31/07/2026
আমার একটা স্বপ্ন
লেখাটা একটু বড়, কিন্তু বিনীত অনুরোধ—আপনারা সবাই লেখাটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়বেন। বিএনপির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে শুভাকাঙ্ক্ষী, সবার জন্যই এটি পড়া অত্যন্ত জরুরি। দয়া করে লেখাটি শেয়ার করে অন্যদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন।
"রাজনীতি কোনো টাকা বানানোর হাতিয়ার নয়, এটি দেশ গড়ার পবিত্র ব্রত।" এই বাক্যটি আজ কেবলই বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ মনে হলেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একসময় এটিই ছিল চরম সত্য।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন রমনা রেস্তোরাঁয় আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর সঙ্গী ছিলেন এমন একদল নেতা যাঁদের সততা, প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্ব ও আধুনিকতা এককথায় আজ রূপকথার মতো শোনায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দলের ভেতরেই আজ অনেকে জানেন না কারা ছিলেন বিএনপির সেই প্রথম কমিটির সদস্য; জানেন না দল ও জাতির প্রতি তাঁদের অবদানের কথা। শুধু জিয়াউর রহমানের শাসনকাল, তাঁর পররাষ্ট্রনীতি এবং সেসময়ে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কতটা উজ্জ্বল হয়েছিল তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই একটি থিসিস পেপার বা পিএইচডি করা সম্ভব। তাই সেদিকে আর বিস্তারিত যাচ্ছি না।
এরপর আসে আমাদের মা, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর নেতৃত্বে আমাদের দল কীভাবে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হলো এবং বিরোধী দলে থেকেও শুধু তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি কীভাবে ক্ষমতায় আরোহণ করেছিল সেই পেছনের ইতিহাসও আজ আমাদের অনেকেরই অজানা। বর্তমান প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস জানা এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে মেধা ও সততার সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট বিএনপির সেই প্রথম কমিটিতে ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার, মশিয়ূর রহমান যাদু মিয়া, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ডা. এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, এম. সাইফুর রহমান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দীন সরকার এবং মির্জা গোলাম হাফিজের মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ।
জানলে অবাক হবেন, এই ৭৬ জনের মধ্যে আজ মাত্র ১ জন বেঁচে আছেন, বাকি ৭৫ জনই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। অথচ তাঁদের প্রত্যেকের রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাস। তাঁদের সততা ও যোগ্যতার উদাহরণ দিতে গেলে সদ্য প্রয়াত ব্যারিস্টার জমিরউদ্দীন সরকারের কথা বলতেই হয়। তিনি একাধারে ৭টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু তাঁর সততা ছিল সবসময় প্রশ্নাতীত। ঢাকায় এই মানুষটার একটি নিজস্ব ফ্ল্যাট পর্যন্ত নেই! ঠিক একইভাবে, ড. আমিনা রহমান মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রথম মন্ত্রী হিসেবে (১৯৭৯-১৯৮০) অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এই কমিটিতে এমন অনেক স্বনামধন্য রাজনীতিক ছিলেন, যাঁদের সততা ও জ্ঞান ছিল অভাবনীয়। কিন্তু আজকের প্রজন্ম এই ইতিহাস একদমই জানে না।
অন্যদিকে আমরা যদি জামায়াতের দিকে তাকাই, তবে ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। আমাদের নেতাদের মেধা, যোগ্যতা ও বিচক্ষণতার ধারের কাছে না থেকেও তারা নিজেদের নেতাদের নামের আগে শহীদ, ব্যারিস্টার, প্রফেসর ইত্যাদি লিখে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। তারা তাদের নেতাদের সম্পর্কে এমনভাবে গল্প ফাঁদে, যেন তারা ফেরেশতাদের কাছাকাছি! অথচ তাদের আসল রূপ আজ আমাদের সবার সামনে পরিষ্কার।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কমপক্ষে ৩০০ নেতার নাম বলা যাবে, যাঁদের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার ধারের কাছে থাকা একজন জামায়াত নেতার নামও আপনি বলতে পারবেন না।
কিন্তু জামায়াত তাদের নেতাদের নিয়ে বিশাল গল্পের ফাঁদ তৈরি করে তাদের ‘মহান নেতা’ বানিয়ে রেখেছে এবং তাদের একজনকেও তারা বিস্মৃত হতে দেয় না। তারা প্রতিনিয়ত সেমিনার ও কর্মীসভায় তাদের প্রয়াত নেতাদের এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন কর্মীরা তাঁদের মহাপুরুষ ভেবে অনুপ্রাণিত হয়। অথচ শিক্ষাদীক্ষা, নির্বাহী যোগ্যতা, সততা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দেশের রাজনীতিতে অবদানের ক্ষেত্রে আমাদের নেতারা তাদের চেয়ে লাখ গুণ এগিয়ে।
ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। নতুন বিশ্ব পরিস্থিতিতে বিএনপির মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নীতি, দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও দলের কার্যক্রম জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি। সেই সাথে বিরোধীদের মোকাবিলা করার কৌশল এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে নেতাকর্মীদের অভ্যস্ত করে তাদের নিজস্ব যোগ্যতায় উন্নত পর্যায়ে নেওয়ার তাগিদ এখন সময়ের দাবি।
রাজনীতিতে এখন আর কেবল স্লোগান বা আবেগ দিয়ে কাজ হবে না। নতুন প্রজন্মকে যোগ্য, সৎ এবং দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে একটি সুশৃঙ্খল "গবেষণা ও রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র" স্থাপন করা এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আমাদের শহীদ জিয়া এই এ কে এম ফিরোজ নুন সাহেবকে অধ্যক্ষ করে স্থাপন করেছিলেন রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এবং নিয়মিত ক্লাস হতো।এবং সেখানে পরীক্ষা হতো।এমন কি মন্ত্রীদের কেও অংশ নিতে হতো। এমন কি সেই পরীক্ষায় ফেল করে একজন বেশ সিনিয়র মন্ত্রীকে পদত্যাগ ও করতে হয়েছিলো। এখন আবারো এই প্রজেক্টকে কোনো রুটিন কাজ নয়, এটি হবে প্রতিদিনের কাজ। অর্থাৎ, বছরের ৩৬৫ দিন (ছুটির দিন ছাড়া)
সারাদেশের নেতাকর্মী ও ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নিয়ে আমার একটি স্বপ্ন আছে:
পল্টন বা গুলশান অফিসে একটি আধুনিক রাজনৈতিক গবেষণাগার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
যেখানে তরুণ নেতারা বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতাদের কাছ থেকে রাজনীতির পাঠ নেবেন।
এই আধুনিক রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তরুণদের অর্থনীতি ও জনকল্যাণ, ভূগোল ও ভূ-রাজনীতি, ইতিহাস ও আদর্শ এবং সংবিধান ও আইন ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত জানানো ও শেখানো হবে।
যে দলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন চরম সৎ ও প্রাজ্ঞ নেতারা, সেই দলের নতুন প্রজন্মের হাতে যদি আমরা সঠিক রাজনৈতিক শিক্ষা ও গবেষণার হাতিয়ার তুলে দিতে পারি, তবেই রাজনীতি আবারও কলুষমুক্ত হবে। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করতে এমন একটি 'গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যালয়' এখন আর কেবল স্বপ্ন নয়, বরং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য প্রয়োজন।