21/05/2026
রামিসা যেন এই দেশের শেষ রামিসা হয়… 💔
মঙ্গলবার। ২০ মে ২০২৬।
সকাল সাড়ে দশটা।
ঢাকা শহরের ব্যস্ত এক এলাকা — মিরপুর পল্লবী।
মানুষ অফিসে যাচ্ছে, বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে, কোথাও রান্নার ধোঁয়া উঠছে, কোথাও টিফিন বক্স গোছানো হচ্ছে।
সবকিছুই ছিল একদম স্বাভাবিক।
সেই স্বাভাবিক সকালেই আট বছরের ছোট্ট রামিসা আক্তার তার বড় বোন রাইসাকে এগিয়ে দিতে বের হয়েছিল।
দ্বিতীয় শ্রেণির কোমলমতি একটি শিশু।
যে বয়সে বাচ্চারা পুতুল নিয়ে খেলে, আঁকিবুঁকি করে, স্কুল শেষে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়ে — সেই বয়সে রামিসা পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম নিষ্ঠুরতার শিকার হলো।
মা পারভীন আক্তার তখন রান্নাঘরে।
বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতিতে।
সতেরো বছরের পরিচিত একটি বাসা।
একটি ভবন, যেখানে সবাই সবাইকে চিনতো।
যেখানে পাশের দরজার মানুষ মানেই ছিল নিরাপত্তা, বিশ্বাস, আপনজনের মতো সম্পর্ক।
কিন্তু হঠাৎ রামিসা নেই।
মা দরজার বাইরে এসে দেখলেন —
মেঝেতে পড়ে আছে ছোট্ট একটি জুতা…
শুধু একটি জুতা…
একজন মা তখনই বুঝে যান, পৃথিবীতে কোনো অস্বাভাবিক কিছু ঘটে গেছে।
তিনি পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়েন।
বারবার।
আরও জোরে।
আরও আতঙ্ক নিয়ে।
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে না।
শুধু এক ভয়ঙ্কর নীরবতা।
তারপর ৯৯৯।
পুলিশ।
দরজা ভাঙা।
আর তারপর যা পাওয়া গেল, তা কোনো সভ্য সমাজের ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
খাটের নিচে পড়েছিল ছোট্ট রামিসার নিথর দেহ।
শৌচাগারে পাওয়া যায় তার বিচ্ছিন্ন মাথা।
একটি শিশু…
একটি নিষ্পাপ প্রাণ…
যে সকালে হয়তো মাকে বলেছিল, “আম্মু, আমি আসছি…”
সে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এভাবে পৃথিবী থেকে মুছে গেল!
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা — ধর্ষণের পর হত্যা।
অভিযুক্ত পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা, পেশায় রিকশা মেকানিক।
যে মানুষটিকে হয়তো প্রতিদিন সিঁড়িতে দেখা হতো।
যাকে দেখে কখনো সন্দেহ হয়নি।
যার পাশ দিয়ে শিশুরা নির্ভয়ে হেঁটে যেত।
এই ঘটনায় শুধু একটি শিশু মারা যায়নি।
মারা গেছে মানুষের ওপর মানুষের বিশ্বাস।
মারা গেছে নিরাপত্তাবোধ।
মারা গেছে “পাশের বাসা নিরাপদ” — এই ধারণা।
আজ বাংলাদেশের অসংখ্য মা সন্তানকে বাইরে খেলতে দিতে ভয় পান।
মাদরাসায় পাঠাতে ভয় পান।
স্কুলে পাঠাতে ভয় পান।
এমনকি নিজের ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে দাঁড়াতেও ভয় পান।
কারণ আমরা এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে গেছি,
যেখানে শিকারির চেহারায় কোনো চিহ্ন থাকে না।
সে প্রতিবেশী হতে পারে।
পরিচিত হতে পারে।
বিশ্বাসভাজন হতে পারে।
একজন বাবা সকালে মেয়েকে স্কুলের জন্য তৈরি করে দিয়েছিলেন।
দুপুরে সেই বাবাকে নিজের সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে হয়েছে।
এই কষ্ট কোনো ভাষায় লেখা যায় না।
এই শোক কোনো রাষ্ট্রের বিবৃতিতে শেষ হয় না।
এই কান্না রাতের পর রাত একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়।
আর আমরা?
আমরা কয়েকদিন স্ট্যাটাস দিই।
কিছু হ্যাশট্যাগ লিখি।
তারপর আরেকটি নতুন ঘটনার অপেক্ষা করি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে —
আর কত রামিসা?
আর কত শিশু?
আর কত বাবা-মা এভাবে শেষ হয়ে যাবে?
বাংলাদেশে আইন আছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন আছে।
মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে।
ট্রাইব্যুনালের ঘোষণা আছে।
গেজেট আছে।
প্রেস ব্রিফিং আছে।
কিন্তু বাস্তবে বিচার কোথায়?
মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
সাক্ষী হারিয়ে যায়।
প্রভাবশালীরা চাপ দেয়।
আসামিরা জামিনে বের হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
আর ভুক্তভোগী পরিবার একসময় নীরবে ভেঙে পড়ে।
শিশু সুরক্ষার নামে সভা হয়, সেমিনার হয়, ব্যানার টাঙানো হয় —
কিন্তু রাস্তায় নিরাপত্তা কোথায়?
আমাদের দাবি স্পষ্ট—
▪️ শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার জন্য বাধ্যতামূলক ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল।
▪️ সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে রায়।
▪️ আপিলসহ সর্বোচ্চ ৬ মাসে কার্যকর বিচার।
▪️ মামলা তুলে নিতে চাপ দিলে কঠোর শাস্তি।
▪️ প্রতিটি ভবনের নতুন পুরুষ ভাড়াটিয়ার পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক।
▪️ প্রতিটি স্কুলে “Good Touch & Bad Touch” শিক্ষা বাধ্যতামূলক।
▪️ প্রতিটি থানায় শিশু সুরক্ষা ডেস্ক ও নারী কর্মকর্তা।
▪️ প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তাকে জাতীয় জরুরি ইস্যু হিসেবে ঘোষণা।
এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়।
এগুলো একটি সভ্য রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব।
আজ রামিসার মা হয়তো বারবার তার ছোট্ট জামাগুলো বুকে চেপে ধরছেন।
হয়তো বারবার ভাবছেন —
“যদি আরেকটু আগে দরজাটা খুলতাম…”
“যদি তাকে একা যেতে না দিতাম…”
কিন্তু সত্য হলো —
দোষ কোনো মায়ের না।
দোষ একটি অসুস্থ সমাজের।
দোষ সেই বিচারহীনতার, যা অপরাধীদের সাহসী করে তোলে।
আজ প্রতিটি বাবা তার মেয়েকে দেখে আতঙ্কিত।
প্রতিটি মা রাতে সন্তানের পাশে ঘুমিয়ে বারবার উঠে তাকান।
কারণ রামিসা শুধু একটি নাম নয়।
রামিসা আজ বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর মুখ।
ছোট্ট রামিসার জন্য দোয়া রইল। 🤲
আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ স্থানে স্থান দেন।
তার কবরকে নূরে ভরে দেন।
তার মা-বাবাকে এমন ধৈর্য দান করুন, যা মানুষের পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব।
আর এই নিষ্পাপ শিশুটির রক্ত যেন অন্তত এই দেশের ঘুমিয়ে থাকা বিবেক