11/06/2026
বজ্রপাতের মৌসুমে আমরা কতটুকু প্রস্তুত?
বজ্রপাত অত্যন্ত শক্তিশালী একটি প্রাকৃতিক শক্তি যা স্বল্প পরিসরে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় তৈরি করার সক্ষমতা রাখে। এর উচ্চশক্তি সম্পন্ন বৈদ্যুতিক ক্ষমতা এবং উচ্চমাত্রার তাপ, আক্রান্ত স্থান বা বস্তুকে বর্ণনাতীত ক্ষতিসাধন করতে পারে। বিজ্ঞান বলছে, বজ্রপাত কয়েক মিলি সেকেন্ড বা কয়েক মাইক্রো সেকেন্ডে ১০ থেকে ৩০ কোটি ভোল্ট শক্তি নিয়ে আঘাত করে, যেখানে আমরা আমাদের বাড়িতে ২২০ ভোল্টের বিদ্যুৎ ব্যবহার করি! বজ্রপাতে প্রায় ৩০০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ শক্তি থাকে যা সূর্যের উপরিভাগের তাপমাত্রার চেয়ে ৫ গুণ বেশি!
চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, বজ্রপাত যদি সরাসরি কোন ব্যক্তির উপরে আঘাত করে, তবে মৃত্যু প্রায় অবধারিত। আর বজ্রপাত যদি সরাসরি যদি আঘাত না করে বরং এর পরোক্ষ বৈদ্যুতিক প্রবাহ ব্যক্তির শরীরে আঘাত করে, তবে মৃত্যুর ঝুঁকি কম হতে পারে। স্বল্প সময়ের এই বৈদ্যুতিক প্রবাহ যদি মস্তিষ্ক এবং/অথবা হৃদপিণ্ড দিয়ে প্রবাহিত হয় তাহলেই কেবল মৃত্যু ঘটে। বিশেষ ব্যতিক্রম না হলে শরীরের অন্য কোন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হলে মৃত্যুর ঘটনা নাও ঘটতে পারে।
গবেষণা বলছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এপ্রিল থেকে জুন মাস বজ্রপাতের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়েছে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হবে কিনা বিষয়টি আতঙ্কের সাথে কৌতুহল সৃষ্টি করে।
সরকারি ভাবে সুনির্দিষ্ট কোন ডাটাবেজ না থাকলেও, বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে আনুমানিক ১১০ থেকে ১২০ জন মানুষ বজ্রাঘাতে মারা গিয়েছে। পরিসংখ্যান এও বলছে যে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত, এই হার বেড়ে গিয়ে ২/৩ গুন পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে।
এখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন চলে আসে, হঠাৎ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই মৃত্যুহার কেন এত বেড়ে গিয়েছে বা যাচ্ছে, যেখানে উন্নত বিশ্বে প্রযুক্তির যৌক্তিক ব্যবহারের ফলে বজ্রঘাতে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন কমছে।
বজ্রপাতে মৃত্যুঝুঁকি কতগুলো নিয়ামকের উপর নির্ভরশীল, যেমন, ১। আবহাওয়া ও জলবায়ু, ২। অবস্থান, ৩। আচরণ ও অভ্যাস, ৪। সুরক্ষা ব্যবস্থা, ৫। চিকিৎসা প্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য। গত কয়েক দশকের পরিবর্তিত জলবায়ু এমন এক আবহাওয়ার সৃষ্টি করেছে যা সরাসরি বজ্রপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে, বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে বজ্রঘাতে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। ভৌগলিক অবস্থান এবং আক্রান্তের অবস্থান বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যাকে প্রভাবিত করে। যেমন, বাংলাদেশের হাওড় অঞ্চলগুলোতে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। বজ্রঝড়ের সময় বাইরে কাজ করা, সতর্কবার্তা পেলেও উপেক্ষা করা, বিদ্যুৎ পরিবাহী বস্তু সঙ্গে রাখা, অসতর্কতা ও অজ্ঞতাবশত উঁচু স্থান, যেমন, বড় গাছ, বৈদ্যুতিক টাওয়ার বা উঁচু কোন স্থাপনার কাছে আশ্রয় নেওয়া, বজ্রপাতে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও, বজ্রনিরোধক দন্ড এর সঠিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা না করা, নিরাপদ ভবন বা আশ্রয়কেন্দ্রের স্বল্পতা এবং গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা কম থাকা বজ্রপাতে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
এই সার্বিক বিষয় বিবেচনায় পুরুষ ও কর্মজীবী মানুষ, বিশেষ করে, কৃষক, জেলে ও খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
উন্নত বিশ্বে, বজ্রপাতের ঝুঁকি রয়েছে এমন অঞ্চলে বজ্রপাত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সমুদ্র সৈকত, খোলা মাঠ বা পার্ক সহ অন্যান্য যেকোনো খোলা জায়গায় আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়-যেটি বাংলাদেশের নেই বললেই চলে বা থাকলেও অত্যন্ত অপ্রতুল। বাংলাদেশেও এমন আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে কাজ করতে গিয়ে কৃষকেরা বজ্রাঘাতের শিকার হয়। তাই, এমন ফসলের মাঠে কংক্রিটের ছোট আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলা আবশ্যিক। দেশের অনেক অঞ্চলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেচের ব্যবস্থা করা হয়। প্রয়োজন হলে ওই সেচ পাম্পের ঘরের সাথেই এমন আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে বজ্রপাতের পূর্বাভাস যে কোন মূল্য সম্ভাব্য আক্রান্ত স্থানে উপস্থিত ব্যক্তিকে অবহিত করা এবং সেটি মেনে বাধ্যতামূলকভাবে আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বজ্রাঘাতে আক্রান্ত ব্যক্তির তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রান্তিক পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও, প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সকল হাসপাতালে বজ্রাঘাতে আহত ব্যক্তির উন্নত চিকিৎসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর ব্যাপারে আবহাওয়া ও জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে আটকে দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশ কৃষকের দেশ, বাংলাদেশ জেলের দেশ, বাংলাদেশ খেতে খামারে কাজ করা শ্রমজীবীদের দেশ। সুতরাং দেশের ওই জনগোষ্ঠীকে ঘরে আটকে রাখাও সম্ভব নয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সচেতনতামূল ও পূর্ব প্রস্তুতিমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করে বজ্রপাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতেই পারে, তাৎক্ষণিকভাবেই যেতে পারে। এটি এখন সময়ের দাবিই বটে।