26/07/2026
একজন নতুন স্বামীর অপ্রস্তুত যাত্রা (পর্ব:৪)
৩. শুধুমাত্র সন্তান পাওয়ার চেষ্টার চেয়েও ভালোবাসার বন্ধনকে অগ্রাধিকার দেওয়া
প্রিয় ভাই আমার, আপনি হয়তো মনে করছেন পরিবারে সন্তান আনার এই পরিকল্পনাটি বুঝি কেবলই এক রোমাঞ্চ আর আনন্দের সফর। বিয়ের কিছুদিন পর যখন ঘর আলো করে নতুন অতিথি আসার কথা ভাবা হয়, তখন একজন পুরুষ হিসেবে আপনি হয়তো শুধু সম্ভাবনার রঙিন স্বপ্নটুকুই দেখেন।
কিন্তু নির্মম সত্য হলো, এই পুরো পথচলাটি একজন নারীর জন্য মানসিকভাবে কতটা যে নিঃসঙ্গ আর পরীক্ষার, তা বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ আন্দাজও করতে পারবে না।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন যে, বিয়ের কিছুদিন গড়ালেই চারপাশের মানু্ষ নানা ধরনের খোঁচা মারা প্রশ্ন শুরু করে—কী ব্যাপার হুঁ, সুখবর কবে দিচ্ছ?
এই একটা প্রশ্ন স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ওপরই চাপ তৈরি করে। কিন্তু সেই চাপের নব্বই ভাগ কিন্তু সামলাতে হয় আপনার পাশে থাকা প্রিয়তমা স্ত্রীকেই। সমাজ তাকেই আতশিকাচের নিচে দাঁড় করায়।
আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় প্রতি মাসের এক নীরব, নিঃশব্দ কষ্টের গল্প।
একজন পুরুষ হিসেবে আপনি হয়তো মাসের একটা নির্দিষ্ট দিনে জানতে পারেন, "না, এবারও হলো না।"
আপনি হয়তো শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যান। কিন্তু আপনার সন্তান প্রত্যাশী স্ত্রী?
প্রতিটা মাসের শুরুতে সে মনের ভেতরে একটা সুপ্ত আশার প্রদীপ জ্বালায়। সে মনে মনে স্বপ্ন বুনে, হয়তো এই মাসে তার কোল পূর্ণ হবে, হয়তো এবার সে আপনাকে বাবা হওয়ার সুখবরটা দিতে পারবে। কিন্তু মাসের নির্দিষ্ট দিনে যখন তার সেই আশাটা কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তখন তার ভেতরের মানসিক অবস্থাটা কেমন হয়, তা কখনো ভেবে দেখেছেন?
এটি শুধু একটি চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া নয়; এটি তার মাতৃত্বের আকুলতার ওপর প্রতি মাসে এক একটা শক্ত চাবুকের আঘাত।
সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় যখন বিলম্ব হতে থাকে, তখন একটি মেয়ে নিজের অজান্তেই মারাত্মক এক আত্মগ্লানিতে ভুগতে শুরু করে। সে প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অপরাধী মনে করে। সে ভাবতে থাকে, হয়তো আমার শরীরের কোন সমস্যার জন্যই আজ আমার স্বামীর ঘর শূন্য, হয়তো আমিই তাকে বাবা হওয়ার আনন্দ দিতে পারছি না।
নিজের ভেতরে এই যে নিজেকে অপরাধী ভাবার বিষাক্ত অনুভূতি, এটি তাকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে ফেলে। সে প্রতি রাতে এক বুক কান্না চেপে ধরে ঘুমায়, অথচ আপনি হয়তো তার পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন। আমি আবারো বলছি, হয়তো! (এর মানেই এই নয়, স্বামীরা এটা নিয়ে কষ্ট পান না)
আপনি জানেন ভাই, ঠিক এই চরম সংকটময় মুহূর্তে আমাদের সমাজের নতুন স্বামীরা না বুঝে খুব বড় একটা বোকামি করে বসে। স্ত্রীকে একটু মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখলে কিংবা কেঁদে ফেলতে দেখলে খুব সহজ আর হালকা গলায় বলে ফেলে, আহা! এত চিন্তা করছ কেন? সব ঠিক হয়ে যাবে, সময় হলে ঠিকই হবে। তোমার এসব কান্না আর ভালো লাগে না। আর মন খারাপ করেই বা কী লাভ?
একজন পুরুষ হিসেবে আপনি হয়তো ভেবেছেন, আপনি তো তাকে সান্ত্বনাই দিলেন, পজিটিভ কথাই বললেন! কিন্তু বিশ্বাস করুন ভাই, যে নারী প্রতিদিন একটা অপূর্ণতা, মানুষের খোঁচা আর কষ্ট বুকে চেপে বেঁচে আছে, তার কাছে আপনার এই আলতো বাক্যটি কোনো সান্ত্বনা হয়ে পৌঁছায় না।
তার মনে হয়, আমার মনের ভেতর কী তোলপাড় হচ্ছে, তা আমার স্বামী বুঝতেই পারল না! সে কত সহজে কথাটা উড়িয়ে দিল! সে কি তবে এটাকে শুধুই আমার একার সমস্যা আর আমার একার লড়াই মনে করছে?
আপনার এই হালকা সান্ত্বনা স্ত্রীর মনে এক সুতীব্র একাকীত্ব তৈরি করে। সে ধরে নেয়, এই কষ্টের গভীরতা বোঝার ক্ষমতা তার স্বামীর নেই। ফলে সে আপনার কাছে নিজের কষ্টের কথা বলা বন্ধ করে দেয়। সে হাসার অভিনয় করে, কিন্তু ভেতরের কান্না ভেতরে জমাতে জমাতে আপনাদের দুজনের মাঝখানে মাইলের পর মাইল মানসিকভাবে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়।
প্রিয় ভাই আমার, ইসলাম আপনাকে পরিবারের দায়িত্বশীল বানিয়েছে কেবল সংসার চালানোর টাকা জোগাড় করার জন্য নয়; স্ত্রীর মনের খেয়াল রাখার জন্যও। সন্তান হওয়া বা না হওয়া, এটি কোনো মানুষের কেরামতি নয়, এটি সম্পূর্ণ মহান আল্লাহ তাআলার একচ্ছত্র হুকুম ও বিশেষ পরিকল্পনা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, তিনি যাকে চান কন্যাসন্তান দেন, যাকে চান পুত্রসন্তান দেন, আর যাকে চান বন্ধ্যা রাখেন। কুরআনে জাকারিয়া (আ.) এবং তাঁর স্ত্রীর ঘটনা আমাদের শেখায় যে, জীবনের দীর্ঘ সময় সন্তান না থাকা সত্ত্বেও তাঁরা একে অপরকে কখনো দোষ দেননি, বরং একসাথে আল্লাহ তা'আলার দরবারে হাত তুলেছেন।
🌷 এই সংবেদনশীল সময়ে একজন সত্যিকারের সঙ্গী ও দায়িত্বশীল পুরুষ হিসেবে আপনার আসলে কী করা উচিত?
এই পরীক্ষা বা সংকটময় মুহূর্তে একজন স্বামী কেবল একজন দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তাকে হতে হয় সহযোদ্ধা, আশ্রয় এবং প্রবোধের সুর। একজন স্বামী ও দায়িত্বশীল পুরুষ হিসেবে আপনার আচরণিক পরিবর্তনগুলো ঠিক কেমন হওয়া উচিত, আসুন তা নিয়ে একটু কথা বলি:
১. লড়াইটা নিজের কাঁধে নিন এবং যৌথ দায়িত্ব হিসেবে দেখুন: কখনো, কোনো অবস্থাতেই স্ত্রীকে এই বিষাক্ত অনুভূতির মুখোমুখি হতে দিবেন না যে, সন্তান না হওয়াটা তার একার ব্যর্থতা কিংবা শারীরিক অসম্পূর্ণতা। এটি আপনার ও তার উভয়ের যৌথ সফর।
🚦চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ: ডাক্তার দেখানোর দিনগুলোতে কোনো অজুহাত বা অলসতা দেখাবেন না। "আমার তো কোনো সমস্যা নেই, তুমি গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এসো" এই একটি বাক্য একজন নারীর কলিজায় তীরের মতো বিঁধে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিটি রিপোর্টে, প্রতিটি হাসপাতালে যাওয়ার দিনে তার পাশে ছায়ার মতো থাকুন। তার হাতটা ধরে রাখুন, যেন সে বোঝে ফলাফল যাই আসুক, আপনি সেই ফলাফলের অর্ধেক অংশীদার।
🚦 শারীরিক ও মানসিক ধকল ভাগ করে নেওয়া: সন্তান না হওয়ার চিকিৎসায় নারীকে প্রচুর হরমোনাল ওষুধ, ইনজেকশন বা নানাবিধ শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই সময়গুলোতে তার মেজাজ খিটখিটে হতে পারে, শরীর ভীষণ ক্লান্ত থাকতে পারে। ঘরের কাজে তাকে অতিরিক্ত সাহায্য করুন, তার খেয়াল রাখুন। সে যখন শারীরিক কষ্টে ছটফট করবে, তখন তাকে বুঝিয়ে দিন, তার এই কষ্টটা আপনি অনুভব করতে পারছেন।
২. সামাজিক ও পারিবারিক প্রহারের সামনে ঢাল ও রক্ষাকবচ হোন: আমাদের সমাজের একটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট স্বভাব হলো, দাম্পত্যের কিছু সময় পার হলেই আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, এমনকি ঘরের নিজের মানুষজনও নারীর দিকে আঙুল তুলতে শুরু করে। খোঁচা মেরে কথা বলা, অহেতুক নসিহত দেওয়া কিংবা অপয়া ভেবে তাকে মানসিক কষ্ট দেওয়া আমাদের সমাজে হরহামেশাই ঘটে।
🚦স্ত্রীকে পেছনে রেখে নিজে সামনে দাঁড়ান: যখনই কেউ আপনার স্ত্রীর সামনে সন্তান নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক বা কষ্টদায়ক প্রশ্ন তুলবে, স্ত্রীকে একটি শব্দও বলতে দিবেন না। তাকে নিজের পেছনে আগলে রেখে স্বামী হিসেবে আপনি নিজে শক্ত মুখে উত্তম জবাব দিন। অবশ্যই অতিরিক্ত রাগান্বিত না হয়ে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করবেন, যেন পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি না হয়। তবে জবাব দিবেন।
🚦 স্পষ্ট ও দৃঢ় বার্তা দিন: মিষ্টি হেসে এড়িয়ে না গিয়ে প্রবীণ বা নবীন সবার সামনে স্পষ্ট ভাষায় বলুন, সন্তান দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর হাত। আমরা যথাসময়ে চেষ্টা করছি এবং আলহামদুলিল্লাহ আমরা দুজনে খুব সুখে আছি। দয়া করে অহেতুক প্রশ্ন করে ওকে বা আমাকে কষ্ট দিবেন না।
🚦 ঘরের ভেতরের সুরক্ষাবলয়: এমনকি নিজের মা-বাবা বা ভাই-বোনও যদি পরোক্ষভাবে তাকে মানসিক চাপ দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে একান্তে নিজের পরিবারকে ডেকে বুঝিয়ে বলুন। পরিষ্কার জানিয়ে দিন যে, স্ত্রীর মনে আঘাত লাগে এমন কোনো কথা আপনি বরদাশত করবেন না। সমাজ যখন দেখবে স্বামীটি তার স্ত্রীর জন্য পাহাড়ের মতো শক্ত দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তখন সবাই নিজ থেকেই মুখ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।
৩. তার অন্তরের ভয় দূর করে ভালোবাসার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দিন: সন্তান না হওয়া বা দেরি হওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি নারীর সবচেয়ে বড় সুপ্ত আতঙ্ক হলো, আজ হয়তো আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসে, কিন্তু কাল যদি সন্তান না হয়, তবে কি সে আমাকে ছেড়ে দিবে? সে কি অন্য কোথাও বিয়ে করবে? আমি কি তার জীবনে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বো? এই ভয়টা তাকে ভেতরে ভেতরে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে।
একজন সত্যিকারের সঙ্গীর মূল কাজ হলো স্ত্রীর মন থেকে এই অদৃশ্য ভয়ের শিকড় উপড়ে ফেলা।
🚦কথায় ও আচরণে ভরসা দেওয়া: কেবল মনে মনে ভালোবাসলেই হবে না, মুখ ফুটে তা বলতে হবে। পরিস্থিতি যখনই ভারী মনে হবে, কোনো এক নিঝুম সন্ধ্যায় তার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিন। তার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম হৃদয় থেকে বলুন, শোনো, তুমি হয়তো ভাবছ সন্তান না এলে আমাদের জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কিন্তু আমার দিকে তাকিয়ে সত্যিটা শোনো, তুমি সন্তান জন্ম দেওয়ার কোনো যন্ত্র নও, আর শুধুমাত্র সন্তান আসার মাধ্যম বলেই আমি তোমাকে ভালোবাসিনি। তুমি আমার জীবনে আছ, তুমি আমার স্ত্রী—এটিই আমার কাছে রাব্বুল আলামিনের দেওয়া সবচেয়ে বড় নিয়ামত। আল্লাহ তা'আলা যদি আমাদের কোল পূর্ণ করেন, আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি কোনোদিন নাও করেন, তবুও আমার ভালোবাসায় এক চিলতে কমতি আসবে না। আমি দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাকেই আমার সঙ্গী হিসেবে চাই।
৪. দাম্পত্যের মূল রসায়নকে জীবিত রাখুন: সন্তান পাওয়ার এই বৈজ্ঞানিক ক্যালেন্ডার, ওভিউলেশন পিরিয়ডের হিসাব, আর ডাক্তারের চক্করে পড়ে অনেক সময় দম্পতির ভালোবাসার স্বাভাবিক সম্পর্কটা একটি যান্ত্রিক ডিউটিতে পরিণত হয়। এটি সম্পর্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
🚦সন্তান পাওয়ার চেষ্টার বাইরেও নিজেদের মধ্যকার প্রেম, হাসি-ঠাট্টা আর আবেগ ধরে রাখুন।
🚦হঠাৎ কোনো একদিন তাকে নিয়ে দূরে কোথাও ঘুরে আসুন (যদিও আমি দূরে সফর খুবই কম পছন্দ করি সেইফটির জন্যে), তার পছন্দের খাবার কিনে আনুন, কোনো কারণ ছাড়াই তাকে ছোটখাট উপহার দিন।
🚦 তাকে অনুধাবন করান যে, আপনারা শুধু সন্তান পাওয়ার জন্য কোনো প্রতিযোগী নন, আপনারা দুজন দুজনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
একজন পুরুষ যখন তার স্ত্রীর এই কঠিন ও সংবেদনশীল যাত্রায় কোনো অভিযোগ না তুলে এমন এক বটবৃক্ষের মতো শীতল ছায়া হয়ে দাঁড়াতে পারে, তখন সেই সংসারে সন্তানের কলকাকলি মুখরিত হোক বা না হোক, মহান আল্লাহ তাআলা সেই ঘরে প্রশান্তি (সাকিনাহ) ও বরকতের চাদর বিছিয়ে দিবেন ইন শা আল্লাহ ।
৫ম পর্ব পড়তে আগ্রহী তো সম্মানিত ভাইয়েরা? নাকি ভাবছেন, দূর সময় নষ্ট!
বি:দ্র: অনেকেই ভাবতে পারেন আরে প্যারেন্টিং গ্রুপে এত পারিবারিক আলোচনা কেন। প্যারেন্টিং মানে তো শুধুমাত্র সন্তান প্রতিপালন। কিন্তু প্যারেন্টিং এর মূল সূত্রপাত কিন্তু স্বামী স্ত্রীর মাধ্যমেই হয়। তাই একজন প্যারেন্টিং এক্টিভিস্ট হিসাবে আমি পারিবারিক দিকগুলোতে বেশি ফোকাস দেয়ার চেষ্টা করি। এরপরও যদি কারো খারাপ লাগে 👎, আর ভালো লাগলে 👍 দিবেন। আপনাদের মন্তব্যের উপরে নির্ভর করে পরের পর্বগুলো দিব কি দিব না চিন্তা করব ইন শা আল্লাহ।