18/01/2017
বিগত শতাব্দীতে আমাদের দেশে যে কয়জন মহামনীষীর আবির্ভাব হয়েছে মাওলানা ইদ্রিস সন্দ্বীপি (রহ.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। যুগশ্রেষ্ঠ এই মহান সাধক বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের যে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন ইতিহাসে তা চির উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি শত শত মসজিদ, মাদ্রাসা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেছেন। হাজার হাজার হাফেজ,
আলেম, কারি ও ইসলামী গবেষক তৈরি করেছেন। এসলাহে নফ্স বা আত্মশুদ্ধির মেহনতের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের হৃদয় আলোকিত করেছেন।
★জন্ম :
হজরত মাওলানা ইদ্রিস সন্দ্বীপী (রহ.) ১৯৩১ সালে চারদিকে বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সন্দ্বীপের সন্তোষপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মুন্সী আব্দুল গণি। সাত ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছোট।
★শিক্ষাজীবন :
কালজয়ী এই আধ্যাত্মিক পুরুষ প্রাথমিক শিক্ষা নিজ গ্রাম সন্দ্বীপের সন্তোষপুরে অর্জন করেন। মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য সন্দ্বীপ কারামতিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তখন তাঁর বাবা ইন্তেকাল করেন। কিছুদিন পর জনম দুখিনী মা-ও ইন্তেকাল করেন। মা-বাবার ইন্তেকালে ব্যথিত হৃদয়ে এবং শোকাহত অন্তরে তিনি পড়ালেখায় পিছপা হননি। বরং শত কষ্ট বুকে চেপে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রেখে কোরআন- হাদিসের সোনালি পথ পাড়ি দেওয়া অব্যাহত রাখেন। ইতিহাসের এই মহান সাধক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন নোয়াখালী ইসলামিয়া মাদ্রাসায়। এরপর উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন। সেখানে চার বছর কৃতিত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করে দাওরায়ে হাদিস (টাইটেল) ডিগ্রি অর্জন করেন। তৎকালীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের কাছে হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান লাভ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন সমাপ্ত করার পর তিনি বিশ্ববরেণ্য আধ্যাত্মিক রাহবার আওলাদে রাসুল হজরত মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর কাছে তাসাউফ বা আত্মার সংশোধনের মেহনতে মনোনিবেশ করেন। হজরত মাদানী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে দীর্ঘ দুই বছর কঠোর পরিশ্রম করে আধ্যাত্মিকতার উচ্চশিখরে পৌঁছেন এবং খেলাফত লাভ করেন।
★কর্মজীবন :
হজরত মাওলানা ইদ্রিস সন্দ্বীপি (রহ.) কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতার মাধ্যমে। প্রথমে কিছুদিন তৎকালীন বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম সন্দ্বীপে এবং পরে কাঠগড় আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। এরপর নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘জামিয়া হোসাইনিয়া কাছেমুল উলুম সন্তোষপুর’। এখানে তিনি একনাগাড়ে ৩০ বছর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপালের পদ অলংকৃত করেন।
সন্দ্বীপের সবুজ পল্লীতে সুদীর্ঘকাল শিক্ষাদানের পর তিনি রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। এখানে এসে প্রথমে নরসিংদীতে ইসলামপুর মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ঢাকার কাঁচপুর-চিটাগাং রোড সংলগ্ন মাদানীনগর মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এর পাশাপাশি গাজীপুর, জামালপুর, শেরপুর, দিনাজপুুুুর, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় কয়েক শ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাটাখালীতে গড়ে তোলেন জামিয়া ওসমানিয়া রাজশাহী
নামে উত্তরবঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দ্বীনি শিক্ষার মারকাজ। মাদ্রাসাগুলো সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য তিনি ‘তালিমি বোর্ড মাদারিসে কওমিয়া আরাবিয়া’ নামে একটি স্বতন্ত্র বোর্ড গঠন করেন। যার কেন্দ্রীয় কার্যালয় দারুল উলুম মাদানীনগরে অবস্থিত। সারা দেশে আত্মশুদ্ধির মেহনতকে বেগবান করার লক্ষ্যে ‘তাহরিকে ইসলাহুল উম্মাহ’ নামে একটি আধ্যাত্মিক সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের উদ্যোগে প্রতি মাসে বিভিন্ন জেলায় ইসলাহি বয়ান ও আত্মশুদ্ধিমূলক অন্যান্য আমল পালিত হয় এবং প্রতিবছর মাদানীনগর মাদ্রাসায় ইসলাহি জোড় বা আত্মশুদ্ধির মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা ছাড়াও এই মহাসম্মেলনে ভারতের বিজ্ঞ আলেমগণ উপস্থিত থাকেন।
★মৃত্যু :
শতাব্দীর অন্যতম মহান সাধক, হাজার হাজার আলেমের উস্তাদ, আল্লাহর খাঁটি দরবেশ, আধ্যাত্মিক রাহবার হজরত মাওলানা ইদ্রিস সন্দ্বীপী (রহ.) সাত ছেলে, চার মেয়ে ও এক স্ত্রী রেখে, লাখ লাখ মুরিদান ও আলেম-ওলামাকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ২০০২ সালের ২০ রমজান সকালে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন।