01/06/2026
পাকিস্তান আমলে আগস্টের মাঝামাঝি দিকে ঢাবির টিএসসিতে একটা আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্যেশ্য ছিল শিক্ষা কমিশনের ব্যাপারে জরিপ করা।
তখন সবেমাত্র শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল।
এই আলোচনা সভায় বামপন্থীদের বিপরীতে যুক্তি তর্ক দেয়ার জন্যে রাখা হয়েছিল আব্দুল মালেককে।
বামপন্থীরা আব্দুল মালেককে কথা বলার তেমন একটা সুযোগই দেয়নি। নিজেরা নিজেরাই বক্তব্য রাখছিল। মনে হচ্ছিল তেমন একটা পাত্তাই দিচ্ছিল না তাকে।
তারপর সভার একদম শেষের দিকে যুক্তি তর্কের জন্যে মাত্র ৬ মিনিটের সময় দেওয়া হয় তাকে। বামপন্থীরা ভেবেছিল এই ছেলে আর কিইবা যুক্তি তর্ক দিবে?
কিন্তু আব্দুল মালেক ছেলেটা ছিল অসাধারণ বাগ্মী। যুক্তি তর্কে একদম দক্ষ। দেখতে আলাভোলা ঢাবির প্রাণ রসায়নের বিভাগের এই ছেলেটাই ওই ৬ মিনিটে প্রতিটা কথার পয়েন্ট বাই পয়েন্ট যুক্তি দিতে থাকে।
বামপন্থীদের প্রতিটা কথার বিপরীতে যৌক্তিক কাউন্টার পয়েন্ট উত্থাপন করে এবং ইসলামি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে সে।
আব্দুল মালেকের এমন তাত্ত্বিক ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য স্তব্ধ করে দেয় শ্রোতাদের। এতক্ষণ তাকে আলাভোলা ভাবা প্রতিটা শ্রোতা পর্যন্ত জোরে জোরে হাততালি দিতে থাকে।
মাত্র ৬ মিনিটের যৌক্তিক বক্তব্যেই পুরো সভার মোটিভ পুরোপুরি বদলে দেয় আব্দুল মালেক। উপস্থিত প্রতিটা শ্রোতাও আব্দুল মালেকের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে।
এতক্ষণ যেসব শ্রোতারা বামপন্থীদের কিছু যুক্তিতে সমর্থন দিয়েছিল তারাও আব্দুল মালেকের যুক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তার যুক্তির সমর্থনে চলে আসে।
এতে বামপন্থীরা মনে মনে ক্ষেপে যায়। যেই ছেলেকে ওরা এতক্ষণ পাত্তাই দিচ্ছিল না সেই ছেলেই এত মানুষের সমর্থন পাওয়ায় রাগে ক্ষোভে ফুসতে শুরু করে ওরা।
প্রাণ রসায়ন বিভাগের আলাভোলা এই ছেলেটা বেঁচে থাকলে বামপন্থীরা কখনোই যুক্ত তর্কে জিততে পারবে না, রাজনৈতিক সমর্থকও হারাবে এমনটা আঁচ করে বামপন্থী নেতারা।
তাই সভার শেষদিকে ওরা প্ল্যান করে আব্দুল মালেককে মেরে ফেলবে। মালেককে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেয়াটাই তখন তাদের কাছে সমাধান মনে হচ্ছিল।
তাছাড়া বামপন্থীদের হাতে তখন ক্ষমতাও ছিল তাই তারা আর এতকিছু ভাবেনি।
এরপর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আব্দুল মালেক যখন সভা শেষে তার সঙ্গীদের বিদায় দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল ঠিক তখনই আওয়ামী নেতা তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন গংরা হামলা চালায় আব্দুল মালেকের উপর।
তাদের প্রত্যেকের হাতে ছিল লোহার রড,হকিষ্টিক এবং আস্ত আস্ত ইট। বামপন্থী ওই স*ন্ত্রাসী নেতারা প্রথমে রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটাতে থাকে আব্দুল মালেককে।
সে হাত দিয়ে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু এতজনের সাথে আর পেরে উঠেনি।
তারপর ওরা আস্ত ইট দিয়ে আব্দুল মালেকের মাথা থেঁতলাতে শুরু করে। গলগল করে র*ক্ত পড়তে থাকে তার মাথা থেকে। অনেকক্ষণ র*ক্তাক্ত অবস্থায় সেখানেই অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে ছিল আব্দুল মালেকের দেহ।
পরে স্থানীয় কিছু ছাত্ররা তাকে দেখতে পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি করায়।কিন্তু মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ায় বাঁচতে পারেনি মেধাবী আব্দুল মালেক।
তিনদিন পর ১৫ আগস্টে প্রচন্ড কষ্টে , থেঁতলানো মাথা নিয়েই হাসপাতালে মারা গিয়েছিল তুখোড় মেধাবী ছেলে আব্দুল মালেক।
আব্দুল মালেক মারা যাওয়ার পর বামপন্থী নেতারা, আওয়ামী লীগের নেতারা তখন পার্টি করে সেই দিনটা উদযাপন করেছিল কেননা তাদের উদ্দেশ্যটা সফল হয়েছিল।
ঘটনাটা ১৯৬৯ সালের তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের।
ছাত্র সংঘের মেধাবী ছাত্র আব্দুল মালেক ছিল বগুড়ার ছেলে। প্রচন্ড মেধাবী এই ছেলেটা এসএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ডে ১১ তম এবং এইচএসসি পরীক্ষায় ৪র্থও হয়েছিল।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। ফজলুল হক হলের ১২২ নাম্বার রুমে থাকতো সে। আর মাত্র ১ বছর পরই অনার্স কমপ্লিট হয়ে যেতো কিন্তু তার আগেই নির্মমভাবে মেরে ফেলা হলো তাকে।
যেই বামপন্থী মেঘমাল্লাররা আজকে টকশোতে গিয়ে নীতিকথা শোনায় তাদের নেতারাই তখন একটা মেধাবী ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল।
যেই আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েলের মৃত্যুতে সবাই আজকে মায়াকান্না করছে সেই তোফায়েলই নিজ হাতে ইট দিয়ে থেঁতলে থেঁতলে একটা ছেলেকে মেরে ফেলেছিল।
ছেলেটার অপরাধ ছিল সে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলতো, ভালো যুক্তি তর্ক দিতে পারতো।
আব্দুল মালেকের পুরনো বন্ধুরা বলতো- মালেক প্রচন্ড মেধাবী এবং মিশুখে ছিল। দেখা হলেই হাসি হাসি মুখ করে কেমন আছে জিজ্ঞেস করতো।
মালেকের মা একবার পাশের বাড়ি থেকে ধার করে সবজি এনেছিল কিন্তু মালেক ছেলেটা এতটাই সৎ ছিল যে মাকে বলেছিল সেই সবজি ফেরত দিয়ে আসতে কারণ সেটা তো তাদের জমির না।
ছেলেটার স্বপ্ন ছিল জেনারেল শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি কিভাবে ইসলামী শিক্ষাটাকেও অগ্রসর করা যায়, কিভাবে দেশের জন্যে কিছু করা যায়, মানুষের জন্যে কিছু করা যায়।
কিন্তু তার আগেই পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো তাকে। স্বপ্নটাও আর পূরণ হলো না ছেলেটার।
আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েল মন্ত্রী থাকা অবস্থায় বহু নিরপরাধ মানুষের উপর জুলুম করেছে, অত্যাচার করেছে, ভোট চুরি করে অসংখ্যবার নির্বাচনে জিতে বহু মানুষকে গুম করেছে, খু*ন করেছে।
রক্ষীবাহিনীর প্রধান থাকা অবস্থায়ও এই তোফায়েল ২৫ হাজারেরও বেশি মুক্তিযুদ্ধাকে নির্মমভাবে হ*ত্যা করেছে, ক্ষমতার দাপটে গ্রাম ঘেরাও করে বহু মেয়েদের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছে, পাষবিকভাবে ধ*র্ষণ করেছে।
আব্দুল মালেকের অসহায় মা টাও ছেলে হ*ত্যার বিচার চেয়ে বছরের পর বছর দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, আদালতে কতবার যে কান্নাকাটি করেছে কিন্তু বিচারটুকুও পায়নি কারণ তোফায়েল তখন মন্ত্রী ছিল ,প্রচুর ক্ষমতা ছিল।
আজকে এই তোফায়েলের মৃত্যুতে সবাই আহাজারি করছে, মায়াকান্না করছে।
অথচ যেদিন রাতে একজন অসহায়ের মায়ের ছেলের মাথা ইট দিয়ে থেঁতলে থেঁতলে মেরে ফেলা হয়েছিল সেদিন কেউ মুখ খুলেনি, আহাজারিও করেনি।
ইসলামী শিক্ষার উন্নয়নে নিজের জীবনটাকে অকাতরে বিলিয়ে দেয়া অসহায় মালেকের কথাটাও কেউ আর মনে রাখেনি
-