03/07/2026
প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আধিপত্যবাদের অভিযোগ:
একটি বিশ্লেষণ
সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের সাথে ভারতের সম্পর্কের অবনতি লক্ষণীয়। এই দেশগুলোর ভারতবিমুখতার মূল কারণ হিসেবে দিল্লির ‘বন্ধুত্বের আড়ালে আধিপত্যবাদী নীতি’ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ সামনে আসছে। ভারতের এই আগ্রাসী আচরণের বিভিন্ন দিক নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি:
ট্যুরিস্ট ভিসার মতো সাধারণ সেবাকে অনেক সময় গোপন উদ্দেশ্য হাসিলের উপায় হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।
(ক). প্রশিক্ষণ ও এজেন্ট নিয়োগ: ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে প্রভাব বিস্তারকারী গোষ্ঠী বা এজেন্টদের প্রশিক্ষণ প্রদান।
(খ). গোপন মিশন: কূটনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় মিশনের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতিতে হস্তক্ষেপমূলক গোপন কার্যক্রম পরিচালনা।
(গ). রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র: বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক এজেন্ডা বা কৌশলগত ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত করা।
(ঘ). অর্থ পাচার: ট্যুরিজমের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ ভারতে পাচার হচ্ছে।
২. সামাজিক ও অবকাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ
ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাদের সক্ষমতাকে দুর্বল করে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে:
(ক). চিকিৎসা খাতে সিন্ডিকেট: বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবাকে ভারতের ওপর কৌশলে নির্ভরশীল করে তোলা এবং দালাল চক্রের মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট গড়ে তোলা।
(খ). সাংস্কৃতিক ও মিডিয়া আগ্রাসন: নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তাকে খর্ব করে মিডিয়ার মাধ্যমে জনমতকে ভারতের অনুকূলে প্রভাবিত করার চেষ্টা।
(গ). সাইবার ও তথ্যগত প্রভাব: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী বিষয়ে গোপন প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।
৩. অর্থনৈতিক শোষণ ও বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা।
ভারতের অর্থনৈতিক নীতি প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থানীয় শিল্প ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে:
(ক). বাণিজ্যিক অসমতা: দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি এবং ভারতীয় পণ্যের একচেটিয়া আধিপত্যের ফলে দেশীয় শিল্পের বিকাশে বাধা সৃষ্টি ও বাংলাদেশের শিল্প ও বানিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা।
(খ). সম্পদ লুণ্ঠন ও শোষণ: শিল্প ও বাণিজ্যের প্রতিটি পর্যায়ে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোকে শোষণের মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
৪. ভূ-রাজনৈতিক ও সমরকৌশলগত নিয়ন্ত্রণ
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরোধ ক্ষমতা যেন গড়ে না ওঠে, সেই লক্ষ্যে ভারত সক্রিয় রয়েছে:
(ক). সমরনীতিতে হস্তক্ষেপ: বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা বা সমরনীতিতে অবৈধ হস্তক্ষেপ করে তাদের সামরিক শক্তিকে পঙ্গু করে রাখা।
(খ). সীমান্ত ইস্যু: সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অবৈধ পণ্য ও পরিকল্পিত মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে দেশের আইন-শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলা ও বাংলাদেশের যুব সমাজ কে ধ্বংস করার মহা পরিকল্পনা।
(গ). পানির ন্যায্য হিস্যা: অভিন্ন নদীগুলোর পানির সঠিক বণ্টন না করার মাধ্যমে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মধ্যে ফেলা ও বর্ষা মৌসুমে পানি সন্ত্রাস সৃষ্টি করে বাংলাদেশের কৃষি ফসল, গবাদিপশুসহ মানুষের জীবন পর্যন্ত ধ্বংস করে দেয়া।
উপসংহার
অভিযোগ রয়েছে যে, ভারত বন্ধুরাষ্ট্রগুলোকে উন্নয়নের অংশীদার করার চেয়ে তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারে বেশি আগ্রহী। ভারত কেবল অর্থনৈতিক শোষণে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতি, শিল্পনীতি,সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সমরনীতিতে অবৈধ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দেশগুলোকে প্রতিনিয়ত অস্থিরতার মধ্যে রেখে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের কৌশল অবলম্বন করে আসছে। এই আধিপত্যবাদী মনোভাবই মূলত ভারত ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট তৈরি করেছে এবং দীর্ঘদিনের মিত্রদের ভারত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।