Narail District Administration
- Home
- Bangladesh
- Narail
- Narail District Administration
নড়াইল জেলা প্রশাসনে আপনাদের সবাইকে স্বাগতম
Address
DC Office
Narail
General information
জেলার পটভূমি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদদের মধ্যে নড়াইলের নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। কিংবদন্তী আছে যে নড়িয়াল ফকিরের আর্শিবাদপুষ্ট নড়ি হতে নড়াইল নামের উৎপত্তি হয়েছে। নবাব আলিবর্দী খাঁ এর শাসনামলে তার এক কর্মচারী মদনগোপাল দত্ত নৌকা যোগে স্বপরিবারে কিসমত কুড়িগ্রাম আসেন। এখানে তিনি কচুরীর ধাপের উপর ধ্যানরত অবসহায় একজন ফকিরকে দেখতে পান । তিনি নড়িয়াল ফকির। মদনগোপাল দত্ত নত হয়ে তার আর্শিবাদ কামনা করেন। ফকির প্রীত হয়ে তাকে তার হাতের নড়ি (লাঠি) উপহার দেন এবং ঐ এলাকা আবাদ করার নির্দেশ দেন (লাঠিকে সহানীয় ভাষায় নড়ি বলে অভিহিত করা হয়)। ফকিরের আর্শবাদ পুষ্ট হয়ে তিনি কুড়িগ্রামে বসতি সহাপন করেন এবং ধীরে ধীরে ঐ এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ হয়। নড়িয়াল ফকিরের আর্শীবাদপুষ্ট তাই নাম হয় নড়িয়াল। পরবর্তীতে লোকমুখে বিকৃত হতে হতে নড়িয়াল থেকে নড়াইল নামের উৎপত্তি হয়েছে। গবেষক এস,এম রইস উদ্দীন আহমদ এর মতে লড়েআল হতে নড়াইল নামের উৎপত্তি হয়েছে। যারা শক্রর বিরদ্ধে নড়াই করে সহানীয় ভাষায় তাদের লড়ে বলে । হযরত খান জাহান আলীর সময়ে রাজ্যের সীমান্তে সীমান্ত প্রহরী নিয়োজিত ছিল। নড়াইল এলাকা নদী নালা খাল বিল বেষ্টিত । খাল কেটে রাজ্যের সীমান্তে পরীখা তৈরী করা হত। খাল বা পরীখার পাশে চওড়া উচু আইলের উপর দাড়িয়ে লড়ে বা রক্ষী সেনারা পাহারা দিত। এভাবে লড়েআল হতে লড়াল > নড়াইল নাম এর উৎপত্তি হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে আরেকটি প্রচলিত মত হল নড়ানো থেকে নড়াইল নামের উৎপত্তি হয়েছে। বাংলাদেশে অনেক স্থানের নামের সাথে ইল প্রত্যয় যুক্ত আছে যেমন টাঙ্গাইল, ঘাটাইল, বাসাইল, নান্দাইল ইত্যাদি। প্রত্যোকটি সহানের নামকরণের ক্ষেত্রে কিছু কিংবদন্তী বা লোক কাহিনী প্রচলিত আছে। একটি বড় পাথর সরানোকে কেন্দ্র করে নড়াল বা নড়াইল নামের উৎপত্তি বলে কেউ কেউ মনে করেন ১৮৬১ সালে যশোর জেলার অধীন নড়াইল মহাকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। নড়াইল শব্দটি স্থানীয় লোকমুখে নড়াল নামে উচ্চারিত হয়। ঐ সময় নড়াইল সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া থানার সমন্বয়ে এই মহাকুমা গঠিত হয় । পরবর্তীতে আলফাডাঙ্গা থানা এবং অভয়নগর থানা এই মহাকুমা ভূক্ত হয়। ১৯৩৪ সালে প্রশাসনিক সীমানা পূর্নগঠনের সময় অভয়নগরের পেড়লী, বিছালী ও শেখহাটি এই তিনটি ইউনিয়নকে নড়াইল জেলা ভূক্ত করে অবশিষ্ট অভয়নগর যশোর জেলা ভূক্ত করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্থান সৃষ্টির সময় এই মহাকুমায় চারটি থানা ছিল । ১৯৬০ সালে আলফাডাঙ্গা থানা যশোর হতে ফরিদপুর জেলা ভূক্ত হয় । ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ নড়াইল মহাকুমাকে জেলায় রুপান্তরিত করা হয় । প্রথম জেলা প্রশসাক ছিলেন ম শাফায়াত আলী।১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ নড়াইল মহকুমার প্রশাসক জনাব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর নেতৃত্বে অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ, জনাব আব্দুল হাই এবং অন্যান্যদের সহযোগিতায় নড়াইল ট্রেজারীর তালা ভেঙ্গে অস্ত্র নিয়ে যশোর সেনানিবাস আক্রমণের মধ্যে দিয়ে এ জেলার মানুষের মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয়। অগনিত মুক্তি যোদ্ধার রক্ত এবং অনেক অত্যাচারিত , লাঞ্চিত মা-বোনদের অশ্রু ও সংগ্রামের ফলে ১৯৭১ সনের ১০ ডিসেম্বর নড়াইল হানাদার মুক্ত হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে নড়াইল জেলার বিশেষ অবদান রয়েছে। নড়াইল জেলা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুক্তিযোদ্ধা অধ্যুসিত জেলা। এ জেলা হতে প্রায় ২০০০ জন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে। দেশের ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠর একজন মরহুম ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ নড়াইলের কৃতি সন্তান। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে শাহাদাৎ বরণকারীর সংখ্যাও একেবারে কম নয়। পাকহানাদার বাহিনী কর্তৃক চিত্রা নদীর পাড়ে লঞ্চঘাটের পল্টুনের উপর ২৮০০ লোককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নড়াইল জেলার আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অতীত ও বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সত্যিই সে ছিলো এক মধুর যুগ যখন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু -বান্ধব পরস্পর পরস্পরের সান্নিধ্য কামনা করতো। তাই অতীতে আত্মীয় ও বন্ধুবাড়ী বেড়ানো একটা সাধারণ রেওয়াজের মধ্যে গণ্য হতো। এ উপলক্ষে চলতো আদর আপ্যায়ন ও মেহমানদারীর ধুম। অতীতে এ জেলায় প্রচুর খাদ্য ফলতো এবং জিনিস পত্রও ছিলো খুব সস্তা। মানুষের থাকতো গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ এবং গোয়াল ভরা গরু। শীতকালে যথেষ্ট খেজুর রস হতো এবং ঐ রস দিয়ে গুড় তৈরী হতো প্রচুর পরিমাণে। আর হতো নানা প্রকার পিঠে, যার রেওয়াজ আজকাল প্রায় উঠে গেছে বললেই চলে। তাই অতীতের লোকেরা বেশ সুখে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করতো। অতীতে নড়াইল জেলায় ‘কড়ির’ প্রচলন ছিলো। ভারত মহাসাগরের মালদ্বীপ ও লাক্ষা দ্বীপ হতে এসব কড়ি আমদানী করা হতো। পয়সা দিয়ে বাজার কড়ি কিনতে পাওয়া যেতো। এর পাঁচটির মূল্য ছিলো এক পয়সা। স্বল্প মূল্যের জিনিসপত্র এই কড়ির বিনিময়ে বেচাকেনা করা হতো। প্রাচীনকাল হতে শুধু এই নড়াইল জেলায়ই নয় গোটা ভারতবর্ষেই এই নিয়ম প্রচলিত ছিলো। অবসর সময়ে লোকেদের ‘ইউসুফ-জুলেখা’, ‘সোনাভান’, ‘গোলেবা কাওয়ালী’, ‘পূরাণ’, ‘গীতা’ ‘মহাভারত’ প্রভৃতি পুঁথি ও ধর্মগ্রন্থ পড়ার এবং রাত জেগে তাদের কেচ্ছা বলার রেওয়াজ অতীতে যথেষ্ট ছিলো। গিন্নীরা তাড়াতাড়ি রান্না খাওয়ার কাজ সেরে একত্রে জমায়েত হতো এবং পুঁথি পড়নেওয়ালাকে দাওয়াত করে এনে গভীর মনোযোগ সহকারে ঐ সকল পুঁথি পড়া শুনতো। তাই অতীতে যারা পুঁথি পড়তে পটু ছিলো সমাজে তাদের আদরের অন্ত ছিল না। সেকালের লোকেরা যেমন ‘ধুয়া’ ও ‘জারী’ গান শুনতো তেমনি আবার সড়কি ও লাঠি খেলাও শিক্ষা করতো। তাই মনে হয়, সেকালে লোকেরা শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পশ্চাতে পড়ে থাকলেও জীবন যাত্রা নির্বাহে তারা বর্তমানের তুলনায় অনেক সুখ ও স্বাচ্চন্দ্য ভোগ করতো। একালের মতো সেকালে বিভিন্ন সমস্যাও ছিলোনা এবং জীবন যুদ্ধে তাদের ক্ষতবিক্ষতও হতে হতো না। বর্ষাকালে নৌকা করে আত্মীয় বাড়ী বেড়ানো অতীতে গ্রামাঞ্চলের একটা সাধারণ রেওয়াজের মধ্যে গণ্য হতো। তাই বর্ষাকালে আউশ ধান ঘরে তোলার পর গেরস্ত বৌরা ‘নইয়রে’ যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়তো। তারপর একদিন ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁরা একটি নৌকা করে বাপের বাড়ী গিয়ে উপস্থিত হতো। সেখানে কয়েকদিন ফুর্তি আমোদ করে, নিকটবর্তী আত্মীয় বাড়ী বেড়িয়ে পরে তারা নিজ বাড়ীতে ফিরে আসতো। সব থেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিলো ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের উৎসব। এতদঞ্চলের প্রতিটি মুসলমানের ঘরে বাইরে আনতো আনন্দ উল্লাসের এক মহা ঢেউ। গরু, খাঁসি জবাই করে গ্রামের মাতব্বর, চেয়ারম্যান এবং ধনিক শ্রেণীর লোকেরা আপামর জনসাধারণকে পেট পুরে খাওয়ায়ে পূণ্য হাসিল করার সাথে সাথে বুকভরা আনন্দ তৃপ্তি লাভ করতো। তাদের সাথে সাথে জেলার মজলূম জনতাও ক্ষণিকের জন্যে হলেও জান্নাতি সুখ লাভ করতো। কিন্তু এখন এর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে লোকে আজকাল অধিক আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে তাদের মনের সেই কোমল বৃত্তি দয়ামায়া ও মহব্বৎ ক্রমান্বয়ে উঠে যাচ্ছে। আত্মীয়-কুটুম বাড়ী বেড়াতে তারা আর পূর্বের মতো উৎসাহ বোধ করছে না। আজকাল চিত্রা, কাজলা, নবগঙ্গা ও মধুমতির স্রোতধারা ও উচ্ছল তরঙ্গমালার সেই যৌবনত্ব হারিয়ে গেছে বলেই জেলার বিলাঞ্চলও শুকিয়ে গেছে। সম্ভবতঃ সেই কারণেই নাইয়রে বেড়ানোও বর্তমানে বহুলাংশে কমে গেছে। সমাজ পরিবর্তনে এবং কালের চক্রে সাথে সাথে আজ জেলার বহু উৎসবাদি এবং আমোদ-প্রমোদ বিস্মৃতি প্রায়। অতীতে বিভিন্ন পালাপর্বণে নানা প্রকার উৎসবাদি এবং আমোদ প্রমোদের গ্রামীণ ব্যবস্থা ছিল। যেমন ঘোড় দৌড়, এড়ে লড়াই, নৌকা বাইচ কুস্তি ইত্যাদি। কোনো কোনো নির্দিষ্ট দিনে পূর্ব ঘোষণা করা ছাড়া অধিকাংশ অনুষ্ঠান সংগঠিত হতো। কতকাল পূর্ব থেকে আনন্দ অনুষ্ঠান গুলির সূচনা তা অনুমান করা কঠিন। ফাল্গুন চৈত্র মাসে ঘোড় দৌড়, বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে গরু দৌড় এবং এড়ে লড়াই, ভাদ্র-আশ্বিন মাসের ভরা নদীতে নৌকা বাইচ, আশ্বিন-কার্তিক মাসে কুস্তি লড়াই ইতাদি বহুল প্রচলিত ছিলো। আজ নড়াইল জেলার গ্রামীণ আনন্দ উৎসবগুলি প্রায় বিলুপ্তির পথে। আধুনিককালে এগুলির স্থান অধিকার করে চলেছে হকি, ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট, ফুটবল, ক্যারাম, হাডুডু, বাস্কেটবল প্রভৃতি পাশ্চাত্য দেশীয় আনন্দ উপকরণগুলি। অতীতে জেলার পুরুষেরা ‘কটকে ধুতি’ নামে একপ্রকার পোষাক পরতো আর গায়ে দিতো ‘এক পাট্রা’ নামে একফালি কাপড়। মেয়েরা পরতো ‘ডুমো’। এটা ছিল সিলাইবিহীন দু’খানা লুঙ্গীর ন্যায় কাপড়। অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা আদিম গোছের শার্ট এবং জুতো ব্যবহার করতো। কিন্তু হাসির ব্যপার হলো এই যে তাঁরা যখন আত্মীয়ের বাড়ীতে কিংবা বিয়েশাদীতে কুটুম বাড়ীতে যেতেন তখন জামা খুলে ঘাড়ে এবং জুতা খুলে হাতে করে নিয়ে যেতেন। সম্ভবতঃ ঘামে ভিজে এবং ধুলো লেগে নষ্ট হওয়ার ভয়েই তাঁরা এরূপ করতেন। মূলতঃ তাদের জীবন ছিলো অত্যন্ত সহজ সরল এবং নিড়াম্ভরপূর্ণ। বৃটিশরা এদেশে এসে তাদের পোষাক-পরিচ্ছদ প্যান্ট-শার্ট এবং আধুনিক মেয়েলী ড্রেসপত্র প্রচলন করে। মোট কথা জেলার আজকের সভ্যতা ও সংস্কৃতি ইংরেজদেরই দান। অতীতে এখানকার জনসাধারণ ততো শিক্ষিত না হলেও শিক্ষা ও শিক্ষকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবান ছিলেন। গুরুজনদের যে সম্মান ছিলো তা আজকালে কল্পনা মাত্র। আবার পড়া না হলে বা ফাঁকি দিলে শিক্ষকরা তা আদায় করে ছাড়তেন। পিটুনির ভয়ে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বাড়ী গিয়ে পালালে প্রধান শিক্ষক সাহেব একদল ছাত্র পাঠিয়ে তাকে চেংদোলা করে স্কুলে ধরে আনতেন এবং পড়া আদায় করে ছাড়তেন। ছাত্রদের অভিভাবকরাও এ ব্যাপারে শিক্ষকদের পূর্ণ সহযোগিতা করতেন এবং সন্তানদের প্রতি স্নেহ পরবশ হয়ে কখনও তাদের পক্ষালম্বন করতেন না। কিন্তু বর্তমানে হয়েছে এর সম্পূর্ণ উল্টো। ছাত্র তাদের অভিভাবককে সাথে করে আসে। শিক্ষককে বেশি বলতে দেখা যায়। তাই আজকালকার ছাত্র সমাজ নকল ও চাকুর বদৌলতে বোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকখানা চাপড়া রূপ শিক্ষিতের সার্টিফিকেট পেলেও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। অভিভাবকরা শিক্ষিত সন্তানদের দ্বারা পরিত্যক্ত ও মাঝে মধ্যে লাঞ্ছিত হয়ে থাকেন। অতীতে কেউ মেট্রিক পাশ করলে গ্রাম সমেত লোক তাকে দেখতে আসতো। কিন্তু আজকাল ষ্ট্যান্ড করলেও তেমনভাবে আর গ্রাম ভেঙ্গে লোকজন দেখতে আসে না। ছাত্র মানে আজ সমাজের চক্ষুশুল। দেশটাকে গোল্লায় দিলো এরাই। মূলতঃ ছাত্র সমাজ আজকের সমাজে নিগৃহীত এবং গ্রাম-গঞ্জে ও পথে ঘাটে লাঞ্ছিত ও অপমানিত। এটা একটা জাতির ধ্বংসের পূর্ব লক্ষণ। অতীতে জেলার জনসাধারণের মধ্যে রাজনীতির চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কেরই অধিক মূল্য ছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক দিয়ে একের থেকে অন্যের মত ভিন্ন রূপ হওয়া স্বাভাবিক | কিন্তু তাই বলে নিজের মতে যেহেতু অন্য কেউ এক হচ্ছেনা সেহেতু তাকে দুনিয়া থেকেই বিদায় দিতে হবে, এ কোন ধরণের কথা? এরূপ পৈশাচিক মনোভাব এই সেই দিন পাকিস্তান আমলেও ছিল না। ১৭৫৭ সালে আমরা স্বাধীনতা হারাই। বেনিয়া গোষ্ঠী ইংরেজ আমাদের ওপর চেপে বসে। বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন আমাদের কৃষির ওপর তারা হাত রাখে। রাজদন্ড কেড়ে নেয়ার পর আমাদের প্রাণটুকুও ছিনিয়ে নেয়ার পায়তারা করে। ধানের চাষের পরিবর্তে তারা আমাদের কৃষকদের ‘নীল চাষ’ করতে বাধ্য করে তাদের কথা না শুনলে কৃষকদের সর্বস্ব লুন্ঠন করতে থাকে। তাদের পোষা গোন্ডাবাহিনী বরকন্দাজদের অত্যাচারে নড়াইল জেলা সহ গোটা বাংলার মানুষই অতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। কৃষকদের এনে নীলকুঠির চত্বরে পিঠমোড়া করে বেঁধে বেদম প্রহার করতে থাকে, চাবুকের আঘাতে যখন তাদের শরীর রক্তাক্ত হয়ে যেতো তখন তাকে ন্যাড়া করে মাথায় কাদা রাখতো এবং ঐ কাদায় নীলের বীজ বুনতো। চারা গাছ না বের হওয়া পর্যন্ত তাকে রোদ নিয়ে সহ্য করে ঐ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। সত্যিই সে ছিলো এক মর্মান্তিক কাহিনী। শুধু তাই-ই-নয়, এই নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে কোন সুন্দরী বাংগালী মেয়েরই বাড়ীর বাইরে আসার উপায় ছিল না। নীলকর সাহেবদের গোয়েন্দা বাহিনীর ভয়ে তাদের সর্বক্ষণ ভীত সন্ত্রস্ত থাকতে হতো। যদি নীল কুঠিয়ালরা জানতে পারতো তা হলে অমনি একটি পাল্কি পাঠিয়ে দিতো আনার জন্য। মেয়েকে সাহেবদের নির্দেশ মতো না পাঠালে নীলকরদের অত্যাচারে গোটা পরিবারই ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যেতো। এমনি অমানুষিক নির্যাতন চলতে থাকে সুদীর্ঘ একশো বছর ধরে। ফলে শুধু এই নড়াইল জেলাতেই নয়, পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার গোটা জনসাধারণই দারম্নণভাবে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এর ফলে ১৮৫৮, ১৮৬১ এবং ১৮৮৯ খৃষ্টাব্দে পর পর তিনটি বিদ্রোহের সূচনা হয়। নীলকর সাহেবরা এবার প্রমাদ গুণলো। এখন থেকে তারা ভাবতে লাগলো, তাদের পোষা গুন্ডাবাহিনী বরকন্দজরা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্যে যথেষ্ট নয়। তাই তারা পরিকল্পনা পাল্টানোর জন্যে নূতন করে বৃটিশ সরকারের কর্মকর্তাদের সাথে শলা-পরামর্শে মিলিত হলো এবং এক বলিষ্ঠ ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করলো। এখন থেকে তারা বিত্তশালী কিছু শিক্ষিত লোককে স্বার্থের লোভ দেখিয়ে দলে ভিড়ালো এবং আইন প্রণয়ন করে এদের সাথে একটা সমঝোতায় এলো। ফলে এমনিভাবে সৃষ্ট একটি জমিদার শ্রেণী নীলকুঠিয়ালদের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হলো। জেলার কৃষক পরিবারের প্রধান ফসল ধান ফলাতে না পারায় তারা না খেয়ে মরতে লাগলো। জমি বিক্রি করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এবং মেয়ে বিয়ে দিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যেতে লাগল। আর জোতদার ও জমিদারেরা তাদের জমি কিনে নিতে লাগল। এমনিভাবে নড়াইল জেলার কৃষক পরিবার ধ্বংস হয়ে যেতে লাগল। একদা যাদের ছিল গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ আজ তারা ভিখারীতে পরিণত হলো। তাদের স্নেহের সন্তান সন্ততি তাদেরই সামনে একমুঠা অন্নের অভাবে ক্ষুধার যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে অকাল মৃতুবরণ করলো। বাংলাদেশের চারজন ডক্টরেট মিলে লিখিত বাংলাদেশের ইতিহাসে এর যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন তা পড়লে অশ্রু সংবরণ করা যায় না। মুসলমানদের কাছ থেকে কুচক্রী ইংরেজ এদেশের রাজদন্ড কেড়ে নেয়। এজন্যে তাঁরা ইংরেজদেরকে মোটেই সহ্য করতে পারতোনা। তারপর যখন তাদের মসলিনের মতো শিল্প এবং বাংলার কৃষকদের ধ্বংস করে তখন তাদের ক্রোধ আরো বেড়ে যায়। ইংরেজরাও ব্যাঘ্রজাতি মুসলমানদের অত্যন্ত ভয় করতো। যার ফলে তাদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে অসহায় করে রাখারও সর্বদা প্রচেষ্টা চালায়। যাবতীয় সরকারী চাকুরী থেকে তাদেরকে বহিষ্কার করে প্রচলিত রাষ্ট্রভাষা ফার্সীর পরিবর্তে ইংরেজরা ইংরেজী চালু করে। মুসলমানরা অভিমান করে বিশ্বাস ঘাতক এই ইংরেজদের ভাষা শিক্ষা করা প্রত্যাখান করে। সন্তান-সন্ততিদেরকেও ইংরেজী শিক্ষা অর্জন করা থেকে বিরত থাকে। ফলে তারা আরো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। এভাবে তারা শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাই হারালো না সেইসাথে হারালো আরো বড় বড় রাষ্ট্রীয় পোস্ট, সামাজিক স্টাটাস এবং বেঁচে থাকার এতোটুকু অবলম্বন। হিন্দু সমপ্রদায়ের লোকেরা সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে। ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে রাষ্ট্রের শুণ্য বড় বড় পদে অভিষিক্ত হতে থাকেন। ফলে তাদের উন্নতি দ্রুততর থেকে দ্রুততর হতে থাকে। এখন থেকে এরাই হতে লাগলো (ক) জোতদার, (খ) গাতিদার এবং (গ) জমিদার শ্রেণী। নড়াইল জেলায় এ ধরণের সৌভাগ্যশালী যারা ছিলেন তারা হলেন কালিয়ার সেন, লোহাগড়ার রায়, মজুমদার ও সরকাররা, কাশিপুরের মুখপাধ্যায় ও চট্টপাধ্যায়রা, কচুবাড়িয়ার সমাদ্দাররা, লক্ষ্মীপাশার ব্যানার্জি, মুখার্জী ও চক্রবর্তীরা, জয়পুরের ঘোষ ও ব্যানার্জিরা, মল্লিকপুরের ভট্টাচার্যরা, কোটাকোলের সরকাররা, ইতনার ঘোষেরা, ভট্টাচার্যরা ও সেনেরা এবং ধোপাদহের মিত্ররা। অদ্যাবধি যে সকল প্রাচীন ব্যক্তিবর্গ জীবিত আছেন, তারা বলেন ঐ সকল বংশের লোকরাই জজ, ব্যারিস্টার, উকিল, মোক্তার এবং বড় বড় সরকারী চাকুরিজীবি ছিলেন। বিভিন্ন পূঁজা পার্বনে এরা যখন ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে বাড়ীতে আসতেন তখন নড়াইল জেলা এক অপরূপ বর্নাঢ বর্ণে সজ্জিত হতো। বিশেষ করে দূর্গা পূঁজার সময় যে কী ষোড়শী রূপসীর ন্যায় বধু বেশে সজ্জিত হতো তা ভাষায় ব্যক্ত করা কঠিন। অতীতে জেলায় মুসলমানদের অস্তিত্ব খুব কমই ছিল। উল্লেযোগ্যর ভিতর ছিলো মহিশাহপাড়ার মিঞা, গাজী, খাঁ, আড়িয়ারার দেওয়ান ও ফকির পরিবার, লাহুড়িয়ার সৈয়দ পরিবার এবং রাজুপুরের মোল্লারা। মোল্লাদের মতো ধনাঢ্য ও প্রতাপশালী মুসলমান অন্য কেউ ছিল না। সুলতানী আমল থেকেই তাদের অত্যন্ত দাপট ছিলো। লক্ষ্মীপাশার মোল্লার মাঠ এবং মোল্লারবাগ আজও তাদের ধনাঢ্যতার ও বদান্যতার স্মৃতি বহন করে চলেছে। অথচ আজ এর সম্পূর্ণ বিপরীতটাই লক্ষনীয়। বর্তমানে মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং নেতৃত্বস্থানীয়। অতীতে বর্তমান এই জেলার জনসাধারণের মধ্যে যে সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠা পরিলক্ষিত হতো আজ তা নেই বললে চলে। জেলার মিষ্টান্নদ্রব্য ও দুধ এতই সস্তা ও খাঁটি ছিল যে, সুদুর ভারত পর্যন্ত এর সুনাম ছিলো। এককালে এই জেলা ভাত ও মাছের অঞ্চল হিসেবে খ্যাত ছিলো। বড় বিল এবং নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। ‘যশুরে কৈ’ বলে লোভনীয় কৈ মাছের আবাসস্থল ছিলো এই জেলায়। চাচুড়ি বিল, কুমড়ী বিল, নালিয়ার বিল, আমাদার বিল, পাচুড়িয়ার বিল, নলডাঙ্গার (ইতনার), চাড়ার দিঘীবিল প্রভৃতি বিলে এই মাছ অঢেল পাওয়া যেতো। আর মধুমতিতে পাওয়া যেতো রূপালী রং এর সাদা চকচকে তাজা ইলিশ। আগের মতো এখন আর পাওয়া যায় না। বিল গুলো শুকিয়ে যাওয়ায় এখন আর সেই কৈও নেই। মধুমতির ইলিশের সেই প্রাচুর্যও নেই। নড়াইল কালিয়া ও লোহাগড়া বাজারে গেলে এখন মনে হয় আমি কাতার কুয়েত কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বা লন্ডনের কোন বাজারে বাজার করতে এসেছি। দাম শুনলে চমকে উঠতে হয়। মূলতঃ জেলার অতীতের আর্থ সামাজিক অবস্থা থেকে আজকের অবস্থা লক্ষ ফারাক। বর্তমানে বিশ্ব এগিয়ে চলেছে আধুনিক প্রযুক্তির শিখরে। তার ফলে এ জেলার গ্রামাঞ্চলে আর্থ সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। প্রায় গ্রামে বিদ্যুৎ টেলিভিশনসহ আধুনিক অনেক কিছুর সুযোগ পাচ্ছে মানুষ। জেলার অনেক গ্রামের যুবক কর্মসংস্থানের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছুটে চলছে।
Alerts
Be the first to know and let us send you an email when Narail District Administration posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.
Contact The Organization
Send a message to Narail District Administration: