15/08/2026
শিবির বিদ্বেষী থেকে যেভাবে শিবিরের সাথী হলাম
১৮ আগস্ট ২০২৪। তখন আমি নবম শ্রেণির ছাত্র। নানির বাড়িতে বেড়াতে বগুড়া গিয়েছিলাম। আমার দুই বছরের বড় মামাতো ভাই তখন ইসলামী ছাত্রশিবিরের একজন সাথী এবং সৈয়দ আহমদ সরকারি কলেজ শাখার তৎকালীন অফিস সম্পাদক ছিলেন।
একদিন ওদের মেসের পাশের একটি দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যাওয়ার পথে সাংগঠনিক মেসে উঠলাম। তখন আমি ছিলাম শিবিরের একজন চরম বিদ্বেষী। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি—শিবির মানেই সন্ত্রাস, রগ কাটা, ভয়ঙ্কর একটি সংগঠন। এমনকি মনে করতাম, "ওরা যদি রগ কাটে, তাহলে পুলিশও ওদের রগ কেটে দিক!" মামাতো ভাইয়ের সঙ্গেও এসব নিয়ে প্রায়ই তর্ক করতাম। আমি তখন কওমি মাদরাসায় পড়তাম, আর সে আলিয়া ধারার ছাত্র ছিল। নানা ধরনের কথা বলে আমি তাকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করতাম এবং শিবির ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিতাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সে কখনো রাগ করত না; অত্যন্ত ধৈর্য ও নম্রতার সঙ্গে সব কথা শুনে যেত।
সেদিন হঠাৎ আমি তাকে বললাম, "চলো, তোমাদের সভাপতির সঙ্গে দেখা করি। দেখি, শিবির আসলে কেমন!"
সে আমাকে কলেজ শাখার সভাপতির কাছে নিয়ে গেল এবং বলল, "ভাই, এটা আমার ফুফাতো ভাই। ও শিবির দেখতে চায়।"
সভাপতি ভাই আমার দিকে মুচকি হেসে নিজের দিকে ইশারা করে বললেন, "এই যে দেখেন, এটাই শিবির! শিবির তো আপনার মতোই মানুষ। শিবির দেখার আবার কী আছে?"
এই একটি বাক্য আমার অন্তরকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। মুহূর্তেই যেন দীর্ঘদিনের সব বিদ্বেষ গলে গেল। আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম, যাদের সম্পর্কে সারাজীবন এত নেতিবাচক কথা শুনেছি, তারা তো বাস্তবে এত সুন্দর ব্যবহার করে! সেই অমায়িক আচরণই আমার চিন্তার জগৎ বদলে দিতে শুরু করল।
এরপর মামাতো ভাইয়ের রিপোর্ট বই দেখলাম। সংগঠনের কার্যক্রম সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেলাম। শিবিরের প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল। দুই দিন পর আমি নিজেই তাকে বললাম, "আমি শিবির সম্পর্কে আরও জানতে চাই।" সে আমাকে কয়েকটি বই পড়তে দিল—"এসো আলোর পথে", "মুক্তির পয়গাম", "কী, কেন, কীভাবে চাই" এবং "তরুণ তোমার জন্য"। বইগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ার পর আমার মনে আর কোনো দ্বিধা রইল না। আমি তাকে বললাম, "আমি শিবির করতে চাই। কী করতে হবে?" সে বলল, "নাটোরে গিয়ে স্থানীয় থানা বা শহর শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করো।"
নাটোরে ফিরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সংগঠনের কোনো দায়িত্বশীল ভাইয়ের সন্ধান পাচ্ছিলাম না। অবশেষে একদিন ফেসবুকে 'নাটোর শিবির', 'ছাত্রশিবির নাটোর জেলা' ইত্যাদি লিখে খুঁজতে গিয়ে একটি গ্রুপ পেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, গ্রুপটি পরিচালনা করছে আমার পূর্বের হেফজখানার সহপাঠী মাসউদ—যার সঙ্গে আমি একসঙ্গে হাফেজ হয়েছিলাম।
তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। আলহামদুলিল্লাহ, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে আমি সংগঠনের সমর্থক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি। এক মাস পর কর্মী হই, আর এক বছর পর আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে সাথী হওয়ার তাওফিক লাভ করি। সেখান থেকেই শুরু হয় আমার সাংগঠনিক পথচলা, যা আজও অব্যাহত রয়েছে।
আজ আমি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি আমার সেই মামাতো ভাইকে, তার কলেজের সভাপতিকে, বন্ধু মাসউদকে এবং এনএস সরকারি কলেজ শাখার তৎকালীন সেক্রেটারি ও অফিস সম্পাদক ভাইদের। তাঁদের আন্তরিকতা, সুন্দর আচরণ এবং দাওয়াতই আমার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে এবং আমাকে এই পথে আসতে অনুপ্রাণিত করেছে।
সবশেষে, আমার জীবনের এই অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল ভাইদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে তাঁর দ্বীনের পথে দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করার তাওফিক দান করেন। আমীন।
নাম: মোঃ মাহদী হাসান
সাংগঠনিক মান: সাথী
শাখা: এনএস সরকারি কলেজ, নাটোর
শ্রেণী: এসএসসি পরীক্ষার ফলপ্রার্থী
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: নাটোর সুগার মিলস উচ্চ বিদ্যালয়