02/06/2026
সন্তানরা বুয়েটের শিক্ষক, সরকারের যুগ্ম সচিব, ঢাবির শিক্ষক! বাহ! সমাজের কী দারুণ উচ্চবিত্ত, অভিজাত পরিবার! কিন্তু এই তথাকথিত 'সফলতার' ভেতরে লুকিয়ে থাকা কুৎসিত সত্যটা উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে। আমরা সন্তানদের জিপিএ-৫ পাওয়াচ্ছি, বড় বড় ডিগ্রি দিচ্ছি, কিন্তু তাদের 'মানুষ' বানাতে পারছি না।
"অধিকার হারানোর গল্প এবং আমাদের কিছু 'শিক্ষিত' অমানুষেরা..."
মিরপুরের মা নুরজাহান বেগমের ৭ দিন ধরে পচে যাওয়া লাশের খবরটা পড়ার পর থেকে অনেকের মত আমারও ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। আমিও তো কোনো এক মায়ের সন্তান। একটা দীর্ঘশ্বাস আর তীব্র ধিক্কার বের হয়ে আসছে, আমরা আসলে পড়াশোনা করে, 'আধুনিক' হয়ে কী তৈরি হচ্ছি? মানুষ, নাকি শিক্ষিত রোবট?
আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতার কথা বলি। সন্তান যখন ছোট থাকে, তখন মা-বাবা বুক ফুলিয়ে অধিকার নিয়ে কথা বলেন। নিজের পেটে পাথর বেঁধে, সব শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেন। কিন্তু সেই সন্তান যখন তথাকথিত ‘প্রতিষ্ঠিত’ হয়, যখন একটা বড় চাকরি পায়, কিংবা বিয়ে করে ঘরে নতুন বউ নিয়ে আসে, তখন নাটকীয়ভাবে মা-বাবার সেই জন্মগত অধিকারটুকু হারিয়ে যায়!
যে মা-বাবা আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, সন্তান বড় হতেই তারা যেন সেই সংসারে ‘উচ্ছিষ্ট’ বা 'বোঝা' হয়ে যান। বৃদ্ধ বয়সে এসে তারা নিজের সন্তানের সাথে একটু থাকতে চাইলেও, সেই দাবিটা অধিকার নিয়ে প্রকাশ করতে পারেন না। এক ধরনের অপরাধী বা পরগাছার মতো গুটিয়ে থাকতে হয় তাদের। কথা বলতে গেলে পাছে 'আধুনিক' সন্তানের 'ব্যক্তিগত স্বাধীনতায়' (Privacy) আঘাত লাগে! সন্তান আর তার বউয়ের মর্জির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয় জন্মদাত্রীকে।
কী ভয়ানক এক মানসিক দাসত্ব আর নিষ্ঠুরতার মধ্য দিয়ে যান আমাদের প্রবীণেরা! ক্যারিয়ার, কর্পোরেট লাইফ আর বিজনেস মাইন্ডসেটের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা এতটাই অন্ধ যে, একই ছাদের নিচে পাশের ঘরে মা মরে পচে কঙ্কাল হয়ে যায়, অথচ আমাদের সুশীল নাসিকায় সেই গন্ধ পৌঁছায় না!
মনে রাখবেন, আজ আপনি বড় অফিসার বা বড় ডিগ্রিধারী হতে পেরেছেন, কারণ আপনার মা-বাবা নিজের জীবনটা আপনার পেছনে ইনভেস্ট করেছিলেন। আজ আপনি আপনার আধুনিক স্ত্রী আর বিলাসী জীবন নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু ভুলে যাবেন না, আপনার সন্তানও কিন্তু এই দৃশ্যগুলো দেখছে। প্রকৃতির বিচার বড় নিষ্ঠুর। আজ আপনি আপনার মা-বাবাকে যে একাকীত্ব আর অবহেলা উপহার দিচ্ছেন, সুদে-আসলে তা আপনার বার্ধক্যে আপনার কাছেই ফিরে আসবে।
আল্লাহর দোহাই লাগে, তথাকথিত এই আধুনিকতার লেবাস ছেড়ে একটু মানুষ হোন। ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড় থামিয়ে আজই মায়ের পাশে গিয়ে বসুন। পায়ের নিচে মাটি থাকতে থাকতে মায়ের পা ছুঁয়ে ক্ষমা চান। নইলে যেদিন আপনার মা-ও এভাবে কোনো এক ফ্ল্যাটে লাশ হয়ে পড়ে থাকবেন, সেদিন আপনার ওই বড় বড় ডিগ্রি আর কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স কেবল আপনার মুখের ওপর থুতু ছেটাবে।
ক্ষমা করবেন মা নুরজাহান বেগম। আপনার এই পচাগলা লাশ আমাদের এই অন্ধ, বধির আর আধুনিক সমাজের কপালে এক জ্বলজ্বলে কলঙ্কের তিলক এঁকে দিয়ে গেল।
#সামাজিক_অবক্ষয় #বিবেকের_আদালত #মা_বাবা #নুরজাহান_বেগম #অমানুষ_সমাজ