14/08/2026
“নাহমাদুহু ওয়ানাসতাঈনুহু...”
যে কণ্ঠ থেমে গেছে। যে কন্ঠকে আমরা চাক্ষুষ শুনতে পাই না। কিন্তু সে কন্ঠের প্রতিধ্বনি থামেনি।
এটা ছিল এমন এক ইউনিক কন্ঠ। এই কন্ঠকে যেন খোদাতায়ালা ইলমের রৌশন দিয়ে, কন্ঠের তেজ আর দরদমাখা হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার সুর দিয়ে যেন এই বাংলাদেশের জন্য পাঠিয়েছেন।
যে "নাহমাদুহু...." উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন লাখো মানুষের হৃদয় একসঙ্গে নীরব হয়ে যেত। যেন রাজ্যের পিনপতন নীরবতা নেমে আসত। আমি অধম সেই মোহিনী, মায়াবী সুরের এমন অবস্থার স্বাক্ষী ছিলাম সিলেট আলীয়ার ময়দানে।
সামনে বসে থাকা জনসমুদ্র। কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক, কেউ ছাত্র, কেউ ব্যবসায়ী; কেউ তরুণ, কেউ বৃদ্ধ। নারী-পুরুষ, শহর-গ্রাম, দেশ-বিদেশ সবাই যেন অপেক্ষা করত একটি কণ্ঠের জন্য। সাইদী হুজুরের ওয়াজ।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহ:)
আপনি ছিলেন কোরানের পাখি। এ লকবটা কেবলই এবং কেবলই আপনার জন্য।
কেউ ডাকত সাঈদী হুজুর, কেউ বলত সাঈদী সাহেব।
আর অগণিত মানুষ ভালোবেসে আপনাকে বলত কুরআনের পাখি।
১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুরের ইন্দুরকানীর সাঈদখালী গ্রামে জন্ম নেওয়া সেই মানুষটি একদিন বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে পরিচিত হয়ে উঠবেন তখন হয়তো কেউ ভাবেনি। ছারছিনা ও খুলনা আলিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা, তাফসিরে কামিল এবং এরপর ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও মনোবিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ে দীর্ঘ অধ্যয়ন। আপনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন একটি দীর্ঘ দাওয়াতি জীবনের জন্য।
রাসূলুল্লাহর সংগ্রামী জীবনের সাথে নিজেকে পরিচালিত করেছিলেন।
১৯৬৭ সাল থেকে আপনি নিজেকে দা'য়ী ইলাল্লাহ হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন।
তারপর শুরু হয় এক দীর্ঘ সফর। জাদুময় কন্ঠের বিস্তার। এর সাথে আপনার বিশাল বিস্তৃত পড়াশোনা। আবার সেই পড়াশোনাকে একেবারে সহজ সরল ভাষায় সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন আপনি। এই সকল গুণ একসাথে খোদাতায়ালা আপনাকে একসাথে দিয়েছেন আমাদের শুনানোর জন্য।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরের বিশাল ময়দান। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর অর্ধ- শতাধিক দেশে আপনি কুরআনের তাফসির ও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন।
আপনার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত টান। কঠিন কথা বলতেন, কিন্তু সেই কথার ভেতরেও ছিল আবেগ। সতর্ক করতেন, আবার আশার দরজাও খুলে দিতেন।
বক্তব্য ছিল প্রাঞ্জল। অনুপম নানা উপমা যুক্ত করতেন। শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখার জন্য কৌতুকও করতেন।
মাথায় টুপি। যেটা ছিল উল্লম্ব।
ডোরাকাটা দাগ টাইপের ডিজাইন।
সাদা পাঞ্জাবি।
চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা।
আর সেই কণ্ঠ। যে কন্ঠে বারুদ ঝরে, মায়ার মুক্তা ঝরে। নসিহতের পাহাড় থেকে যেন শ্রোতারা নামতেই চায় না। আপনি ছিলেন সেই হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা।
কিন্তু হুজুর, আমাদের সাইদী হুজুর- আপনি শুধুই কি বক্তা ছিলেন? এটা বললে আপনার শানে গোস্তাকি হবে। হযরত মাফ করবেন আমাদেরকে।
আপনি ছিলেন সুলেখক। শিক্ষক। সমাজকর্মী। রাজনীতিবিদ। সংসদ সদস্য।
যেন একের ভিতর সব। ওল ইন ওয়ান প্যাকেজ।
আপনি লিখেছেন ৭৭টি ছোট বড় বই। লিখেছেন তাফসিরে সাইদী।
রীতিমতো ভাবনার বিষয়। মননে ঝড় তোলে। নিজের ব্যর্থতাকে ধিক্কার জানাই। কিন্তু এই ব্যর্থতাকে হত্যা করতে পারি নি।
হযরত সাইদী হুজুর। আপনি তখন চার দেয়ালের ভেতরে বন্দী। তখনও তাঁর কলম থামেনি।
এই চারদেয়ালের দুনিয়ায় আমিও ছিলাম। কিন্তু আপনার মতো সময়কে প্রডাক্টিভ করতে পারি নি। আপনি জেলে বসে লিখেছেন অমর গ্রন্থ 'নন্দিত জাতি নিন্দিত গন্তব্যে'।
বাইরে আপনার জন্য শহিদী মিছিল হচ্ছে।
আদালতে আপনার বিচার চলছে।
পরিবারের মানুষ কাঁদছে।
আর আপনি তখন কারাগারের ভেতরে বসে লিখছেন।
এ যেন এক অদ্ভুত দৃশ্য
আপনার দেহকে জালিমরা বন্দী করতে পেরেছে। আপনার কলমকে পারেনি।
রাজনীতিতে ছিল আপনার দীর্ঘ পথযাত্রা।
১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৬ সালে কওমি মাদরাসা শিক্ষা ও দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতি নিয়ে সংসদে বিল উত্থাপন করেছেন।
সংসদে আপনার দেয়া প্রস্তাবেই মাথা ঝুঁকিয়ে ঢুকা বন্ধ হয়।
আপনি শুধু নিজের দল জামাতের অনুসারীদের নেতা ছিলেন না। নেতা ছিলেন হিন্দুদের। আপনি ছিলেন তাদের আপনজন। এজন্যই ত একটা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা থেকে আপনি বারবার নির্বাচিত হয়েছেন এমপি হিসেবে।
রাজনীতিতে আপনি ছিলেন ভারতীয় প্রভাব ও আধিপত্যের সমালোচনায় সোচ্চার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রশ্নে আপনি ছিলেন আপোষহীন।
কিন্তু সাইদী হুজুর। আপনার জনপ্রিয়তা যত বাড়ল, সেই সাথে আপনার বিরোধিতাও তত তীব্র হলো। দেশি বিদেশি চক্র, বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী বাঙালী বাম গোষ্ঠী তাদের প্রভুর ইশারায় আপনার চরিত্র হনমে নেমে গেল। সংসদে দাঁড়িয়ে আপনি তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছেন আপনি রাজাকার না। একাত্তরের পাপ আপনাকে স্পর্শ করে নাই।
সময় এভাবেই গড়াল।
১/১১ এর দেশি বিদেশি চক্রান্তে হিন্দুত্ববাদের দোষর হাসিনা ক্ষমতায় আসল। তারা আপনাকে শেষ করে দেয়ার চূড়ান্ত মিশন শুরু করে দিল।
তারপর এল সেই কালো সময়।
২০১০ সালের ২৯ জুন। আমাদের জন্য একটা কাল দিন।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলো। একেবারে হাস্যকর ও লজ্জাজনক ব্যাপার। আপনি নাকি ধর্মীয় অবমাননা করেছেন।
এই মামলার বাদী ছিল কুখ্যাত দালাল নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি।
জাতিসংঘের একটি নথিতেও আপনার গ্রেপ্তারের বিষয়টি ২৯ জুন ২০১০ এবং দণ্ডবিধির ২৯৫(এ), ২৯৮ ও ১০৯ ধারার অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ আছে।
পরে ২ আগস্ট আপনাকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাস্যকর বানোয়াট মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেটা হাসিনার বানানো ক্যাঙারু ট্রাইব্যুনাল। সেই কুখ্যাত ক্যাঙ্গারু ট্রাইব্যুনালে আপনার আসা যাওয়া শুরু হল।
আমরা দেখতাম সেই লাল মেহেদী মাখা দাড়ি আর রোগে আক্রান্ত আমাদের আল্লামকে। নীরবে চোখের পানি ফেলতাম আপনার জন্য। আহা, আমরা কতই না অসহায় ছিলাম সেই সময়ে।
ট্রাইব্যুনালে ২০টি অভিযোগ।
সাক্ষী।
জেরা।
আদালত।
কারাগার।
অপেক্ষা।
অপেক্ষা।
আর অপেক্ষা।
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল ২০টি অভিযোগের মধ্যে ৮টিতে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয় আপনাকে।
আপিল বিভাগ পরে ট্রাইব্যুনালের ৮টি সাব্যস্ত হওয়া অভিযোগের সবগুলো বহাল রাখেনি। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের বত্তিতে কিছু অভিযোগ থেকে আপনাকে খালাস দেয়। কিছু অভিযোগে সাজা নির্ধারণ করে এবং মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়।
এই বিচারকে ঘিরে দেশে-বিদেশে তীব্র বিতর্ক ছিল।
একজন হিন্দু রাজস্বাক্ষী ট্রাইব্যুনালের বিচারের নামে প্রহসনকে একেবারে উলঙ করে দেয়।
সুখরঞ্জন বালি। সে পরিণত হয় এক ঐতিহাসিক চরিত্রে।
সাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময়ে কোর্টের সামনে থেকেই কিডন্যাপ করা হয়। তাকে র তুলে নিয়ে যায় ভারতে।
সুখরঞ্জন বালী নিজে ভারতে বন্দী থাকার কথা জানান।
এই ছিল খুনী ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিচার ও শাসন।
প্রিয় আল্লামা সাইদী হুজুর, আপনারবরায় ঘোষণার দিন বাংলাদেশ যেন পাগলপারা হয়ে গেল।
২৮ ফেব্রুয়ারির রায়ের পর দেশ ছিল উত্তাল।
সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ রাস্তায় নেমে আসে দলমত নির্বিশেষে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নথিভুক্ত করেছিল যে নিরাপত্তা বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে বিক্ষোভকারীদের ওপর জীবন্ত গুলি ব্যবহার করেছিল এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত সহিংসতায় ১৫০ এর বেশি মানুষ শহীদ হয়েছিল।
বেগম খালেদা জিয়া সম্ভবত বিদেশে সফরে ছিলেন। তিনি দেশে ফিরে আসেন দ্রুত। সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। তিনি বললেন এটা স্পষ্ট গণহত্যা।
সেদিন কত মায়ের বুক খালি হয়েছে!
কত সন্তানের বাবা আর ঘরে ফেরেনি!
কত স্ত্রী অপেক্ষা করতে করতে বিধবা হয়েছে!
কত তরুণের রক্ত মিশে গেছে রাজপথের ধুলোয়!
সবুজ দুর্বাঘাস রক্তের দাগে লাল হয়ে যায় সেদিন।
প্রিয় সাঈদী হুজুর। আপনার জন্য মানুষ পাগল ছিল মূলত কুরআনের জন্য। এই সত্যটা আপনি নিজেই বলতেন।
মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে যারা রাস্তায় নেমেছিল, তাদের সবাই জামাতের কর্মী ছিল না। আপনার জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তি ছিল দলীয় সীমারেখার বাইরে।
আর কারাগারের ভেতরে ছিলেন আপনি!
সেই সময়েই ২০১২ সালের ১৩ জুন আদালতের কার্যক্রম চলাকালীন আপনার বড় ছেলে রফীক বিন সাঈদী হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
একজন বাবার জীবনে এর চেয়ে অসহায় মুহূর্ত আর কী হতে পারে?
আমাদের ভাই রফীকের মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ বছর বয়সে।
কিন্তু সাঈদী হুজুর তখনও আপনি ভেঙে পড়েননি।
একদিকে সন্তানের কবরের ব্যথা।
অন্যদিকে নিজের বিচার।
আর অন্যদিকে দেশের লাখো মানুষের ভালোবাসা।
আপনি প্যারোলে মুক্তি পেয়ে জানাযায় এসেছিলেন। তখনকার আপনার দোয়ার কথা মনে পড়ল। জল আটকাতে পারিনি।
তারপর কেটে গেল বছর।
এক বছর।
দুই বছর।
পাঁচ বছর।
দশ বছর।
তেরো বছর।
তেরো বছর কারাগারে।
২০১০ সালের গ্রেপ্তার থেকে ২০২৩ সালের মৃত্যু পর্যন্ত আপনার জীবনের শেষ অধ্যায়ের প্রায় পুরোটাই কেটেছে বন্দিত্বে।
তারপর এলো
১৩ আগস্ট ২০২৩।
কাশিমপুর কারাগারে বুকের ব্যথা নিয়ে আপনি আসলেন কয়েদি হিসেবে। ধারণা করছি আমরা আপনাকে খুনি চক্র পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
প্রথমে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
তারপর ঢাকায় বিএসএমএমইউ।
আর পরদিন
১৪ আগস্ট ২০২৩।
সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।
চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেন নাই। এই সত্য একদিন বের হবেই।
রাত ৮টা ৪০ মিনিটে থেমে গেল আপনার হৃদস্পন্দন।
ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন
'কুল্লু নাফসিন জা ইকাতিল মউত'
থেমে গেল চিরতরে সেই 'নাহমাদুহুর' চিরচেনা কণ্ঠ।
যে কণ্ঠে লাখো মানুষ কুরআন শুনেছিল।
যে কণ্ঠে মানুষ কেঁদেছিল।
যে কণ্ঠে মানুষ তওবা করেছিল।
যে কণ্ঠের জন্য মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে মানুষ মাহফিলে বসেছিল।
সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছিল, তাঁর চিকিৎসা আন্তর্জাতিক প্র্যাকটিস অনুযায়ী করা হয়েছিল এবং মৃত্যুর কারণ ছিল কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।
কিন্তু আমরা এই জালিম হাসিনার ডাক্ত্রারদের কথা বিশ্বসস করি না।
যে মানুষটি বলতেন-
“আল্লাহর কিতাবের দিকে ফিরে আসো।”
আজ সেই মানুষটি নিজেই চলে গেছেন আল্লাহর দরবারে।
আজ আর কোনো মাহফিলে হঠাৎ তাঁর কণ্ঠ ভেসে আসবে না দরদমাখা সুরে-
“নাহমাদুহু ওয়ানাসতাঈনুহু...”
মঞ্চের ওপর সাদা পাঞ্জাবি পরা মানুষটি আর দাঁড়াবেন না।
চোখে সেই সোনালি ফ্রেমের চশমা আর দেখা যাবে না।
মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষকে আর বলবেন না—
দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে।
মানুষ চলে যায়।
কণ্ঠ থেমে যায়।
কিন্তু রয়ে যায় স্মৃতি।
কিছু কণ্ঠের প্রতিধ্বনি থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মে।
ইউটিউবের কোনো পুরোনো ভিডিও খুললে আপনার কণ্ঠ শুনতে পাই।
মনে হয়
হুজুর বুঝি এখনো আছেন।
একটু পরেই যেন বলবেন
“নাহমাদুহু ওয়ানাসতাঈনুহু...”
তারপর হঠাৎ মনে পড়ে—
না।
আল্লামা ত আর দুনিয়ায় নেই।
চোখের কোণে পানি জমে উঠে।
বুকটা যেন ভারি হয়ে উঠে।
বুঝতে পারি আমরা কাকে হারিয়েছি।
আল্লামা সাঈদী,
আপনি কেমন ছিলেন, ইতিহাস তার বিচার করবে নিশ্চয়ই। আমরা স্বাক্ষী দিচ্ছি আপনি নির্দোষ।
বাংলাদেশের ওয়াজের বক্তৃতার ইতিহাসে আপনার কণ্ঠ ইউনিক। অনন্য। এর তুলনা নাই। আপনার তুলনা আপনি নিজেই।
এটা যে কেউ স্বীকার করতে বাধ্য।
আপনি লক্ষ মানুষের হৃদয়ে কুরআনের কথা পৌঁছে দিয়েছেন। অসংখ্য অমুসলিম আপনার দাওয়াতে মুগ্ধ হয়ে ইসলামে এসেছে।
আপনি কলম ধরেছেন।
আপনি সংসদে কথা বলেছেন।
আপনি রাজপথে কথা বলেছেন।
আপনি কারাগারেও লিখেছেন।
আর শেষ পর্যন্ত
কারাগারের পোশাক পরেই এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলেন।
আপনার স্মৃতি থাকবে।
আপনাকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসা থাকবে।
আর থাকবে অগণিত মানুষের চোখের পানি।
আজ ১৪ আগস্ট।
আপনার চলে যাওয়ার দিন।
এই দিনে শুধু একটি কথাই বলতে ইচ্ছে করে—
হে আল্লাহ, দুনিয়ায় আমরা যাকে ভালোবেসেছি, আপনি তাকে আপনার রহমতের ছায়ায় রাখুন।
তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন।
তাঁর কবরকে প্রশস্ত করুন।
তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন।
তাঁর দীর্ঘ দাওয়াতি জীবনের নেক আমলগুলো কবুল করুন।
তাঁর লেখা, তাঁর তাফসির, তাঁর দাওয়াত যদি কোনো মানুষের হেদায়েতের কারণ হয়ে থাকে, তার প্রতিটি নেকি তাঁর আমলনামায় পৌঁছে দিন।
আর আমাদেরও এমন জীবন দিন।
যে জীবন শেষ হয়ে গেলেও
মানুষ দোয়ার সময় চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে-
“আল্লাহ, আমাদের প্রিয় মানুষটাকে কবুল করে নিন।”
বিদায়, সাঈদী হুজুর!
আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়ারহামনি....
আল্লাহ আপনাকে মাফ করুন, রহম করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
লেখকঃ সাইফুল ইসলাম সুজন
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, শাবিপ্রবি শাখা