03/09/2026
নজরুলকে ধারণ করতে হলে নজরুলের চেতনাকেই ধারণ করতে হবে
কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের অদ্ভুত স্ববিরোধিতা লক্ষ করা যায়। মুখে তাঁকে জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি, অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি, সাম্য ও মানবতার কবি হিসেবে উচ্চারণ করা হয়; কিন্তু তাঁর সাহিত্য, দর্শন ও জীবনবোধের সঙ্গে যখন বাস্তব আচরণের মিল খোঁজা হয়, তখন দেখা যায় বিস্তর ফারাক। নজরুলকে শুধু উদ্ধৃত করলেই নজরুলকে ধারণ করা হয় না। নজরুলকে ধারণ করতে হলে তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা, মানবতাবাদ, যুক্তিবোধ, সাম্যচেতনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানকেও ধারণ করতে হয়।
নজরুলের সাহিত্যই তার সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য।
তিনি যেমন লিখেছেন,
“আল্লাহ আমার প্রভু/ আমার নাহি নাহি ভয়/
আমার নবী মোহাম্মদ/ তাঁহার তারিফ জগতময়।”
তেমনি একই কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে শ্যামাসংগীতের গভীর ভক্তি—
“কে পরালো মুন্ডু-মালা / আমার শ্যামা মায়ের গলে,
সহস্রদল জীবন-কমল / দোলেরে যাঁর চরণ-তলে।”
আবার সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে তাঁর অমর উচ্চারণ—
“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম,
হিন্দু মুসলমান,
মুসলিম তার নয়নমণি,
হিন্দু তাহার প্রাণ।”
এই নজরুলকে খণ্ডিত করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁকে কেবল মুসলমানের কবি, কেবল হিন্দুর কবি, কেবল বিদ্রোহের কবি কিংবা কেবল প্রেমের কবি হিসেবে আবদ্ধ করার চেষ্টা তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তার প্রতি অবিচার। নজরুল ছিলেন বহুমাত্রিক, এবং তাঁর সেই বহুমাত্রিকতার কেন্দ্রে ছিল মানুষ।
সুতরাং যারা মুখে নজরুলের নাম উচ্চারণ করেন, অথচ সাম্প্রদায়িক বিভাজন, অন্ধ বিশ্বাস, অসহিষ্ণুতা কিংবা নিপীড়নের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেন, তাঁদের কাছে প্রশ্ন থেকেই যায়: কোন নজরুলকে তাঁরা ধারণ করেন?
নজরুলকে ধারণ করতে হলে অসাম্প্রদায়িক হতে হয়। শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে হয়। সাম্য ও মানবিকতার চর্চা করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের সাহস রাখতে হয়। যুক্তি, জ্ঞান ও বিবেককে অন্ধ বিশ্বাসের ওপরে স্থান দিতে হয়। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীল হতে হয়। সর্বোপরি, দেশপ্রেমকে হতে হয় দৃঢ় ও মানবিক।
নজরুলকে অন্ধভাবে পূজা করে তাঁর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক প্রতিকৃতি নির্মাণের চেষ্টা তাই মূলত নজরুলের প্রতিই অবমাননা। কবিকে ধারণ করার অর্থ তাঁর মূর্তি নির্মাণ নয়; তাঁর চেতনাকে নিজের জীবন ও সমাজে কার্যকর করা।
এখানেই নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে দাঁড় করানোর পুরোনো প্রবণতাটিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন সময় গেছে, যখন রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করে নজরুলকে সামনে দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে। “রবীন্দ্রনাথ মুর্দাবাদ, নজরুল ইসলাম জিন্দাবাদ” ধরনের স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে। রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার মতো সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতাও আমরা দেখেছি। অথচ নজরুলকে বুঝতে হলে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার প্রয়োজন কোথায়?
নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ প্রতিদ্বন্দ্বী নন। তাঁরা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুই স্বতন্ত্র অথচ পরস্পর-সম্পর্কিত মহীরুহ। একজনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অন্যজনকে অপমান করা কোনো সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনার পরিচয় হতে পারে না।
এমনকি আজও রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে নানা অপপ্রচার ছড়ানো হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য তথ্যের পরিবর্তে এমন প্রচারণা মূলত একটি বিশেষ মানসিকতারই প্রকাশ, যে মানসিকতা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে খণ্ডিত করতে চায়।
জাতীয় সংগীত নিয়েও একই ধরনের বিতর্ক আমরা প্রত্যক্ষ করি। ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। এটি শুধু একটি গান নয়, আমাদের জাতীয় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রতীক। এই সংগীতকে অস্বীকার করার প্রবণতা তাই নিছক রুচির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
মুক্তিযুদ্ধের আগে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও রবীন্দ্রচর্চাকে সংকুচিত করার নানা প্রয়াস ছিল। বাংলা বিভাগে রবীন্দ্রনাথকে পাঠ থেকে দূরে রাখার উদ্যোগ, রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে বিদ্রূপ কিংবা “তোমরা নিজেরা রবীন্দ্রসংগীত লিখতে পারো না?” ধরনের মন্তব্য ছিল সেই সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতারই প্রকাশ। একইভাবে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যকেও কখনো কখনো তার নিজস্ব নাম ও পরিচয় আড়াল করে পড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে।
এই ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়: সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিপদ কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, ইতিহাস ও সাহিত্যকে নিজের সংকীর্ণ মতাদর্শের উপযোগী করে পুনর্লিখনের চেষ্টাও।
নজরুলকে নিয়ে আজ যারা সবচেয়ে বেশি উচ্চকণ্ঠ, তাঁদের তাই আগে নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন: তাঁরা কি নজরুলের কবিতা পড়ছেন, নাকি নিজেদের সুবিধামতো একটি ‘নজরুল’ নির্মাণ করছেন?
‘জয় বাংলা’ শব্দবন্ধের সঙ্গে নজরুলের কবিতার ঐতিহাসিক সম্পর্কও আমাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই চেতনাকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগ্রামের স্লোগানে রূপ দিয়েছিলেন। ফলে নজরুল, বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
নজরুলকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে হলে তাই তাঁকে কোনো সম্প্রদায়ের একক সম্পত্তি বানানো যাবে না। তাঁকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য খণ্ডিতও করা যাবে না। নজরুলের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিতে যতটা, তার চেয়েও বেশি নিহিত তাঁর মানবিক ও মুক্তচিন্তার দর্শনে।
নজরুলের নামে স্লোগান দেওয়া সহজ। নজরুলের মতো করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন। নজরুলের কবিতা মুখস্থ করা সহজ। তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা, যুক্তিবাদ, সাম্য ও মানবিকতা নিজের জীবনে ধারণ করা কঠিন।
কিন্তু সেই কঠিন কাজটিই করতে হবে।
কারণ নজরুলকে ভালোবাসার সবচেয়ে সত্য প্রমাণ নজরুলের নাম উচ্চারণ নয়; নজরুলের চেতনাকে জীবিত রাখা।