14/08/2026
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী: কুরআনের দাওয়াত, তাফসীরের নবধারা ও এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাংলাদেশের ইসলামী অঙ্গনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন; একজন আলেমে দ্বীন, কুরআনের মুফাসসির এবং দাওয়াতি আন্দোলনের অগ্রপথিক। কুরআনের বাণীকে সহজ, সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য। তাঁর সুরেলা কণ্ঠ, প্রাঞ্জল ভাষা ও যুক্তিনির্ভর উপস্থাপনা কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে।
তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল কুরআনের আহ্বান মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া তাফসীর মাহফিল একসময় দেশব্যাপী এবং পরে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা ছাড়াই তিনি গ্রাম থেকে শহর, দেশ থেকে বিদেশে কুরআনের দাওয়াত পৌঁছে দেন। মানুষের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা সমস্যার সঙ্গে কুরআনের নির্দেশনার সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি তাফসীরকে বাস্তব জীবনের পথনির্দেশনায় রূপ দেন।
দীর্ঘ কারাবাসেও তিনি কুরআনচর্চা থেকে বিচ্যুত হননি। কারাগারে বসেই কুরআন অধ্যয়ন, গবেষণা এবং সহজ ভাষায় অনুবাদ ও ব্যাখ্যার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল আবার তাফসীরের ময়দানে ফিরে গিয়ে কুরআনের আলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
বাংলাদেশে তাফসীর মাহফিলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব তাঁর। প্রচলিত ওয়াজের ধারা থেকে বেরিয়ে তিনি কুরআনের আয়াত, হাদিস, সাহাবিদের জীবন এবং সমসাময়িক বাস্তবতার সমন্বয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করেন। ফলে তাফসীর মাহফিল কেবল ধর্মীয় সমাবেশ নয়, বরং শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি ও সমাজসচেতনতার এক শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়।
তাঁর বক্তব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শৈল্পিক উপস্থাপনা, সুরেলা কণ্ঠ, পরিশীলিত ভাষা এবং হৃদয়স্পর্শী বর্ণনাভঙ্গি। এ কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ তাঁর মাহফিলে ছুটে আসত। পরবর্তীকালে তাঁর বক্তব্য অডিও ও ভিডিও ক্যাসেটের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় বাস, লঞ্চ, দোকান, হোটেল ও অসংখ্য পরিবারের ঘরে তাঁর তাফসীরের ক্যাসেট নিয়মিত শোনা হতো। আধুনিক গণমাধ্যমে ইসলামী বক্তব্য সংরক্ষণ ও ব্যাপক প্রচারের ক্ষেত্রেও তিনি নতুন দিগন্তের সূচনা করেন।
তাঁর আলোচনায় ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পেত। ঈমান, নামাজ, যাকাত, আখিরাত, নৈতিকতা, পরিবার, দুর্নীতি, ঘুষ, মাদক, সামাজিক অবক্ষয়, মানবিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে তিনি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দিকনির্দেশনা দিতেন। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন এবং যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনাই তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা এনে দেয়।
তাঁর মাহফিলে তরুণদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি তরুণ সমাজকে নৈতিক চরিত্র গঠন, ইসলামি মূল্যবোধ অনুসরণ এবং কুরআনের আলোকে জীবন পরিচালনার আহ্বান জানাতেন। তাঁর বক্তব্য অসংখ্য তরুণকে দীনের পথে অনুপ্রাণিত করেছে এবং সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
শিরক, বিদআত, কুসংস্কার, সামাজিক অন্যায়, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। নানা প্রতিকূলতা, অপপ্রচার ও বাধা সত্ত্বেও তিনি তাঁর দাওয়াতি মিশন থেকে কখনো সরে দাঁড়াননি। কুরআনের আহ্বানই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি সেই লক্ষ্যেই অবিচল থেকেছেন।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জীবন কেবল তাফসীর মাহফিল বা দাওয়াতি কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি অন্যায়, দুর্নীতি, আধিপত্যবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সবসময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। রাষ্ট্র, সমাজ ও জাতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বক্তব্য উপস্থাপন করতেন। কোনো রক্তচক্ষু, হুমকি কিংবা হামলা তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—“বিড়ালের মতো একশ বছর বেঁচে থাকার চেয়ে সিংহের মতো এক ঘণ্টা বেঁচে থাকা উত্তম”—তাঁর ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতার প্রতিচ্ছবি।
তাঁর দীর্ঘ দাওয়াতি জীবনে বহুবার মাহফিলে হামলা, বাধা ও অপপ্রচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবুও তিনি কখনো তাফসীরের ময়দান ছেড়ে যাননি। প্রতিকূলতার মধ্যেও কুরআনের বাণী প্রচারকে তিনি জীবনের সর্বোচ্চ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে দীর্ঘ কারাবাস তাঁর সংগ্রামী জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে। তিনি প্রায় তেরো বছর কারাগারে ছিলেন। এই সময়ও তিনি কুরআন অধ্যয়ন, ইবাদত ও লেখালেখিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। কারাগারে থেকেই সহজ ভাষায় আল-কুরআনের অনুবাদ ও ব্যাখ্যার কাজে সময় ব্যয় করেন। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর ইন্তেকাল ঘটে, যা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এই বিচারকে কেন্দ্র করে আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং বিভিন্ন মহল নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও চিকিৎসা, কারাবাস এবং শেষ সময়ের ঘটনাবলি নিয়ে বহু প্রশ্ন জনমনে আলোচিত হতে থাকে।
তাঁর ইন্তেকালের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার মানুষ শোক প্রকাশের জন্য সমবেত হয়। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল ঢাকায় একটি বৃহৎ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেই সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। পরে পিরোজপুরে তাঁকে দাফন করা হয়। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং বহু ইউনিয়নে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও তাঁর জন্য জানাজা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
দেশের বাইরে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন তিনি কুরআনের তাফসীর পেশ করেন। তাঁর সফরের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে কুরআনচর্চা ও ইসলামী দাওয়াত নতুন মাত্রা লাভ করে। পৃথিবীর বহু দেশে তিনি ইসলামের বাণী প্রচার করেছেন এবং বহু আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন।
তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তাফসীর, ঈমান, আখিরাত, নৈতিকতা, সমাজসংস্কার ও ইসলামী জীবনব্যবস্থা নিয়ে তাঁর রচিত বইগুলো দীর্ঘদিন ধরে পাঠকের কাছে সমাদৃত। বক্তা হিসেবে যেমন তিনি জনপ্রিয় ছিলেন, তেমনি লেখক হিসেবেও ইসলামী সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ, অনাড়ম্বর ও বিনয়ী। পোশাক-পরিচ্ছদ, জীবনযাপন ও ব্যক্তিগত আচরণে সরলতা ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেও তিনি নিজেকে সবসময় কুরআনের একজন ক্ষুদ্র ছাত্র বলেই পরিচয় দিতেন। তাঁর বিনয়, অধ্যয়নপ্রবণতা এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক আচরণ তাঁকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী শুধু একজন বক্তা বা মুফাসসির ছিলেন না; তিনি একজন রাজনীতিবিদ, লেখক, সংগঠক এবং ইসলামী ঐক্যের একজন অক্লান্ত কর্মীও ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিলেও তাঁর মূল পরিচয় ছিল কুরআনের দাওয়াতের বাহক। রাজনৈতিক অঙ্গনের চেয়ে তাফসীরের ময়দানেই তিনি নিজেকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন এবং সেখানেই তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অবদান রেখে গেছেন।
তিনি পরপর দুইবার পিরোজপুর থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে বিভিন্ন জাতীয় বিষয়ে তিনি ইসলামী মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও জনকল্যাণের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর সততা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে তাঁর এলাকায় আজও ইতিবাচক স্মৃতিচারণ করা হয়।
দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশে তিনি কুরআনের তাফসীর পেশ করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন এবং বহু দেশের ইসলামপ্রিয় মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ইসলামী শিক্ষা ও কুরআনচর্চা বিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন সমৃদ্ধ। তাফসীর, ঈমান, আখিরাত, নৈতিকতা, সমাজসংস্কার ও ইসলামী জীবনব্যবস্থার ওপর তাঁর বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর রচনাগুলো আজও বহু পাঠকের কাছে অধ্যয়ন ও অনুপ্রেরণার উৎস।
তিনি ইসলামী ঐক্যের প্রশ্নে ছিলেন আন্তরিক। বিভিন্ন ধারার আলেম, মাদরাসা, খানকা ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান ছিল তাঁর অন্যতম বার্তা।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সাধারণ, সংযমী ও বিনয়ী। খ্যাতি, জনপ্রিয়তা কিংবা আন্তর্জাতিক পরিচিতি তাঁর ব্যক্তিত্বে অহংকারের জন্ম দিতে পারেনি। তিনি নিজেকে সবসময় আল্লাহর একজন নগণ্য বান্দা এবং কুরআনের একজন ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। অধ্যয়ন, ইবাদত, দাওয়াত ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখাই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য।
আল্লামা সাঈদীর ইন্তেকালের পর দেশ-বিদেশের বহু ইসলামী ব্যক্তিত্ব, আলেম, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন সংগঠন শোক প্রকাশ করে। বিশ্বের নানা দেশে তাঁর জন্য গায়েবানা জানাজা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এটি তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও মানুষের ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
আজ ব্যক্তি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত কুরআনের আহ্বান, তাঁর তাফসীর, তাঁর রচনা এবং তাঁর রেখে যাওয়া দাওয়াতি কর্মধারা আজও লাখো মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত। সময়ের ব্যবধানে মানুষ মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু আদর্শ, জ্ঞান ও সৎকর্মের উত্তরাধিকার বেঁচে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
যে জীবন কুরআনের দাওয়াত, দীনের খেদমত এবং মানুষের নৈতিক জাগরণে নিবেদিত ছিল, সেই জীবনের প্রভাব সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকে। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জীবনও সেই ধারারই একটি অধ্যায়। তাঁর কর্ম, চিন্তা, ত্যাগ ও দাওয়াতি প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে। আল্লাহ তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমীন।
মুহাম্মদ নাজমুল হাসান পাটোয়ারী
আমীর,রামগঞ্জ উপজেলা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।।