনো সাংগঠনিক বিষয়ে কোন পরিচয় দেইনা। কারণ, আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শিবির বা জামায়াত ইসলামের সংবিধান পরিপন্থী।
আমার চারিত্রিক এবং নৈতিক পরিবর্তন যখন ইসলামের সংবিধান অনুযায়ী সর্ব উৎকৃষ্ট পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবো, তখন সাংগঠনিক ভাবে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামে নিজেকে নিয়োজিত করবো। ইনশাআল্লাহ
আমি এজন্য এই কথা গুলো বললাম, যারাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির অথবা বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামের ছায়াতলে আছেন । আত্মসমালোচনার মাধ্যমে যদি বোঝেন নিজের চারিত্রিক এবং নৈতিকতার অধঃপতন হয়েছে। তখন সংগঠন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিবেন অথবা খুব দ্রুত নিজেকে শুধরে নিবেন।
কারণ এতো কষ্টে গড়া সংগঠন, সংগঠনের সুনাম, কোরানের আলোকে গড়া সংগঠনের সংবিধান, সংগঠনের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস দয়া করে ব্যক্তি স্বার্থে ধুলোয় মিশিয়ে দিবেন না। সংগঠন কে বিতর্কিত করবেন না।
কারণ আপনি জানেন সংগঠনের সাংবিধানিক নিয়ম ও কাঠামো কি! তাই সংগঠন সংবিধান পরিপন্থী কাজ করে, নিজের ব্যক্তিত্ব হণণ করার মাধ্যমে দয়া করে সংগঠনের সুনাম নষ্ট করবেন না।
আসসালামুয়ালাইকুম