23/08/2026
نَحْمَدُهُ وَنُصَلِّي عَلَى رَسُولِهِ الْكَرِيمِ، أَمَّا بَعْدُ،
﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ﴾
وَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ:
«ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ»
رَوَاهُ مُسْلِمٌ
সম্মানিত উপস্থিতি!
সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর জন্য, যিনি অন্ধকার পৃথিবীতে হেদায়েতের আলো নিয়ে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা:কে প্রেরণ করেছেন। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক সেই মহান রাসূলের ওপর, যাঁর আগমনে মানবতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যাঁর সুন্নাহ কিয়ামত পর্যন্ত নাজাতের পথনির্দেশ হয়ে থাকবে।
ঈদে মিলাদুন্নবী সা:পালন করা কি জায়েজ?❓
আজকাল রাসূলুল্লাহ সা:এর জন্মকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে জশনে জুলুস, শোভাযাত্রা, বিশেষ অনুষ্ঠান ও নানা আয়োজন করা হয়। কেউ এগুলোকে রাসূল সা:এর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ মনে করেন, আবার অনেক আলেম এসবকে শরিয়তে নতুন সংযোজন হিসেবে বিদআত বলে অভিহিত করেছেন।
তাহলে সত্য কোনটি?
আমরা আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়; বরং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের আমলের আলোকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করব।
রাসূল ﷺ-এর আগমন নিঃসন্দেহে রহমত
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন
﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ﴾
অর্থ:
আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।
সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭
রাসূলুল্লাহ সা:এর আগমন আমাদের জন্য মহান নিয়ামত। তাঁকে ভালোবাসা ঈমানের দাবি।
রাসূল ﷺ বলেছেন
«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
অর্থ
তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।”
(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
অতএব, রাসূল সা:কে ভালোবাসা নিয়ে কোনো মুসলমানের দ্বিমত থাকতে পারে না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো❓
ভালোবাসার পদ্ধতি কি আমাদের ইচ্ছামতো হবে, নাকি রাসূল ﷺ যেভাবে শিখিয়েছেন সেভাবেই হবে?
দ্বীন কি পূর্ণাঙ্গ হয়েছে?
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا﴾
অর্থ
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”
সূরা আল-মায়িদাহ: ৩
যে দ্বীন রাসূল ﷺ-এর জীবদ্দশাতেই পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেছে, সেই দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই তার দলিল থাকতে হবে।
কারণ দ্বীনের বিষয় মানুষের রুচি ও আবেগের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা নির্ভরশীল ওহি ও সুন্নাহর ওপর।
বিদআত সম্পর্কে রাসূল ﷺ-এর সতর্কবাণী
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ»
অর্থ:
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”
—সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮
আর রাসূল ﷺ আরও বলেছেন—
«وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ»
অর্থ:
“প্রত্যেক বিদআতই পথভ্রষ্টতা।”
—সহিহ মুসলিম: ৮৬৭
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—দুনিয়াবি নতুন জিনিসকে এই হাদিসের বিদআত বলা হচ্ছে না। মাইক, গাড়ি, মোবাইল বা মুদ্রণযন্ত্র ইত্যাদি দুনিয়াবি উপকরণ। আলোচনার বিষয় হলো—দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনো ইবাদত বা ধর্মীয় রীতি সংযোজন করা।
রাসূল ﷺ নিজের জন্মদিন কীভাবে স্মরণ করেছেন?
এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সহিহ হাদিস রয়েছে।
রাসূল ﷺ-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন—
«ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَيَوْمٌ بُعِثْتُ أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ»
অর্থ:
“এটি সেই দিন, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমাকে নবুয়ত দেওয়া হয়েছে অথবা আমার ওপর ওহি নাযিল হয়েছে।”
সহিহ মুসলিম: ১১৬২
খেয়াল করুন, রাসূল ﷺ তাঁর জন্মের দিনের কথা স্মরণ করেছেন এবং সোমবার রোজা রেখেছেন।
কিন্তু তিনি কি বলেছেন—
“আমার জন্ম উপলক্ষে প্রতিবছর উৎসব করো?”
“জশনে জুলুস বের করো?”
“শোভাযাত্রা করো?”
“একটি নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান করো?”
না।
বরং তাঁর নিজের আমল ছিল রোজা।
তাই জন্মের দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত যে আমলটি রাসূল ﷺ নিজে করেছেন, সেটিই আমাদের জন্য অধিক নিরাপদ ও সুন্নাহসম্মত পথ।
সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসা
সম্মানিত শ্রোতাবৃন্দ!
রাসূল ﷺ-কে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন কারা?
সাহাবায়ে কেরাম।
তাঁরা রাসূল ﷺ-এর জন্য নিজেদের জীবন, সম্পদ, পরিবার—সবকিছু উৎসর্গ করেছিলেন।
তাঁরা যদি মনে করতেন যে রাসূল ﷺ-এর জন্মদিন উপলক্ষে প্রতিবছর বিশেষ ধর্মীয় উৎসব, জশনে জুলুস বা শোভাযাত্রা করা তাঁর প্রতি ভালোবাসার শরিয়তসম্মত পদ্ধতি, তাহলে তাঁরাই সর্বপ্রথম তা পালন করতেন।
কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িনের যুগে এমন কোনো প্রমাণিত বার্ষিক মিলাদ-উৎসব বা জশনে জুলুসের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।
এখানেই চিন্তার বিষয়—
যে কাজটি রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার এত বড় মাধ্যম বলা হচ্ছে, তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমিক সাহাবাগণ কেন তা করেননি,
ভালোবাসার আসল প্রমাণ কী?
আল্লাহ তাআলা বলেন
﴿قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ﴾
অর্থ:
বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।”
—সূরা আলে ইমরান: ৩১
এ আয়াত আমাদের ভালোবাসার প্রকৃত মাপকাঠি শিখিয়ে দেয়।
ভালোবাসা শুধু মুখের দাবি নয়।
ভালোবাসার সত্যিকারের প্রমাণ হলো—অনুসরণ।
যে ব্যক্তি রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসে, সে তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসবে।
যে তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসে, সে তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করবে।
যে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে, তার ভালোবাসা শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং তার নামাজে, চরিত্রে, ব্যবসায়, পরিবারে, আচার-আচরণে এবং সমগ্র জীবনে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহর ছাপ ফুটে উঠবে।
🕋তাহলে জশনে জুলুস ও মিলাদ মাহফিলের হুকুম কী?
এখানে ন্যায়সঙ্গতভাবে বিষয়টি বুঝতে হবে।
যদি কোনো অনুষ্ঠানে
কুরআন তিলাওয়াত করা হয়,
রাসূল ﷺ-এর সীরাত আলোচনা করা হয়,
দরূদ শরিফ পাঠ করা হয়,
তাঁর চরিত্র ও সুন্নাহ আলোচনা করা হয়,
মানুষকে নেক আমলের দিকে আহ্বান করা হয়,
তাহলে এগুলোর প্রত্যেকটির আলাদা শরয়ি ভিত্তি রয়েছে।
কিন্তু যদি বলা হয়—
“রাসূল ﷺ-এর জন্ম উপলক্ষে প্রতিবছর নির্দিষ্ট দিনে এই বিশেষ ধর্মীয় উৎসব, জশনে জুলুস বা শোভাযাত্রা করা শরিয়তের নির্ধারিত সুন্নত ও ইবাদত
তাহলে এর পক্ষে কুরআন বা সহিহ হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায় না।
এই কারণেই বহু মুহাক্কিক আলেম এ ধরনের নির্দিষ্ট ধর্মীয় আয়োজনকে বিদআত হিসেবে গণ্য করেছেন।
🕋 ইসলামে নির্ধারিত ঈদ
রাসূল ﷺ বলেছেন—
«إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا، يَوْمَ الْأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ»
অর্থ:
“আল্লাহ তোমাদেরকে ঐ দুই দিনের পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন—কুরবানির দিন এবং ঈদুল ফিতরের দিন।”
সুনান আবু দাউদ: ১১৩৪
তাই ইসলামের নির্ধারিত ঈদ হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।
‘ঈদে মিলাদুন্নবী’কে শরিয়তের নির্ধারিত তৃতীয় ঈদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পৃথক শরয়ি দলিল প্রয়োজন।
শেষ কথা⛳
প্রিয় ভাইয়েরা!
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্ম আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তাঁর আগমন মানবতার জন্য রহমত।
তাঁকে ভালোবাসা ঈমানের দাবি।
তাঁর ওপর দরূদ পাঠ করা ইবাদত।
তাঁর সীরাত আলোচনা করা নেক কাজ।
তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা নাজাতের পথ।
কিন্তু সেই ভালোবাসাকে এমন কোনো ধর্মীয় পদ্ধতির মাধ্যমে প্রকাশ করা, যার নির্দিষ্ট শরয়ি ভিত্তি রাসূল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে ছিল না, সে বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে।
কারণ দ্বীন আবেগের বিষয় হলেও দ্বীনের বিধান আবেগ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে।
তাই আসুন—
শুধু রবিউল আউয়াল নয়, বছরের প্রতিটি দিন রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসি।
শুধু একদিন দরূদ নয়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরি।
শুধু জুলুস নয়, নিজের জীবনকে তাঁর আদর্শের মিছিলে পরিণত করি।
কারণ—
রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর ঘোষণা মুখের আওয়াজে নয়, জীবনের পরিবর্তনে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দিন এবং দ্বীনের মধ্যে প্রমাণিত বিষয়কে আঁকড়ে ধরে অপ্রমাণিত বিষয় থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন
আলোচনা: 🎙️
মাওলানা মুহাম্মদ সালাহউদ্দিন
শিক্ষার্থী : উলুমুল হাদিস (হাদিস বিষয়ক ভিবাগ)
হাটহাজারী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম