22/06/2026
পানি– যা সভ্যতার প্রাণ, তা-ই কেন মানবজাতির আদিমতম স্মৃতিতে সর্বগ্রাসী ধ্বংসের প্রতীক? মেসোপটেমিয়ার ধুলোমাখা কিউনিফর্ম ফলক থেকে শুরু করে হিন্দু পুরাণ কিংবা সুদূর আন্দামানের আদিবাসী লোককথায় ঘুরেফিরে আসা মহাপ্লাবনের এই আখ্যান কি কোনো ঐতিহাসিক সত্য, নাকি মানবমনের এক অভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত?
'প্রাচীন সভ্যতা ও প্রত্নতত্ত্ব' বইয়ের আলোচ্য অধ্যায়টি গিলগামেশ মহাকাব্যকে সূত্র ধরে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নেরই ব্যবচ্ছেদ করেছে। শুধু একটি প্রাচীন মিথের বর্ণনা নয়, বরং প্রত্নতত্ত্ব, সমাজবিদ্যা ও মনঃসমীক্ষণের বিভিন্ন স্তর উন্মোচন করে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে একটি স্থানীয় ভৌগোলিক দুর্যোগ ধীরে ধীরে পুরো বিশ্বের মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকারে পরিণত হলো।
আখ্যানের শুরুটা গিলগামেশের অমরত্বের সন্ধান দিয়ে হলেও এর ভরকেন্দ্র দ্রুতই দার্শনিক বাস্তবতা ও ঐতিহাসিক প্রমাণে স্থানান্তরিত হয়। বন্ধু এনকিদুর মৃত্যুতে শোকাহত রাজা যখন বুঝতে পারেন অমরত্ব কোনো জাদুকরী ঐশ্বরিক দান নয়, বরং মানুষের সৃজনশীল কর্ম আর স্মৃতির মধ্যেই এর বাস, তখন প্রাচীন উপকথাটি যেন আধুনিক অস্তিত্ববাদের সাথে হাত মেলায়। এরপরই আসে ১৮৪০-এর দশকে ইরাকের মরুভূমিতে ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিকদের যুগান্তকারী আবিষ্কারের প্রসঙ্গ। কাদামাটির ফলকে বাইবেলের নোয়ার আখ্যানের চেয়েও প্রাচীন এক প্লাবনের বিবরণ পশ্চিমা ধর্মতাত্ত্বিক জগতে যে ধাক্কা দিয়েছিল, লেখক তার পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি বেশ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
ভৌগোলিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই মিথের উৎপত্তি খোঁজার চেষ্টাটি বেশ যৌক্তিক। প্রাচীন মানুষের কাছে তাদের ছোট নদীকেন্দ্রিক নগররাষ্ট্রটিই ছিল 'সমগ্র বিশ্ব'। তাই স্থানীয় কোনো বড় বন্যা যখন তাদের চেনা লোকালয় ভাসিয়ে নিত, সেটি তাদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই ছিল জগৎ ধ্বংসের সমতুল্য। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেই ভয়ংকর ট্রমা অতিরঞ্জিত হয়ে বৈশ্বিক মহাপ্লাবনের রূপ পেয়েছে।
তবে সমালোচনার জায়গা থেকে দেখলে, এই বৈশ্বিক মিথের বিস্তারের যুক্তিতে কিছু অস্পষ্টতা রয়ে যায়। লেখক 'কালচারাল ডিফিউশন' বা বাণিজ্যের মাধ্যমে গল্প ছড়িয়ে পড়ার কথা বলেছেন, যা মেসোপটেমিয়া থেকে হিব্রু বাইবেল পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যাখ্যা হিসেবে মানানসই। কিন্তু আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সমাজগুলোতেও ঠিক একই গল্প কীভাবে জন্ম নিল, তার উত্তর কেবল 'সব প্রাচীন সভ্যতাই নদীকেন্দ্রিক ছিল'—এই সাধারণীকরণ দিয়ে পুরোপুরি দেওয়া সম্ভব নয়। 'ব্ল্যাক সি ফ্লাড হাইপোথিসিস' বা বরফযুগ শেষের জলোচ্ছ্বাসের মতো তত্ত্বগুলোর উল্লেখ থাকলেও, সেগুলোর বৈজ্ঞানিক বিতর্কের গভীরে আলোচনাটি প্রবেশ করেনি।
তত্ত্ব ও তথ্যের ভিড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কাটি আসে অধ্যায়ের শেষভাগে, সুইস সাইকিয়াট্রিস্ট কার্ল ইয়ুংয়ের 'আর্কিটাইপ' বা কালেকটিভ আনকনসাসনেস তত্ত্বের মাধ্যমে। মহাপ্লাবন হয়তো কেবল বাইরের পৃথিবীর জলচ্ছ্বাস ছিল না। মানুষ হিসেবে আমরা স্বভাবতই পুরোনো বিশৃঙ্খলা, ভুল বা জঞ্জাল ধুয়েমুছে একেবারে নতুন করে শুরু করতে চাই। আমাদের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা ধ্বংস ও সৃষ্টির এই আদিম আকাঙ্ক্ষাই যুগে যুগে, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে মহাপ্লাবনের মিথ হয়ে রূপ পেয়েছে।
ইতিহাস এখানে কেবল মাটির নিচের চাপা পড়া নগরী খোঁজে না। বইটি পড়ার পর একটা প্রশ্ন তাই অবধারিতভাবেই মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়—আমরা কি তবে হাজার বছর ধরে প্রকৃতির ধ্বংসলীলার কথা বলে আসছি, নাকি আমাদের নিজেদেরই মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা এক আদিম ও অন্ধকার সমুদ্রকে প্রতিনিয়ত ভাষার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি?
বই: প্রাচীন সভ্যতা ও প্রত্নতত্ত্ব
প্রথম অধ্যায়: মেসোপোটেমিয়ার মহাপ্লাবন
লেখক: হিমাংশু কর
প্রকাশনী: পুঁথি
#প্রাচীন_সভ্যতা_ও_প্রত্নতত্ত্ব #বিহান