28/12/2025
প্রায়শই যে ভুলটা করা হয়— কারো স্ত্রী ব্যভিচার কিংবা পরকিয়াতে লিপ্ত অবস্থায় ধরা পড়লে তাদের বিয়ে দেয়া হয় শাস্তিস্বরূপ! বাস্তবে এখানে অনেকগুলো ভুল সিদ্ধান্ত কাজ করে৷
ভুল সিদ্ধান্ত: কারো স্ত্রী ব্যাভিচারে ধরা পড়লে তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়া!
সংশোধন: কারো স্ত্রী ব্যভিচার বা পরকিয়াতে লিপ্ত হলে তালাক হয়ে যায়না। (আল-বাহরুর রায়েক-৩/১১৫) তাই তারা ধরা পড়লে তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ বিয়ে পড়িয়ে দেয়াটা হারাম কাজ। কেননা সে ব্যভিচার করে থাকলেও সে অন্যের বউই থাকে। ফলে অন্যের বউকে আরেকজনের সাথে বিয়ে দেয়া হারাম। এ বিয়ে হয়না। বরং তাদের এভাবে বিয়ে দিয়ে সারাজীবনের ব্যভিচারের সুযোগ করে দেয়া হয়। এমনকি যদি ব্যভিচারের খবর জানার পর স্বামী যদি সে নারীকে তালাকও দিয়ে দেয়, তবুও তার ইদ্দত পালন করা আবশ্যক। (সূরা বাকারা:২২৮) ইদ্দতের ভেতর বিয়ে দিলেও বিয়ে হবে না। (সূরা বাকারা:২৩৫) মনে রাখবেন যারা এমন বিয়ে দেয়, এমন বিয়ে পড়ায় তারা সকলে হারামে লিপ্ত। তাদের দ্বারা যতদিন এমন ব্যভিচার চলবে, ততদিন বিয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ব্যভিচারের গুনাহের অংশ পেতে থাকবে। (সূরা নূর:১৯) সুতরাং এমন বিয়ে হলে তারা যেন পৃথক হয়ে যায়।
ভুল সিদ্ধান্ত: ব্যভিচারী স্ত্রীর স্বামীকে জোর করে তালাকে বাধ্য করা।
সংশোধন: স্ত্রী ব্যভিচার করলে যদিও তালাক দেয়া বৈধ। কিন্তু বাধ্যতামূলক না। সালিশী পরিষদ তাকে তালাক দিতে বাধ্য করতেও পারে না। (আল-বাহরুক রায়েক-৩/১১৫, শামী-৬/৪২৭)
ভুল সিদ্ধান্ত: যেনা ব্যভিচারে ধরা পড়লে বিয়ে দেবার শাস্তি
সংশোধন: যেনা ব্যভিচারের নির্দিষ্ট শাস্তি রয়েছে। তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর করবে। (শামী-৬/৫৪৯) এবং তা শরীয়তসম্মত পন্থায় প্রমাণিত হতে হবে। (হিন্দিয়া-২/১৪৩, শামী-৪/৭-৮)
তাদের শাস্তি হল- অবিবাহিত ব্যক্তি যেনা করলে একশতটি বেত্রাঘাত। (সূরা নূর:২) আর বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচার করলে পাথর মেরে মৃত্যুদন্ড। (বুখারী-৬৪৪২) কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ছাড়া কেউ তা ব্যক্তিগতভাবে বা সালিশ-পঞ্চায়েত গঠন করে কার্যকর করা যাবে না। (বাদায়েউস সানায়ে-৭/৫৭ ) সেক্ষেত্রে ভিন্ন শাস্তি প্রদান করা যেতে পারে যা অন্যদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক হয়। কেননা শাস্তির উদ্দেশ্য শুধু তাদেরকেই অপমান করা নয়, বরং অন্যদেরকেও সতর্ক করে দেয়া। শাস্তি প্রদানের অধিকার আদালতের। তাই আদালতে মামলা করে শাস্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ভুল সিদ্ধান্ত: বিয়ে দেয়াকে ভাল শাস্তি মনে করা।
সংশোধন: ব্যভিচার বা পরকিয়াতে ধরা পড়লে বিয়ে দেয়াটা ভাল শাস্তি নয়, বরং যেনা ব্যভিচারের প্রতি আকৃষ্ট করার পন্থা যা শয়তানের উদ্ভূত বলেই মনে হয়। কারণ- এতে করে ভয় তো আসবেই না, বরং উৎসাহিত হবে। কেননা, যারা যেনা ব্যভিচার করবে, তারা এ চিন্তা করবে যে, ধরা পড়লেও সমস্যা নেই, আমাদের যে আশা “বিবাহ” তা বাধা কাটিয়ে সম্পন্ন করে দেয়া হবে। যা প্রস্তাব দিয়ে কাজ হতো না, তা যেনার দ্বারা কাজ হবে। ফলে বহু যুবক যুবতী যেনা ব্যভিচারের দিকে ঝুঁকে পড়বে আরোও বেশি! অথচ শাস্তি এমন হওয়া উচিৎ যা দৃষ্টান্তমূলক ও শিক্ষণীয় হয়, যেন ভবিষ্যতে সে কাজ করতে ভয় পায়, ভাবনা আসে।
ভুল সিদ্ধান্ত: টাকার জরিমানা আরোপ করা।
সংশোধন: কোন গোত্র বা গ্রামের কয়েকজন মুরুব্বি সালিশে টাকার জরিমানা আরোপ করতে পারবে না। এমন টাকা নিয়ে থাকলে তা গরিব দুঃখীদের মাঝে বন্টন নয়, বরং যাদের টাকা তাদেরকে ফেরত দিয়ে দিতে হবে। (বিন্নৌরীটাউন করাচী ফতোয়া-144207200901)
ভুল সিদ্ধান্ত: সালিশে সীমাবহির্ভূত ক্ষমতার চর্চা
সংশোধন: “ভুলটি হল- গ্রাম্য সালিশের সীমাবহির্ভুত ক্ষমতা চর্চা। নিজেদের এলাকার কোনো বিরোধ, জটিলতা, অসামাজিকতা ও অন্যায় প্রতিরোধে ন্যায়সঙ্গত ও সমঝোতামূলক পদক্ষেপ নেয়াই সালিশগুলোর প্রধান কাজ। কোনোভাবেই শাস্তি বা দন্ড কার্যকর করা তাদের কাজ হতে পারে না। এটা সালিশের ক্ষমতার বাইরের বিষয়। এর জন্য রাষ্ট্রের বিচারবিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ রয়েছে। বিজ্ঞ মুফতীগণ বলেছেন, ফতোয়ার ভিত্তিতে কোনো প্রকার দন্ড ও ফৌজদারি শাস্তি কার্যকর করতে পারে না কোনো গ্রাম্য সালিশ।” (মাসিক আল-কাউসার; বর্ষ-৭, সংখ্যা-৩)
সালিশ থেকে এ ঘোষণা আবশ্যকীয়ভাবে করে দেয়া উচিৎ যে, “সাধারণ মুসলমানেরা সতর্কবার্তা ও তিরস্কার স্বরূপ এমন দুশ্চরিত্র ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক, সালাম-কালাম ও মেলামেশা ইত্যাদি বর্জন করবে এবং যতক্ষণ না সে তওবা করে এবং তার তওবার আন্তরিকতা আলামত দ্বারা বোঝা যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ বজায় রাখবে।” (বিন্নৌরীটাউন করাচী ফতোয়া-144207200901)
শাস্তি প্রদানের জন্য এলাকার মুরুব্বিগণ আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন।
🌹
মুফতি রাকিবুল ইসলাম হোযায়ফী
প্রধান মুফতি (Jurisconsult) ও পরিচালক,
মারকাযুল বাইয়্যিনাত ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার
দাওরা ও ইফতা, দারুল ঊলূম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম
জাস্টিস কোর্স (Online), ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আমেরিকা