29/07/2026
বিদ্যুতের বিল বেশী আসার অভিযোগ ও কিছু কথাঃ
একবিংশ শতাব্দিতে এসে বিদ্যুৎ একটি অতীব প্রয়োজনীয় জিনিস। যার ব্যবহার আমাদের মাঝে এমনভাবে বিস্তৃত যে, তা ছাড়া একটি দিন চিন্তা করাই প্রায় অসম্ভব।পৃথিবীর অনেক দেশ বিদ্যুতে স্বনির্ভরতা অর্জন করলেও সীমিত সম্পদের কারনে আমরা এখনো সেটা নিশ্চিত করতে পারিনি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির প্রায় পুরোটাই আমদানি নির্ভর এবং অত্যন্ত ব্যায়বহুল,তার কাঁচামাল(গ্যাস,তেল কয়লা) বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, আমদনি করতে হয়। যার কারনে বাংলাদেশের মত দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি ব্যয়বহুল কার্যক্রম। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানী নিরাপত্তা সব সরকারের আমলেই এটি একটি বড় মাথাব্যথার কারন। ডলার ক্রাইসিস ও বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতায় জ্বালানী বাজারে নতুন সমস্যা নিয়ে আসে, কোনো কারনে তেল,গ্যাস আমদানি করতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। মাত্রারিক্ত গরম হলে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায় এস্টিমেটের তুলনায় অনেক বেশী। তখন সিস্টেম স্বাভাবিক রাখার জন্য কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়। এটা কোনো বিতরন সংস্থা ইচ্ছা করলেই করতে পারে এমন না, তা করতে হয় বাধ্য হয়ে,সিস্টেমকে স্বাভাবিক রাখতে।
ইদানিংকালে অনেকেই অভিযোগ করছেন তার বিদ্যুৎ বিল বেশী আসছে /কাটছে, তার জন্য অনেকেই প্রিপেইড মিটারকে দায়ী করছেন।যা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রিপেইড মিটার অত্যন্ত সঠিক বিলিং করে যেখানে অতিরিক্ত বিলের কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃতিগত কারনে মানুষ কোনো কিছুর মূল্য ব্যবহারের পূর্বে দিতে চায় না। ব্যবহারের পূর্বে কোনো কিছুর বিল পরিশোধ করলে মানুষ তা কষ্টদায়ক মনে করে।যেমন - মোবাইলে টাকা রিচার্জ। তাছাড়া অনেক অভিযোগের ভিত্তিতে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে বিশেষজ্ঞ দিয়ে কয়েকবার দৈবচয়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা করানো হয়েছে তাতেও নূন্যতম অসামঞ্জস্যতা পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে জনগণ বিদ্যুতের মূল্যটাই দিতে পারে না, সেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন,বিতরন ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিচালন খরচ এসবের জন্য সরকার গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী একটা ডিমান্ড চার্জ নেয়, যা না নিলে অবকাঠামো তৈরী ও মেরামত গরীব দেশের জন্য অসম্ভব।আরেকটি হল মিটার ভাড়া, মিটার গ্রাহক নিজে ক্রয় করলে তার থেকে ভাড়া নেওয়া হয় না। শুধুমাত্র বিতরন সংস্থা থেকে মিটার ভাড়ায় নিলেই কেবল তার মিটার ভাড়া নেয়া হয়। এখানেও সরকার জনগণকে ভর্তুকি দিচ্ছে, একটি প্রিপেইড মিটারের মূল্য মিটার ভেদে প্রায় ৫৫০০ টাকার কম বেশী হয়, যা ভাড়ায় নিলে ৪০/মাসে দিলে আসল পরিশোধ করতেই ১১.৪ বছর সময় লাগবে। যা গ্রাহকের জন্যই লাভজনক।
এবার আসি বিলের বিষয়ে, বিদ্যুৎ বিলের হিসাবটি সরল নয়, কারিগরি বিষয় হওয়ার কারনে এটি একটু জঠিল প্রকৃতির। তাই এই খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছাড়া বিষয়টি বুঝা একটু কাঠিন।
পৃথিবীতে যে কয়টি কল্যান রাস্ট্র রয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এখানে সেবাখাতে সরকার ভর্তুকি দেয়। কেমন সেটা - বিপিডিবির তথ্য মতে বর্তমানে ১ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ১৩.০৯ টাকা কিন্তু বিভিন্ন বিতরন সংস্থা তা গ্রাহকের কাছে বিক্রয় করে এ্যভারেজ ১০.৬৩ টাকা অর্থাৎ সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয় গড়ে ২.৪ টাকা প্রায়। এটা বিলিয়ন বিলিয়ন ইউনিটে কত হয় তা হিসাব করা যেতে পারে।
তার মধ্যে এদেশের সকল গ্রাহক সমান সামর্থ্যবান নয় তাই যারা গরীব গ্রাহক তাদের বিলিং রেট এবং যারা সামর্থ্যবান তাদের বিলিং রেট এক নয়। এখন এটা নির্ধারণ করা হয় তার ব্যবহারের উপর। যে বেশী ব্যবহার করে তার বাসায় বিদ্যুতের যন্ত্রপাতি বেশী সে সামর্থবান, যিনি এসি ব্যবহার করেন তাকে গরীব বলার সুযোগ নেই।
ধরি কোনো একজন আবাসিক গ্রাহক মাসের শুরুতে ৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার পর্যন্ত তার বিলিং রেট ৫.৩২ টাকা, ৫১ ইউনিট থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত তা ৬.১৮ টাকা, ৭৬- ২০০ ইউনিট ৮.৫০ টাকা, ২০১-৩০০ ইউনিট ৯.১০ টাকা, ৩০১-৪০০ ইউনিট ৯.৬২ টাকা, ৪০১-৬০০ ইউনিট ১৫.০১ টাকা, ৬০০ ইউনিটের উর্ধে ১৭.৩৫ টাকা। প্রিপ্রেইড মিটারে এই ধাপের পার্থক্যগুলো বুঝা যায়, কিন্তু বিলিং মিটারে একত্রে মাস শেষে বিল হওয়ার কারনে তা বুঝা যায় না। প্রিপেইড মিটারে মাসের শুরুতে ১০০ টাকা দিয়ে প্রায় ১৮.৭ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, কিন্তু মাসের শেষের দিকে যখন ৬০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়ে যায় তখন ধাপ পরিবর্তন হয়ে ১০০ টাকায় ৫.৭ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। যার কারনে মাসের শেষে দিকে এসে মনে হয় সব টাকা কেটে নিয়ে গেল। কিন্তু এটি খুবই স্বাভাবিক বিষয়। মিটারে ৪১৪ চেপে এন্টার চাপলে চলতি মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে তা জানতে পারা যায়। জুন মাসে অত্যধিক গরম এবং ট্যারিফ রেট বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে।
বিতরনে চাকরির সুবাধে প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহক আসেন, তাদের সমস্যা শুনি বেশিরভাগ গ্রাহকরাই বিষয়টা বুঝতে পারেন না। বুঝিয়ে দিলে বুঝেন। অনেকেই মিটারে টাকা রিচার্জ করলেও মিটারে টাকা এন্ট্রি দেন না, সিকোয়েন্স মিস করেন,অনুমোদিত লোডের থেকে বেশী লোড ব্যবহার করেন, অনেকেই অনেকভাবে রাজস্ব ফাকি দিতে চান। দিন শেষে দেশটা আমাদেরই। এখানে কেউ কারো শত্রু না।বিদ্যুৎ বিভাগ বেশী বিল করে কাকে দিবে? কি লাভ তাদের বেশী বিল করে?মাঝে মাঝে দু -একটা ভুল হতে পারে, কিন্তু ভুলকে ঢালাওভাবে প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা থেকে আমাদের সকলকে বিরত থাকতে হবে।
লেখক- সৈয়দ জুবায়েদ হাসান
উপ-সহকারী প্রকৌশলী, বিপিডিবি